বার বার কিসিং ডিজিজে হতে পারে স্নায়ু রোগের ঝুঁকি
চুম্বন শুধু প্রেম বা ভালোবাসা প্রকাশের একটি ষা নয়, এটি শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্যও কিছুটা উপকারী। বিশেষজ্ঞরা বলেন, চুম্বনের মাধ্যমে ভালো হরমোন বৃদ্ধি পায়, মানসিক চাপ কমে এবং সম্পর্কের বন্ধন আরও দৃঢ় হয়।
তবে চুম্বনের মাধ্যমে মারাত্মক সংক্রমণও ছড়াতে পারে। হঠাৎ ঘুম থেকে উঠে জ্বর, গলা ব্যথা ও মারাত্মক দুর্বলতা অনুভব করলে অনেকেই ভেবেন, ধীরে ধীরে সব ঠিক হয়ে যাবে।
কিন্তু কখনো কখনো এই উপসর্গগুলো ইঙ্গিত দেয় একটি বিশেষ সংক্রমণের-ইনফেকশাস মনোনিউক্লিওসিস, যা অনেকের কাছে ‘কিসিং ডিজিজ’ নামেই পরিচিত। সাধারণত বিশ্রাম নিলে কয়েক দিনের মধ্যেই উপসর্গ কমে যায়, তবে এর প্রভাব কখনো কখনো দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে।
কিসিং ডিজিজ কী
এই রোগের মূল কারণ এপস্টিন-বার ভাইরাস (ইবিভি)। এটি মূলত লালার মাধ্যমে ছড়ায়। চুম্বনের সময় এক ব্যক্তি থেকে অন্য ব্যক্তির শরীরে ভাইরাসটি সহজেই প্রবেশ করে। তবে শুধু চুম্বনই নয়, কাশি-হাঁচি, একই গ্লাস বা বাসন ব্যবহার, এমনকি শরীরের অন্যান্য তরল মাধ্যমেও এই ভাইরাস ছড়াতে পারে। বিশেষ করে কিশোর-কিশোরী ও তরুণদের মধ্যে এই সংক্রমণ বেশি দেখা যায়। শিশুদের ক্ষেত্রে উপসর্গ তুলনামূলক হালকা হলেও বড়দের ক্ষেত্রে তা বেশি প্রকট হতে পারে।

উপসর্গ ও প্রভাব
মোনোর সাধারণ উপসর্গগুলোর মধ্যে রয়েছে জ্বর, গলা ব্যথা, ক্লান্তি, লিম্ফ নোড ফুলে যাওয়া এবং শরীর দুর্বল লাগা। অনেক সময় রোগী এতটাই ক্লান্ত হয়ে পড়েন যে দৈনন্দিন কাজ করাও কঠিন হয়ে যায়। যদিও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে রোগ সেরে যায়, তবুও কিছু ক্ষেত্রে এর প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
কীভাবে রোগ নির্ণয় করা হয়
চিকিৎসক সাধারণত রোগীর উপসর্গ ও শারীরিক পরীক্ষা থেকেই এই রোগ সম্পর্কে ধারণা পান। লিম্ফ নোড ফুলে যাওয়া, টনসিলের অবস্থা এবং গলার পরীক্ষা করা হয়। নিশ্চিত হওয়ার জন্য রক্ত পরীক্ষা করা হয়, যার মাধ্যমে এপস্টিন-বার ভাইরাস শনাক্ত করা সম্ভব।
করণীয়
এই রোগের নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা নেই, কারণ এটি ভাইরাসজনিত। তাই অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করে না। উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসা দেওয়া হয়। পর্যাপ্ত বিশ্রাম খুবই জরুরি, কারণ এতে শরীর দ্রুত সুস্থ হতে পারে। প্রচুর পানি পান করলে শরীর হাইড্রেটেড থাকে এবং দুর্বলতা কমে। জ্বর ও ব্যথার জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী ওষুধ দেওয়া হয়। গলা ব্যথা কমাতে হালকা গরম লবণ পানিতে গার্গল করার পরামর্শ দেওয়া হয় এবং কথা কম বলাও উপকারী।

জটিলতার ঝুঁকি
সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা একাধিকবার মোনোতে আক্রান্ত হয়েছেন, তাদের মধ্যে ভবিষ্যতে স্নায়বিক রোগ হওয়ার ঝুঁকি কিছুটা বেড়ে যেতে পারে। বিশেষ করে মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস নামক একটি অটোইমিউন রোগের সঙ্গে এর সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া গেছে।
প্রায় ১৯ হাজার মানুষের ওপর করা ২০ বছরের সমীক্ষা অনুযায়ী, যদি কোনো ব্যক্তি তিনবার বা তার বেশি মোনোতে আক্রান্ত হন, তাহলে তার মধ্যে মোনোর ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। গবেষণার ফলাফল দেখাচ্ছে, মোনো আক্রান্তদের মধ্যে ০.১৭% রোগী ভবিষ্যতে এমএসে আক্রান্ত হন, যেখানে এমএস না হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে এই হার ০.০৭%। অর্থাৎ, মোনো আক্রান্তদের মধ্যে এমএসে ঝুঁকি প্রায় দ্বিগুণ।
দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় দেখা গেছে, মোনো আক্রান্তদের একটি ছোট অংশ পরবর্তীতে এই জটিল রোগে ভুগতে পারেন। যদিও এই ঝুঁকি খুব বেশি নয়, তবুও বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস কী
মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস একটি জটিল অটোইমিউন রোগ, যেখানে শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থা স্নায়ুর সুরক্ষামূলক আবরণকে আক্রমণ করে। এর ফলে মস্তিষ্ক থেকে শরীরের বিভিন্ন অংশে সঠিক সংকেত পৌঁছাতে সমস্যা হয়। প্রাথমিকভাবে ক্লান্তি, হাত-পায়ে অসাড়তা, ঝাপসা দেখা বা হাঁটার সময় ভারসাম্য হারানোর মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। সময়মতো চিকিৎসা শুরু হলে এই রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
কিসিং ডিজিজ সাধারণ হলেও একে অবহেলা করা ঠিক নয়। উপসর্গ দীর্ঘস্থায়ী হলে বা অস্বাভাবিক মনে হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।
সূত্র: এনডিটিভি, ডেইলি মেইল
এসএকেওয়াই