ফ্যাটি লিভার কখন ভয়ংকর রূপ নেয়? কোন পর্যায় ঝুঁকি বাড়ে
জনপ্রিয় কনটেন্ট ক্রিয়েটর কারিনা কায়সার গুরুতর অসুস্থ হয়ে রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। জানা গেছে, ফ্যাটি লিভারের জটিলতার কারণে তার শারীরিক অবস্থা সংকটাপন্ন। এই ঘটনা আবারও সামনে নিয়ে এসেছে একটি নীরব কিন্তু ভয়ংকর রোগ, ফ্যাটি লিভার।
এক সময় ধারণা করা হতো, বয়স বাড়লেই লিভারের সমস্যা বেশি হয়। কিন্তু এখন তরুণদের মধ্যেও দ্রুত বাড়ছে ফ্যাটি লিভারের ঝুঁকি। অনিয়মিত জীবনযাপন, অস্বাস্থ্যকর খাবার, ব্যায়ামের অভাব এবং অতিরিক্ত ওজন এই রোগ এখন বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ফ্যাটি লিভার কী?
ফ্যাটি লিভার হলো এমন একটি অবস্থা, যখন যকৃতে অতিরিক্ত চর্বি জমতে শুরু করে। সাধারণত লিভারে অল্প পরিমাণ চর্বি থাকতেই পারে, কিন্তু সেটি যদি অতিরিক্ত বেড়ে যায়, তখনই সমস্যা তৈরি হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে এটি শুধু লিভারের রোগ নয়, বরং পুরো শরীরের মেটাবলিক সমস্যার সঙ্গে জড়িত। তাই এখন একে অনেক ক্ষেত্রে মেটাবলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজও বলা হয়।

যে কারণে বাড়ছে এই রোগ
বর্তমান জীবনযাত্রাই মূলত ফ্যাটি লিভারের বড় কারণ। চাহিদার তুলনায় বেশি ক্যালরি গ্রহণ, ফাস্ট ফুড খাওয়া, দীর্ঘ সময় বসে থাকা, কম শারীরিক পরিশ্রম এবং ঘুমের অনিয়ম- এসব কারণে শরীরে অতিরিক্ত চর্বি জমতে থাকে। বিশেষ করে যাদের টাইপ-২ ডায়াবেটিস, স্থূলতা, উচ্চ ট্রাইগ্লিসারাইড বা ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স রয়েছে, তাদের ঝুঁকি অনেক বেশি। এছাড়া জিনগত কারণও ভূমিকা রাখতে পারে। ফ্যাটি লিভার সাধারণত দুই ধরনের হয়; অ্যালকোহলিক এবং নন-অ্যালকোহলিক। আমাদের দেশে নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভারের রোগীই বেশি দেখা যায়।
কী কী লক্ষণ দেখা দিতে পারে?
ফ্যাটি লিভারের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, প্রাথমিক অবস্থায় সাধারণত কোনো লক্ষণ বোঝা যায় না। অনেকেই দীর্ঘদিন বুঝতেই পারেন না যে তাদের লিভারে চর্বি জমছে। তবে রোগ বাড়লে কিছু উপসর্গ দেখা দিতে পারে। যেমন-
- সবসময় ক্লান্ত লাগা
- পেটের ডান পাশে অস্বস্তি বা ব্যথা
- হঠাৎ ওজন কমে যাওয়া
- চোখ বা ত্বক হলুদ হয়ে যাওয়া
- পা ফুলে যাওয়া
এই লক্ষণগুলো দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
ফ্যাটি লিভারের গ্রেড
চিকিৎসকরা সাধারণত ফ্যাটি লিভারকে তিনটি গ্রেডে ভাগ করেন।
- গ্রেড ১ হলো প্রাথমিক বা হালকা পর্যায়। এ সময় জীবনযাত্রা বদলালেই অনেক ক্ষেত্রে সমস্যা নিয়ন্ত্রণে আসে।
- গ্রেড ২ এ লিভারে চর্বি আরও বাড়ে এবং প্রদাহ শুরু হতে পারে।
- গ্রেড ৩ সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ। এই পর্যায়ে লিভারে মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে এবং সিরোসিস বা লিভার ফেইলিউরের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
দীর্ঘদিন চিকিৎসা না করলে লিভারে স্থায়ী দাগ পড়ে, যাকে ফাইব্রোসিস বা সিরোসিস বলা হয়। গুরুতর অবস্থায় এটি লিভার ক্যানসারের কারণও হতে পারে।
ফ্যাটি লিভার নিয়ন্ত্রণে যা খাবেন
ফ্যাটি লিভার নিয়ন্ত্রণে খাদ্যাভ্যাস সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন খাদ্যতালিকায় কোলিনসমৃদ্ধ খাবার রাখার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা। যেমন- ডিম, মাছ, চিংড়ি, সয়াবিন ও ফুলকপি। সবুজ শাক-সবজি, বিশেষ করে পালংশাক, বাঁধাকপি উপকারী। শর্করার জন্য সাদা ভাতের বদলে ওটস, ব্রাউন রাইস ও হোল গ্রেইন খাবার বেছে নেওয়া ভালো। ওমেগা-৩ সমৃদ্ধ খাবার যেমন সামুদ্রিক মাছ, কাঠবাদাম, ওয়ালনাট ও ফ্ল্যাক্সসিডও লিভারের জন্য উপকারী।
কোন খাবার এড়িয়ে চলবেন?
চিনি ও অতিরিক্ত শর্করা ফ্যাটি লিভারের বড় শত্রু। তাই কোমলপানীয়, মিষ্টি, আইসক্রিম, চকলেট, কেক-পেস্ট্রি ও অতিরিক্ত সাদা ভাত কমাতে হবে। এছাড়া তেলে ভাজা খাবার, প্রসেসড ফুড, অতিরিক্ত লাল মাংস এবং অ্যালকোহল পুরোপুরি এড়িয়ে চলা উচিত।

প্রতিরোধে যা করবেন
বিশেষজ্ঞদের মতে, শরীরের ওজন ৭ থেকে ১০ শতাংশ কমাতে পারলেও ফ্যাটি লিভারের ঝুঁকি অনেক কমে যায়। প্রতিদিন অন্তত ৩০ থেকে ৪০ মিনিট হাঁটা, ব্যায়াম বা সাঁতার শরীরের জন্য খুবই উপকারী। পাশাপাশি পর্যাপ্ত পানি পান, ঘুম এবং স্বাস্থ্যকর খাবারের অভ্যাসও জরুরি।
ফ্যাটি লিভারকে অবহেলা করার সুযোগ নেই। কারণ এটি নীরবে শরীরের বড় ক্ষতি করতে পারে। তাই সময়মতো সচেতন হওয়া এবং জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনা এখনই জরুরি।
সূত্র: হেলথলাইন, মেডিকেল নিউজ টুডে, ওয়েবএমডি
এসএকেওয়াই

