স্মৃতিমুকুরে কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী

সাহিত্য ডেস্ক সাহিত্য ডেস্ক
প্রকাশিত: ০১:৫৬ পিএম, ০২ জুন ২০২১ | আপডেট: ০২:৩৭ পিএম, ০২ জুন ২০২১

ফারুক সুমন

প্রিয়জনের মৃত্যুসংবাদ আমাদের ব্যথিত করে। শোকাহত হই। তাৎক্ষণিকভাবে মনের পর্দায় ছায়াছবির মতো ভেসে ওঠে স্মৃতিমুহূর্তগুলো। কখন কোথায় দেখা হয়েছিল, কথা হয়েছিল। সেসব ভিড় করে মনের অন্দরে। আর বুঝি এমন করে দেখা হবে না! এটাই তবে শেষ প্রস্থান! বেদনাহত হয়ে অবধারিত সত্য মৃত্যুকে মেনে নেই। থাকে কেবল স্মৃতি রোমন্থন, স্মৃতিতে অবগাহন। বেদনাহত মন নিয়ে বোবাকান্নার দ্বারস্থ হই। যেহেতু ভাষাশিল্পে সমর্পিত। সেহেতু স্মৃতিবেদনার উত্তরীয় গায়ে চেপে কলম হাতে স্মৃতির পথে নেমে পড়ি।

কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী (৩১ ডিসেম্বর ১৯৪৮-২৪ মে ২০২১) আমাদের প্রিয়জন, শ্রদ্ধাভাজন। ষাটের দশক থেকে মৃত্যু অবধি তিনি বাংলা কবিতায় সচল ছিলেন। নানামাত্রিক লেখায় বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন। কবিতা, উপন্যাস, ছড়া, অনুবাদসহ নানা মাধ্যমে অভিনবত্বের ছাপ রেখেছেন। বাংলা একাডেমির ‘মহাপরিচালক’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও তাঁর প্রধান পরিচয়, কবি। ব্যক্তি ও কবি দুই পরিচয়েই তিনি সমুজ্জ্বল। ২৪ তারিখ সোমবার রাত ১১টায় মৃত্যুবরণ করলেও এই সংবাদ আমি জেনেছি পরের দিন সকালে। ক্যান্সারে আক্রান্ত কবি বেশ কিছুদিন ধরে রাজধানীর শ্যামলীস্থ বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। তাঁর আশু রোগমুক্তির জন্য কবি-সাহিত্যিক, শুভার্থীরা প্রার্থনায় নত ছিলেন। প্রায় প্রতিদিন কবি কামরুল হাসান তাঁর চিকিৎসক বন্ধু ডা. তপন কুমার সাহার কাছ থেকে কবির শারীরিক অবস্থার আপডেট জানাতেন ফেসবুকে। মৃত্যুর দুদিন আগেও শারীরিক অবস্থার উন্নতির সংবাদ পেয়ে আমরা আশায় বুক বেঁধেছিলাম। ভেবেছি, স্রষ্টা বুঝি হাজারো কবিভক্তের আকুল প্রার্থনা কবুল করেছেন। কিন্তু না, স্রষ্টা তাঁর মর্জিমাফিক কবিকে ডেকে নিয়েছেন।

কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজীর মৃত্যুতে অগণিত ভক্তপাঠকের মতো আমিও ভীষণভাবে শোকাহত। মনের দর্পণে প্রতিফলিত হচ্ছে স্মৃতিছায়া। তাঁর সঙ্গে প্রথম দেখা হয়েছিল ২০১৭ সালের শুরুর দিকে। তিনি তখনো বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক পদে নিযুক্ত হননি। আমার কবিতাবই ‘অচঞ্চল জলের ভিতর নিরাকার বসে’র মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে অতিথি হয়ে এসেছিলেন। সেদিন ছিল ফেব্রুয়ারির ২১ তারিখ। ‘বাংলা ভাষা শিক্ষক পর্ষদ’ আয়োজিত অনুষ্ঠানে কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজীসহ অন্যান্য অতিথির সঙ্গে সংযোগ ও বরণ করার দায়িত্ব ন্যস্ত হয়েছে আমার ওপর। ‘বাংলা ভাষা শিক্ষক পর্ষদ’র তৎকালীন সভাপতি, ঢাকা কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. আয়েশা বেগম কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজীর মোবাইল নাম্বার আমাকে দিয়ে বললেন, ‘ফারুক, তাঁকে আমন্ত্রণপত্র পৌঁছে দিয়েছি। আপনি তাঁর সঙ্গে কেবল যোগাযোগ করে অনুষ্ঠানস্থলে নিয়ে আসার ব্যবস্থা করবেন।’

মিরপুর সরকারি বাঙলা কলেজ অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠান শুরুর সময় প্রায় সন্নিকটে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপ-উপাচার্য (বর্তমানে উপাচার্য) অধ্যাপক আখতারুজ্জামান। তিনিও চলে এসেছেন। বিশেষ অতিথি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. এ এস এম আবু দায়েনও এসেছেন। কেবল কবির অপেক্ষা। আমি তাঁর নাম্বারে কল দেই। কল রিসিভ করে পরিচয় দিতেই উৎকণ্ঠা নিয়ে জানালেন, ‘রাস্তায় প্রচণ্ড যানজট। আমি এখন কল্যাণপুর পার হয়েছি। আশাকরি অল্পসময়ের মধ্যে পৌছে যাবো।’ আমি কলেজের প্রধান গেইটে দাঁড়িয়ে তাঁর অপেক্ষায় আছি, একথা জানিয়ে ফোন রাখি। মিনিট দশেকের মধ্যে তিনি গাড়ি নিয়ে প্রবেশ করলেন। প্রথম সাক্ষাতে মনে হয়েছে তিনি অত্যন্ত সদালাপী ও আন্তরিক।

অনুষ্ঠানের উপস্থাপক বইয়ের মোড়ক উন্মোচন পর্বের ঘোষণা দিলেন। এমন সময় কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী মঞ্চে বসেই বললেন, ‘বইয়ের লেখক কোথায়? তাকেও মঞ্চে ডাকুন।’ মোড়ক উন্মোচনের সময় যদিও আমার মঞ্চে থাকার কথা। সংকোচ বোধ করায় মঞ্চে না উঠে একপাশে দাঁড়িয়ে ছিলাম। কিন্তু কবির আন্তরিক আহ্বানে সাড়া দিতেই হলো। মোড়ক উন্মোচন শেষে তিনি আমার বই থেকে একটি কবিতা পাঠ করলেন।

২০১৮ সালের ডিসেম্বর মাসে তিনি বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হিসেবে যোগ দেন। দায়িত্ব পাওয়ার পর আমাদের বিভিন্ন প্রয়োজনে কয়েকবার দেখা হয়েছে। মেসেঞ্জার কিংবা মুঠোফোনে মাঝেমধ্যে কথা হয়েছিল। ২০১৯ সালের অমর একুশে গ্রন্থমেলায় আমার প্রবন্ধগ্রন্থ ‘শিল্পের করতালি’ প্রকাশিত হয়েছে। বইটির সৌজন্য কপি দেওয়ার জন্য বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজীকে কল দেই। তিনি আমাকে বিকেলে তাঁর অফিসে যেতে বললেন। গিয়ে দেখি তিনি বাংলা একাডেমির মূল মঞ্চে বসে আছেন। তাঁর পাশে বসে আছেন অধ্যাপক আনিসুজ্জামান ও অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম। আমি সন্তর্পণে মঞ্চের সম্মুখভাগে গিয়ে বসি। এ আশায়, যদি তিনি আমাকে দেখেন। কিছুক্ষণ পর তিনি আসন ছেড়ে উঠে গেলেন। মঞ্চের বামপাশে সিঁড়িপথে দাঁড়িয়ে থাকা একজন ভদ্রলোককে মৃদুস্বরে কী যেন বললেন। ইঙ্গিতে আমাকে দেখিয়ে দিয়ে পুনরায় আসনে গিয়ে বসলেন। ভদ্রলোক সম্ভবত বাংলা একাডেমির কোনো কর্মচারী হবেন। কাছে এসে বললেন, ‘স্যার আপনাকে অপেক্ষা করতে বলেছেন। একসাথে কফি খাবেন।’

আমি অবাক হলাম। তিনি ইচ্ছা করলে আমার মতো একজন তরুণ লেখকের বইটি রেখে বিদায় দিতে পারতেন। তা না করে কফি পানের কথা বললেন। প্রায় আধা ঘণ্টা পর অনুষ্ঠান শেষ হলো। আমি মঞ্চের বামপাশে এগিয়ে তাঁর যাত্রাপথে দাঁড়ালাম। তিনি কাছে এসে বললেন, ‘সুমন, রুমে চলো।’ আমি তাঁকে অনুসরণ করলাম। তখন তাঁর সঙ্গে আনিসুজ্জামান স্যার ও রফিকুল ইসলাম স্যার ছিলেন। তাঁরা দু’জন একাডেমির কনফারেন্স রুমে গিয়ে বসেছেন। কারণ তাঁদের সঙ্গে তখন আরও অনেকেই ছিলেন। কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী আমাকে নিয়ে তাঁর কক্ষে এলেন। সহকারীকে কফির কথা বললেন।

‘কেমন আছ? কই, তোমার বই দাও। কনফারেন্স রুমে আবার স্যার অপেক্ষায় আছেন।’ বললেন তিনি। আমি তড়িঘড়ি করে ব্যাগ থেকে বইটি বের করে তাঁর হাতে দিলাম। তিনি বইটির পাতা উল্টিয়ে সূচিপত্র দেখতে দেখতে বললেন, ‘ভালো করেছ। তোমার কবিতার বই তো পড়েছি। মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে যেটা দিয়েছ। এবার প্রবন্ধও পড়া হবে। আমাদের সাহিত্য সমালোচনা বেশি বেশি হওয়া দরকার। তরুণদের মধ্যে এই আগ্রহ খুব একটা দেখি না। তুলনায় কম। তোমাকে অভিনন্দন সুমন। আমি আজ আর বেশি সময় দিতে পারবো না। স্যারেরা বসে আছেন।’ ইতোমধ্যে একজন কফি নিয়ে এলেন। কফি খেতে খেতে আমি কবিকে ধন্যবাদ দিলাম। তাঁর সাথে দাঁড়িয়ে ছবি তোলা শেষে তিনি বললেন, ‘তোমার ব্যস্ততা না থাকলে কনফারেন্স রুমে আসতে পারো।’ আমি সায় দিলাম। সেখানে আনিসুজ্জামান স্যার এবং রফিকুল ইসলাম স্যারের সঙ্গেও কথা হয়। কুশল বিনিময় শেষে মিনিট পাঁচেক পর আমি বিদায় নেই।

১৫ মার্চ ২০১৯। প্রিয় সংগঠন ‘বাংলাভাষা শিক্ষক পর্ষদ’র দশকপূর্তি অনুষ্ঠানে তিনি বিশেষ অতিথি হিসেবে এসেছিলেন। জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমি (নায়েম) মিলনায়তনে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। পর্ষদের একজন সক্রিয় সদস্য হিসেবে অনুষ্ঠানের যাবতীয় আমন্ত্রণপত্র বিতরণের দায়িত্ব পড়েছে আমার ওপর। সেদিন অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অধ্যাপক আনিসুজ্জামান স্যার। বিশেষ অতিথি হিসেবে আরও যারা ছিলেন- ভাষাসৈনিক সাবির আহমেদ চৌধুরী, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সুচরিতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং পিএসসির চেয়ারম্যান কবি মোহাম্মদ সাদিক। সেদিন মঙ্গলদীপ জ্বেলে অনুষ্ঠান উদ্বোধন হয়েছিল। আমার সৌভাগ্য, সেদিন মঙ্গলদীপ প্রজ্জ্বলনের সময় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান এবং কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজীর মতো গুণিজনের সান্নিধ্য পেয়েছি। দুঃখের বিষয়, তাঁরা দু’জনই এখন অন্যলোকের বাসিন্দা। তাঁদের সঙ্গে বাহিত স্মৃতিমুহূর্তগুলো আমার জন্য মূল্যবান সঞ্চয়।

জুনের মাঝামাঝি তাঁর সঙ্গে দেখা হয়েছে খেলার মাঠে। ‘কবি-কথাসাহিত্যিক প্রীতি ক্রিকেট ম্যাচ-২০১৯’র চূড়ান্ত পর্বে তিনি অতিথি। খেলা শেষে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার ও ট্রফি তুলে দেবেন। ২১ তারিখ ঠিক দুপুর দু’টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের মাঠে খেলা শুরু হয়েছে। সাদা পায়জামা-পাঞ্জাবি পরিহিত কবি মাঠে এলেন। বিশেষ একটি ওভারে ব্যাটিংও করেছিলেন। আমি তখন উইকেট কিপার ছিলাম। তিনি হাসতে হাসতে বললেন, ‘সুমন, তুমি কথাসাহিত্যিকদের টিমে কেন?’ বললাম, ‘আমি তো গল্পও লিখি।’ মজার ব্যাপার, কথাসাহিত্যিকদের টিম ‘খোয়াবনামা’ সেদিন কবিদের দল ‘গীতাঞ্জলি’কে হেসেখেলে হারিয়ে দিয়েছে।

২০২০ সালের সেপ্টেম্বর মাসের কোনো একদিন তাঁকে মোবাইলে কল দেই। উদ্দেশ্য, ‘শামসুর রাহমানের কাব্যস্বর’ শীর্ষক প্রবন্ধগ্রন্থটি বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশ করার সুযোগ আছে কি-না জানার জন্য। তিনি আমার পাণ্ডুলিপি নিয়ে একদিন একাডেমিতে যেতে বললেন। কিন্তু ইতোমধ্যে প্রবন্ধগ্রন্থটি প্রকাশের ব্যাপারে ‘পুথিনিলয় প্রকাশনী’ সম্মত হয়েছে। ফলে একাডেমিতে আর যাওয়া হয়নি। দেখাও হয়নি। সমকালীন বাংলা কবিতার গুরুত্বপূর্ণ কবিকে আমরা হারালাম। তিনি ছিলেন একজন সংবেদনশীল বিনয়ী কবি। সর্বোপরি মানবিক মানুষ। আমার সৌভাগ্য, আপনার শিল্পসঙ্গ পেয়েছি। স্মৃতিমুহূর্তগুলো কখনো ভোলার নয়। ওপারে ভালো থাকুন, প্রিয় কবি।

লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক

এসইউ/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]