আরজ আলী মাতুব্বরের মৃত্যুবার্ষিকী আজ


প্রকাশিত: ০২:২১ পিএম, ১৫ মার্চ ২০১৭
আরজ আলী মাতুব্বরের মৃত্যুবার্ষিকী আজ

মানবতাবাদী চিন্তাবিদ ও বিজ্ঞানমনষ্ক লেখক আরজ আলী মাতুব্বরের মৃত্যুবার্ষিকী আজ। তিনি মানুষের মাঝে মুক্তচিন্তার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে গেছেন নিজের অপরিসীম যুক্তির আলোকে। যিনি সৃষ্টি ধর্মের আলোকবর্তিকায় ধর্মীয় অন্ধকার দূর করার স্বপ্ন দেখেছেন, দেখিয়েছেন।

বরিশাল শহর থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার দূরে চরবাড়িয়া ইউনিয়নের ছোট্ট গ্রাম লামচরির এক গরিব কৃষক পরিবারে জন্ম হলেও তার জ্ঞানসাধনা ছাড়িয়ে গেছে ৫৬ হাজার বর্গমাইলের এই বাংলাদেশকেও।

তথাকথিত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত না হয়েও আরজ আলী মাতুব্বরই অতিথি শিক্ষক হিসেবে ক্লাস নিয়েছেন ঢাকা ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। আধুনিক যুগেও একজন মানুষ যে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই নিজ প্রচেষ্টায় জ্ঞান-বিজ্ঞানের নানা শাখায় পান্ডিত্য অর্জন করতে পারেন, তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ আরজ আলী মাতুব্বর।

আরজ আলী নিজ গ্রামের মুন্সি আবদুল করিমের মসজিদের মাধ্যমে পরিচালিত মক্তবে সীতানাথ বসাকের কাছে ‘আদর্শলিপি’ পড়তেন। কিন্তু দরিদ্রতার কারণে তাঁকে মক্তব ছাড়তে হয়। এরপর তিনি কৃষিকাজে নিয়োজিত হন।  পরে এক সহৃদয় ব্যক্তির সহায়তায় তিনি ২য় শ্রেণি পর্যন্ত পড়া শেষ করেন। সাথে সাথে তিনি নিজের ঐকান্তিক চেষ্টায় বাড়িতে বসেই লেখাপড়া শিখতে থাকেন।

নিজের জ্ঞানের পিপাসা মেটাতে তিনি বরিশাল পাবলিক লাইব্রেরির সমস্ত বাংলা বই একজন মনোযোগী ছাত্রের মতো পড়েন। দর্শন ছিল তার প্রিয় বিষয়। কিন্তু তার জ্ঞান পিপাসা মিটানোর মতো পর্যাপ্ত বই পাঠাগারে ছিলো না। পরে বই পড়ার প্রতি তার আগ্রহ দেখে বিএম কলেজের দর্শনের শিক্ষক কাজী গোলাম কাদির মোহিত হন এবং তিনি কলেজের পাঠাগার থেকে তাকে বই ধার দেয়ার ব্যবস্থা করে দেন। এভাবেই প্রচণ্ড ইচ্ছাশক্তি আর কৌতূহলী মনের কারণে নানা প্রতিবন্ধকতা পেছনে ফেলে স্বশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে দার্শনিক, যুক্তিবাদী ও মুক্তচিন্তার অধিকারী মানুষ হয়ে ওঠেন তিনি।

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ঘাটতি সত্ত্বেও তিনি বেশ কিছু বই লেখেন। তার লেখনীর মধ্য দিয়ে তিনি বহুল প্রচলিত নানা বিশ্বাস ও অজ্ঞতার বিরুদ্ধে নির্ভীক যুক্তিসংগত মত প্রকাশ করেন। ফলে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ, এমনকি অনেক সময় রাষ্ট্রীয় বাহিনীরও চক্ষুশূল হন। কিন্তু তার রচনাগুলো চিন্তাশীল মানুষের কাছে জনপ্রিয়তা পায়। ধর্ম, জগত ও জীবন সম্পর্কে নানামুখী জিজ্ঞাসা তার লেখায় উঠে এসেছে, যা থেকে তার প্রজ্ঞা, মুক্তচিন্তা ও মুক্তবুদ্ধির পরিচয় পাওয়া যায়। তার লেখালেখিতে যে দার্শনিক চিন্তার প্রতিফলন ঘটে তা সবাইকে বিস্মিত করে। সমাজের নানা কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাসকে তিনি যুক্তি দিয়ে চ্যালেঞ্জ করেন।

প্রথা বিরোধী এ লেখককে তার বইগুলো প্রকাশে অনেক বাধা পেরুতে হয়েছিলো। ১৯৭৩ সালে তার প্রথম বই ‘সত্যের সন্ধানে’ প্রকাশ হয়। লেখালেখির সূচনার পর থেকে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি ১৫ খানি পাণ্ডুলিপি রচনা করে গেছেন। এর মধ্যে তার জীবদ্দশায় প্রকাশিত চারটি বইয়ের নাম, সত্যের সন্ধানে (১৯৭৩), সৃষ্টির রহস্য (১৯৭৭), অনুমান (১৯৮৩), স্মরণিকা (১৯৮২)। মৃত্যুর কিছুকাল পরে প্রকাশিত হয় আরেকটি বই। এর নাম ‘মুক্তমন’ (১৯৮৮)।

গ্রন্থাকারে প্রকাশিত এই বইগুলো ছাড়াও রয়েছে আরো কয়েকটি পাণ্ডুলিপি। এগুলোর নাম হচ্ছে- সীজের ফুল (কবিতা), সরল ক্ষেত্রফল (গলিত), জীবন বাণী (আত্মজীবনী), ভিখারীর আত্মকাহিনী (আত্মজীবনী), কৃষকের ভাগ্য গ্রহ (প্রবন্ধ), বেদের অবদান (প্রবন্ধ), পরিচয়, আমার জীবন দর্শন। এছাড়া, ঘটনাবলী, জন্ম বংশাবলী, বংশ পরিচয়, অধ্যয়নসার, ডাইরী ইত্যাদি পাণ্ডুলিপিও সংরক্ষিত রয়েছে। তার বেশ কিছু লেখা ‘আরজ আলী মাতুব্বর রচনাবলী’ নামে কয়েকটি খণ্ডে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়েছে এবং কিছু লেখা ইংরেজিতেও ভাষান্তর করা হয়েছে।

তদানীন্তন পাকিস্তানে তার কয়েকটি বইয়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা ছিল। তিনি বাংলা একাডেমির আজীবন সদস্য ছিলেন। পেয়েছেন হুমায়ুন কবির স্মৃতি পুরস্কার ও উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী কর্তৃক বরণীয় মনীষী হিসেবে সম্মাননা। তার সারা জীবনের উপার্জন দিয়ে জমি না কিনে তৈরি করেছিলেন গ্রামের মানুষের জন্য পাঠাগার।

নদীভাঙনে জমি হারিয়ে কাঁদেননি, কিন্তু সংগ্রহ করা বই নদীতে ভেসে যাওয়ায়, ছেলে হারানোর শোকে শোকার্ত হয়েছেন এ চাষি। আজীবন মানব কল্যাণে নিয়োজিত আরজ আলী মাতুব্বর মৃত্যু পরবর্তীকালে তার মৃতদেহটিও যাতে জনকল্যাণে ব্যবহৃত হয় সেজন্য তিনি বরিশাল মেডিকেল কলেজকে তাঁর দেহদান করে যান। আর মরণোত্তর চোখ দান করে যান দৃষ্টিহীনের চোখে আলো ফোটানোর লক্ষ্যে।

আরজ আলী জীবদ্দশাতেই তার সমাধি রচনা করে গেছেন। এও এক ব্যতিক্রমী ঘটনা এই ব্যতিক্রমী পুরুষের। যেহেতু তার মৃত শরীর প্রচলিত প্রথা মাফিক মাটিতে শয়ান করার সুযোগ রাখেননি তাই জীবৎকালেই এক অশ্রুতপূর্ব ব্যবস্থা করে গেছেন। ৩ পৌষ ১৩৮৬ সাল। প্রবীণ আরজ আলী মাতুব্বরের ৮০ বছর বয়স পূর্ণ হয়। এ দিনেই তিনি পূর্ব পরিকল্পনানুযায়ী তার স্মৃতি সংরক্ষণার্থে সমাধি নির্মাণ করেন। নিজ দেহের কয়েকটি অংশ দ্বারা তিনি এই স্মৃতিধারক সমাধিস্থল রচনা করেন।

শারীরিক অংশগুলোর মধ্যে রয়েছে চুল, দাড়ি, নখ ও কয়েকটি দাঁত। এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তার স্বপ্নের সাধনার লাইব্রেরি ভবনের সীমানার মধ্যে উঁচু বেদী আকারে নির্মিত পাকা সমাধির মধ্যে একটি কাঁচের বয়ামে করে এগুলো রাখা হয়। এরপর থেকে তিনি জীবনের শেষ কটি দিন পরম প্রশান্তি বোধ করেছেন।

নানা গুণে গুণী এই মানুষটি ১৯৮৫ সালের ১৫ মার্চ ৮৬ বছর বয়সে বরিশাল শেরে বাংলা চিকিৎসা মহাবিদ্যালয় (শেবাচিম) হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। যে গ্রামে তার মায়ের কবর দেওয়ার জন্য মানুষ পাওয়া যায়নি, সেই ক্ষুদ্র লামচরির এক অশিক্ষিত কৃষক আরজ আলী মাতুব্বরকে মৃত্যুর পর শেষ শ্রদ্ধা জানাতে ঢল নেমেছিল মানুষের। সেদিনই প্রমাণ হয়ে গেছে, আরজ আলী মাতুব্বর বড় হতে হতে ছাড়িয়ে গেছেন ৫৬ হাজার বর্গমাইলের সীমানাও।

এইচআর/পিআর