এবং বই: বইবিষয়ক চিন্তার প্লাটফর্ম

সাহিত্য ডেস্ক সাহিত্য ডেস্ক
প্রকাশিত: ০১:২২ পিএম, ২৫ জানুয়ারি ২০২১

আমিনুল ইসলাম সেলিম

বাংলাদেশে যেসব মাসিক বা ত্রৈমাসিক পত্রিকার প্রচলন রয়েছে, এর মধ্যে কিছুটা ব্যতিক্রম হিসেবেই চিহ্নিত হতে পারে ফয়সাল আহমেদ সম্পাদিত ‘এবং বই’। ব্যতিক্রমটি মূলত ধরনের দিক থেকে হলেও বিষয়বৈচিত্র্যেও আছে আলাদা করে বলার মতো বেশিষ্ট্য। আপনাদের জানা আছে, শুধু বই নিয়ে বিশেষভাবে উল্লেখ করার মতো তেমন পত্রিকা এ দেশে নেই। ফয়সাল এখানে ব্যতিক্রম হবেন বই আলোচনার মতো একটা জটিল বিষয়কে প্রাধান্য দিয়ে লাগাতার প্রকাশনার ক্ষেত্রে। বাংলাদেশে লিটলম্যাগ বা ছোটকাগজ প্রকাশনার ধারাবাহিকতায় সম্ভবত এটি ব্যতিক্রম সংযোজন।

বেশ আগ্রহ নিয়ে সংগ্রহ করা ‘এবং বই’ অক্টোবর-ডিসেম্বর সংখ্যাটি পড়তে পড়তে মনে হলো, এতে মুজিববর্ষকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে আলাদাভাবে। সম্পাদকীয় পড়ে বিষয়টা আরও পরিষ্কার হলো।

সূচির প্রথমেই আছে তরুণ কবি ও প্রাবন্ধিক পিয়াস মজিদের নাম। তাঁর লেখা আমি পছন্দ করি। এ সংখ্যায় তাঁর অনুসন্ধানী এবং তাৎপর্যপূর্ণ নিবন্ধটির শিরোনাম ‘বঙ্গবন্ধুর দুটো বইয়ে সাহিত্য ও সাহিত্যিক প্রসঙ্গ’। বঙ্গবন্ধুর পাঠাগ্রহ এবং সাহিত্যিকদের সাথে আন্তরিক সম্পর্কের ব্যাপারটা জানা থাকলেও পিয়াস মজিদের লেখাটি পড়তে পড়তে বঙ্গবন্ধুর পাঠসমৃদ্ধি ও লেখকসঙ্গকে নতুন করে জানার সুযোগ হলো। রবীন্দ্রনাথ-নজরুলসহ বাঙালি কবি সাহিত্যিকদের কাছাকাছি আসা ছাড়াও পৃথিবীর নানা প্রান্তের লেখকদের সংস্পর্শ তাঁকে কতোটা আনন্দিত করতো, এ লেখা তার সাক্ষ্য দেয়। বঙ্গবন্ধু দেশ-বিদেশের নামি সব পত্র-পত্রিকা সংগ্রহে রাখতেন। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের খবর রাখতেন। বাসায় বা অফিসে থাকা ছাড়াও জেলে কাটানো সুদীর্ঘকাল বই এবং পত্রিকা তাঁর সঙ্গী ছিল। মাঝেমাঝে কারা কর্তৃপক্ষ তাঁকে বই বঞ্চিত করলে মনোকষ্ট কতোটা গভীর হয়ে উঠতো, সেটিও এ আলোচনা থেকে সহজে অনুধাবন করা যায়। পিয়াস মজিদ অত্যন্ত যত্নে বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ এবং ‘কারাগারের রোজনামচা’ থেকে তথ্যগুলোকে সন্নিবেশিত করেছেন। নিবন্ধটি বঙ্গবন্ধুর পাঠসমৃদ্ধির বড় পরিচায়ক।

কথাসাহিত্যিক মনি হায়দার নিজের লেখা গল্পের সংকলন ‘গল্প পঞ্চাশ’, গল্পকার জীবনের টানাপোড়েন এবং গল্প লেখার প্রেক্ষাপট নিয়ে যে লেখাটি লিখেছেন, এর শিরোনাম ‘গল্প পঞ্চাশ: আমার প্রার্থনা, আমার আমির রক্তমাখা তরবারি’। প্রতিটা মানুষের জীবনই আসলে শত শত গল্পের আকর। জীবনের গল্পের কোনো শেষ নেই। একেকটা গল্প তৈরির পেছনে থাকে লেখকের কতো যে রক্তক্ষরণ, কতো যে আনন্দ-বেদনার ইতিহাস, তারই কিছুটা ইঙ্গিত পাওয়া যাবে লেখাটিতে। মনি হায়দার জানাচ্ছেন, তার লেখা দুশ বিশটি গল্প থেকে বাছাই করে গল্প পঞ্চাশ সাজিয়েছিলেন তিনি। সংকলিত হয়ে গ্রন্থটি পাঠকের সামনে এলেও পেছনের গল্প পড়েছিল পেছনেই। এই লেখা এর কিছুটা উন্মোচন করেছে। উন্মোচন করেছে এ সত্যও যে, অতৃপ্তিই লেখককে নতুন করে অনুপ্রেরণা যোগায়।

এবং বইয়ের এ সংখ্যা প্রকাশ করেছে কবি গবেষক সম্পাদক ও প্রকাশক সৈকত হাবিবের একটি সাক্ষাৎকার। সাক্ষাৎকারটিতে ব্যক্তিগত লেখালেখির বাইরে হাসান আজিজুল হকের রচনাবলী সম্পাদনা, বাংলাদেশের প্রকাশনা, পাঠাগার আন্দোলন ইত্যাদি বিষয়ে বিচিত্র আলাপনের মধ্য দিয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে। উঠে এসেছে করোনাকালীন জীবনের খণ্ডচিত্রও। বিশেষ করে উল্লেখযোগ্য হতে পারে কতিপয় লেখকের ছদ্মবেশ ধারনের বিষয়ে মন্তব্য। মন্তব্য করেছেন প্রকাশনা শিল্পের ভণ্ডামি নিয়েও। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন সম্পাদক নিজেই।

বই আলোচনা পর্বে বিশিষ্ট সাংবাদিক, চলচ্চিত্র নির্মাতা ও বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ট ব্যক্তি ওয়াহিদুল হকের লেখা ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব: আ লিডার উইথ আ ডিফারেন্স’ শীর্ষক বইটি নিয়ে লেখেন অনুবাদক আলম খোরশেদ। বঙ্গবন্ধুর জীবদ্দশায়ই ১৯৭৩ সালে বিলেত থেকে ইংরেজি ভাষায় বইটি প্রকাশ হয়। পরে সেটি বাংলাদেশের একটি প্রকাশনা সংস্থা বাংলা ভাষায় বের করে। আলোটনাটি পড়ে ধারণা করতে কোনো দ্বিধা হয় না যে অত্যন্ত মূল্যবান, প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ও ইতিহাসনির্ভর একটি বই সম্পর্কে আমাদের জানাচ্ছেন তিনি। বঙ্গবন্ধুর সাথে ঘনিষ্ট সম্পর্ক থাকলেও তাৎক্ষণিক আবেগ বা আদর্শগত আনুগত্যের দায় এড়িয়ে লেখা বইটিতে বঙ্গবন্ধুর প্রথম পঞ্চাশ বছরের সংগ্রামী জীবন, ব্যক্তি জীবনের নানা জটিলতা পার হওয়ার অজানা অধ্যায়, তাঁর অপরিসীম সাহসিকতা, বাংলাদেশ সৃষ্টির পরিকল্পনা, এমনকি সত্যিকার রাষ্ট্রনায়ক হয়ে ওঠার নানা দিক বইটিকে অবশ্যপাঠ্য করে তুলেছে। এ কারণেই আলোচনাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

শিশুসাহিত্যিক আখতার হুসেন সম্পাদিত বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে ছোটদের গল্পের সংকলন ‘জনকের মুখ’ প্রসঙ্গে লিখেছেন অনুবাদক হামিদ কায়সার। ৪৫৬ পৃষ্ঠার ঢাউস সংকলনে স্থান পাওয়া নবীন-প্রবীণ গল্পকারদের ৫৫টি গল্পকে তিনি চার ভাগে ভাগ করেছেন। এরমধ্যে রয়েছে বঙ্গবন্ধুর কর্ম ও জীবনভিত্তিক গল্প, বঙ্গবন্ধুর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাবজাত মুক্তিযুদ্ধের গল্প, বঙ্গবন্ধুর মৃত্যু পরবর্তী পরিস্থিতির গল্প এবং মুক্তিযুদ্ধের গল্প। আলোচনায় অধিকাংশ গল্পের ধরন, বিষয়বস্তু ও অন্যান্য প্রেক্ষাপট নিয়ে লিখেছেন তিনি। আলোচনাটিতে বেশ কিছু গল্পের শিল্পমান সম্পর্কে যেমন ধারণা দেওয়া হয়েছে, তেমনি কিছু গল্পের অন্তর্ভুক্তি নিয়েও প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে। তবে বিশেষ দ্রষ্টব্যে ‘জনকের মুখ’ বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখা ছোটগল্প বইয়ের ওপর লিখিত এ পাঠ-প্রতিক্রিয়াটি কেবল প্রথম বত্রিশটি গল্পকে ঘিরে- এটুকু লেখা বোধহয় জরুরি ছিল না। কেননা ঘুরেফিরে সবগুলো গল্পের কথাই আলোচনায় চলে এসেছে।

বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের গবেষক মুনতাসীর মামুন রচিত ‘বঙ্গবন্ধু কীভাবে আমাদের স্বাধীনতা এনেছিলেন’ শীর্ষক গ্রন্থের আলোচনা করেছেন মামুন সিদ্দিকী। মামুন সিদ্দিকী প্রাবন্ধিক ও গবেষক; যে কারণে তিনি অনুসন্ধিৎসু মন নিয়ে বইটির একটি পূর্ণাঙ্গ ও বিশ্লেষণমূলক আলোচনা উপহার দিয়েছেন। বইটিতে বঙ্গবন্ধুর উত্থান পর্বের বিভিন্ন অধ্যায়, তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দর্শন, বাংলাদেশ রাষ্ট্র নিয়ে তার পরিকল্পনা, তাঁর আন্তঃ ও বহির্যোগাযোগের উপযোগিতা তুলে এনেছেন সাবলীলভাবে। শুধু তা-ই নয়, বঙ্গবন্ধুর বিষয়ে অপপ্রচারের বিরুদ্ধে এটি যে একটি মূল্যবান দালিলিক জবাব হতে পারে, তা-ও এ আলোচনাপাঠে অবগত হওয়া যায়। প্রাবন্ধিক ও গবেষক মামুন সিদ্দিকীর ভাষ্যে মননশীল পাঠকের কাছে বইটি হয়ে উঠবে অধিক আগ্রহের কেন্দবিন্দু- সন্দেহ নেই।

এ সংখ্যায় ছাপা হয়েছে আফসানা চৌধুরী রচিত ‘হিন্দু জনগোষ্ঠীর একাত্তর’ শীর্ষক বইয়ের যুক্তিনিষ্ঠ এবং আবেগঘন আলোচনা। আলোচনাটি লিখেছেন অনুবাদক ও গবেষক সুরজিৎ রায় মজুমদার। গ্রন্থটিকে তিনি একটি সংখ্যালঘু গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের আত্মত্যাগের পক্ষে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত বলে অভিহিত করেছেন। বইটি মুক্তিযুদ্ধর ইতিহাসচর্চার ক্ষেত্রেও যে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখার দাবিদার- সে উপলব্ধিও আলোচনার মাধ্যমে পাঠকমনে জাগিয়ে তোলেন তিনি।

কলামিস্ট এবিএম মুসাকে বঙ্গবন্ধু আদর করে ডাকতেন মুসিবত বলে। তার লেখা ‘মুজিব ভাই’ নিয়ে মোটোমুটি দীর্ঘ একটি আলাচনা লিখেছেন গীতিকার ও গল্পকার সিরাজুল এহসান। গ্রন্থটিতে অনেক আলোচিত বিষয়ের প্রত্যক্ষ ও দালিলিক প্রমাণ ছাড়াও একেবারে অনালোচিত এবং আজানা বিষয়ের সূত্রপাত করে বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে যে পরিষ্কার ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে, সেটিকে মনোমুগ্ধকর উপস্থাপনায় তুলে ধরেছেন তিনি।

বাংলাদেশের লোকগানে বঙ্গবন্ধুর উল্লেখযোগ্য উপস্থিতির ধারণাকে পাঠকের সামনে প্রথমে তুলে এনেছিলেন গবেষক সুবলকুমার বণিক। তাঁর সংকলন ও সম্পাদনায় ২০১৭ সালে প্রকাশিত বই ‘বাউল গানে বঙ্গবন্ধু’। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৯ সালে আরেক গবেষক আমিনুর রহমান সুলতান সংকলন ও সম্পাদনা করেন ‘লোকগানে জনকের মুখ’। দুটো বই নিয়েই চমৎকার আলোচনা লিখেছেন ছড়াকার ও শিশুসাহিত্যিক সঞ্জয় সরকার।

এ সময়ের উল্লেখযোগ্য তরুণ গল্পকার ও অনুসন্ধানী প্রাবন্ধিক মোজাফ্ফর হোসেনের গল্পগ্রন্থ ‘অতীত একটা ভীনদেশ’ নিয়ে লিখেছেন কথাসাহিত্যিক সালাহ উদ্দিন মাহমুদ। বইভুক্ত গল্পগুলোর বিশ্লেষণধর্মী আলোচনা করছেন তিনি। আলোচনাটি চমৎকার। এতে বাংলাদেশের নবীন গল্পকারদের গল্পপ্রচেষ্টার একটি সরল চিত্রও আঁকতে চেয়েছেন আলোচক।

কবি ও কথাসাহিত্যিক ইভান অনিরুদ্ধর স্বল্পায়তনের উপন্যাস ‘নিষিদ্ধ লোবানের ঘ্রাণ’ গ্রন্থটির আলোচনা করেছেন ইলিয়াস বাবর। এ আলোচনায় ঔপন্যাসিকের স্বকীয় সত্তাকে উন্মোচনের পাশাপাশি উপন্যাসটির বিষয়বৈচিত্র্য এবং বিষয়-বাস্তবতার নাতিদীর্ঘ ব্যাখ্যা দিয়েছেন।

সবশেষে এবং বইয়ে ছাপা হয়েছে বাংলাসাহিত্য ও সংস্কৃতির তিন মহীরুহের মৃত্যুসংবাদ। এর মধ্যে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান গত বছরের ১৮ মে, চিত্রশিল্পী মুর্তজা বশির ১৫ আগস্ট এবং কথাসাহিত্যিক রাহাত খান মারা গেছেন ২৮ আগস্ট। মৃত্যুসংবাদের পাশাপাশি তাদের কর্মযজ্ঞ ও পুরস্কারপ্রাপ্তি সম্পর্কেও সংক্ষেপে আলোচনা করার বিষয়টি প্রশংসনীয়। তবে একটি কথা না বললেই নয়, আমার কাছে শিরোনামগুলোকে খুব সাদামাটা মনে হয়েছে- দৈনিক সংবাদপত্রের শিরোনামের মতো। যেহেতু এটি একটি ছোট কাগজ এবং এতে অন্তর্ভুক্ত যেকোনো লেখারই একটি স্থায়িত্ব আছে, সে কারণে এসব ক্ষেত্রে শিরোনামে আরও মুন্সিয়ানা থাকা উচিত বলে মনে হয়।

লেখার ফাঁকে ফাঁকে এ সংখ্যায় ‘নতুন বই বাছাই বই’ শিরোনামে ছাপা হয়েছে বেশকিছু বইয়ের কভার ও সংক্ষিপ্ত পরিচিতি। বিষয়টি খুব প্রশংসনীয়। দ্যু প্রকাশনের দায়িত্বে প্রকাশিত পুরো পত্রিকাটি প্রায় বিজ্ঞাপনবিহীন। ‘এবং বই’য়ের জন্য অফুরন্ত শুভ কামনা।

এসইউ/এমকেএইচ

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]