চীনের ‘দ্য পেপার’

দেশের স্বার্থ, জনআকাঙ্ক্ষা ও ফ্যাক্ট-চেকিংয়ে ভারসাম্যই গণমাধ্যম নীতি

জেসমিন পাপড়ি
জেসমিন পাপড়ি জেসমিন পাপড়ি , কূটনৈতিক প্রতিবেদক চীন থেকে ফিরে
প্রকাশিত: ০২:১৯ পিএম, ১৬ মে ২০২৬
চীনের সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন বাংলাদেশের প্রতিনিধিদল

রাষ্ট্রনীতি, জনআকাঙ্ক্ষা আর তথ্যযাচাইয়ের লড়াই যেন একসঙ্গে চলছে চীনের মিডিয়া দুনিয়ায়। এমন এক বাস্তবতার ঝলকও মিললো সাংহাইয়ের গণমাধ্যম ‘দ্য পেপার’-এ।

সাংহাইয়ের ডিজিটাল সংবাদমাধ্যম দ্য পেপারের কার্যালয় পরিদর্শনে গিয়ে চীনের গণমাধ্যম কাঠামো, নীতি এবং তথ্য যাচাই প্রক্রিয়া সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।

ঢাকা থেকে ১৬ সদস্যের এক প্রতিনিধিদলের সদস্য হয়ে চীনা দূতাবাসের আমন্ত্রণে সম্প্রতি চীন সফরে যান এ প্রতিবেদক। সফরের অংশ হিসেবে সাংহাই ইউনাইটেড মিডিয়া গ্রুপের অধীন প্রতিষ্ঠানটি ঘুরে দেখেন এবং সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।

২০১৪ সালে যাত্রা শুরু করে ‌‘দ্য পেপার’। এটি মূলত ওয়েবসাইট, মোবাইল অ্যাপ ও সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে সংবাদ পরিবেশন করে থাকে।

প্রতিষ্ঠানটির ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, ‘দ্য পেপার’ প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩০০টি আর্টিকেল প্রকাশ করে। অ্যাপ ও ওয়েবসাইট মিলিয়ে তাদের পাঠক ও দর্শক সংখ্যা ৩০ কোটির বেশি। অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, অর্থনীতি এবং বিশ্লেষণধর্মী কনটেন্টকে তারা বিশেষ গুরুত্ব দেয়।

সফরে সাংবাদিকদের জানানো হয়, চীনের গণমাধ্যম ব্যবস্থায় রাষ্ট্রীয় নীতি অনুসরণ করার পাশাপাশি জনস্বার্থ ও পাঠকের তথ্যচাহিদা পূরণের মধ্যেও ভারসাম্য রাখার চেষ্টা করা হয়। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে জোর দেওয়া হয় একাধিক নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে তথ্য যাচাইয়ের ওপর।

‘দ্য পেপার’-এর ফ্যাক্ট চেকিং টিমের সদস্য ফেঙ্গ মেঙ্গ জানান, ভুয়া তথ্য এখন বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে গুজব দ্রুত ছড়াচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে ২০২১ সালে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে ফ্যাক্ট চেকিং কার্যক্রম শুরু করে।

তিনি আরও জানান, গত সাড়ে চার বছরে তাদের টিম ৯ শতাধিক ফ্যাক্ট-চেক রিপোর্ট প্রকাশ করেছে, যা প্রায় ৯০ কোটি ভিউ পেয়েছে। তারা শুধু তথ্য খণ্ডন না করে উৎস অনুসন্ধান ও প্রমাণভিত্তিক ব্যাখ্যার মাধ্যমে ভুল তথ্যের পেছনের প্রক্রিয়াও তুলে ধরে।

আরও পড়ুন
চীনের বিভিন্ন শহরে হবে ৩০টি ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ আউটলেট 
উচ্চ মূল্যস্ফীতি-বিনিয়োগ স্থবিরতায় চাপ বাড়ছে অর্থনীতিতে 

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংঘাত ও উত্তেজনাকে ঘিরে ছড়ানো ভুয়া ভিডিও ও গুজব নিয়েও কাজ করার কথা জানান তিনি। ফেঙ্গ মেঙ্গ বলেন, আমরা সরাসরি কোনো তথ্যকে উড়িয়ে না দিয়ে উৎস ও প্রেক্ষাপট যাচাইয়ের মাধ্যমে সত্য তুলে ধরার চেষ্টা করি।

তিনি বলেন, আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্সের (এআই) কারণে ভুয়া তথ্য শনাক্ত করা আরও জটিল হয়ে উঠছে। চ্যাটজিপিটি, জেমিনি ও ডিপসিকসহ বিভিন্ন এআই মডেল আমরা পরীক্ষা করছি, যাতে বোঝা যায় এগুলো কীভাবে তথ্য যাচাই প্রক্রিয়ায় সহায়তা বা বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে।

এছাড়া ‘দ্য পেপার’ একটি পাবলিক টুলবক্স চালু করেছে, যার মাধ্যমে সাধারণ ব্যবহারকারীরাও ফ্যাক্ট-চেকিং পদ্ধতি শিখতে পারেন। প্রতিষ্ঠানটির চীনা ও ইংরেজি দুই ভাষার সংস্করণ রয়েছে। তারা নিয়মিত আন্তর্জাতিক ফ্যাক্ট-চেক সম্মেলন ও একাডেমিক কর্মশালায়ও অংশ নেয়।

বাংলাদেশি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে মতবিনিময়ে উ তিং বলেন, চীনের গণমাধ্যম রাষ্ট্রীয় নীতি অনুসরণ করে কাজ করে, একই সঙ্গে জনগণের প্রত্যাশাও প্রতিফলিত করার চেষ্টা থাকে। তার ভাষায়, রাষ্ট্রীয় নির্দেশনা ও জনআকাঙ্ক্ষার মধ্যে একটি ভারসাম্য বজায় রাখা হয়।

তিনি আরও বলেন, চীনের গণমাধ্যমকে আইন ও কমিউনিস্ট পার্টির নীতিমালা মেনে চলতে হয়। পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের পাঠকের চাহিদা পূরণের দিকেও নজর রাখতে হয়। ভুল তথ্য এড়াতে সতর্ক থাকা এবং যাচাই না হওয়া খবর প্রকাশ না করার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়।

বাংলাদেশ ও চীনের রাজনৈতিক ব্যবস্থার পার্থক্য থাকলেও জলবায়ু পরিবর্তন ও ভূ-রাজনীতির মতো বৈশ্বিক ইস্যুতে মতবিনিময়ের সুযোগ রয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

তথ্য সংগ্রহ প্রসঙ্গে উ তিং জানান, ‘দ্য পেপার’ বহুস্তরীয় সোর্স ব্যবহার করে। প্রাথমিকভাবে তারা সিনহুয়া নিউজ এজেন্সিকে গুরুত্ব দিলেও একই সঙ্গে এপি, রয়টার্স ও দ্য নিউইয়র্ক টাইমসসহ আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম থেকেও তথ্য যাচাই করে থাকে।

বিশ্লেষকদের মতে, চীনের ডিজিটাল মিডিয়া ইকোসিস্টেম দ্রুত সম্প্রসারিত হয়েছে। একই সঙ্গে ভুয়া তথ্য নিয়ন্ত্রণ ও রাষ্ট্রীয় নীতির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষাই সেখানে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।

জেপিআই/কেএসআর

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।