খসড়া সম্প্রচার অধ্যাদেশ

সরকারি নির্দেশনা অমান্য ও গোপন তথ্য প্রচারে জেল-জরিমানা

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৪:৪৫ পিএম, ২৮ জানুয়ারি ২০২৬

বিভিন্ন সম্প্রচার প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সুসংগঠিত করা, সম্প্রচারের মানদণ্ড নির্ধারণসহ তদারকির জন্য সম্প্রচার কমিশন গঠন করছে সরকার। 

একই সঙ্গে সম্প্রচার সংশ্লিষ্ট নানা অনিয়মের জন্য সর্বোচ্চ তিন বছরের জেল এবং সর্বোচ্চ ৫০ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রেখে ‘সম্প্রচার কমিশন অধ্যাদেশ-২০২৬’ এর খসড়া করেছে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়। এখন খসড়ার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সবপক্ষের মতামত নেওয়া হচ্ছে।

অধ্যাদেশ অনুযায়ী টেরিস্ট্রিয়াল, স্যাটেলাইট ও ক্যাবল টেলিভিশন ও রেডিও, আইপি টিভি ও রেডিও, ডিটিএইচ (ডিরেক্ট টু হোম), এফএম ও কমিউনিটি রেডিও, ওটিটি, স্ট্রিমিং ও ভিডিও অন ডিমান্ড (ভিওডি) সম্প্রচার মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করা হবে। পাশাপাশি বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত অনলাইন ইনফোটেইনমেন্ট পোর্টাল, অ্যাপস ও ভিডিও স্ট্রিমিং কার্যক্রমও এর আওতায় আসবে। তবে ব্যক্তিগত সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট বা অপেশাদার কনটেন্ট এ অধ্যাদেশের বাইরে থাকবে।

লাইসেন্স ও কমিশনের অনুমতি ছাড়া সম্প্রচার কার্যক্রম পরিচালনা, সরকারের দেওয়া নির্দেশনা পালনে ব্যর্থতা, গোপনীয় সামরিক-বেসামরিক তথ্য উপাত্ত প্রচার, অনুমোদনহীন ও বিভ্রান্তিকর বিজ্ঞাপন প্রচার এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে সংরক্ষিত গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা পণ্যের বিজ্ঞাপনে প্রদর্শন করলে বড় ধরনের শাস্তির মুখে পড়তে হবে বলে খসড়া অধ্যাদেশে উল্লেখ করা হয়েছে।

যে অনিয়মে সম্প্রচার প্রতিষ্ঠানকে শাস্তি পেতে হবে 
খসড়া অনুযায়ী, কোনো সম্প্রচার প্রতিষ্ঠান যদি লাইসেন্স ছাড়া কার্যক্রম পরিচালনা ও লাইসেন্স নেওয়ার আগে কমিশনের সুপারিশ গ্রহণ না করে সম্প্রচার কার্যক্রম চালায়, তাহলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড বা ১০ থেকে ৫০ লাখ টাকা জরিমানা, কিংবা উভয় দণ্ড দেওয়া যাবে।

জাতীয় ইস্যু ও জনস্বার্থে সরকারের দেওয়া নির্দেশনা মানতে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট সম্প্রচার প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।

সরকারি অনাপত্তি ছাড়াই সম্প্রচার যন্ত্রপাতি আমদানি করে সম্প্রচার কার্যক্রম চালালে সংশ্লিষ্টদের তিন বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা ৫ থেকে ২০ লাখ টাকা জরিমানা, অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে।

রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, জননিরাপত্তা বা জনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত হতে পারে এমন গোপন সামরিক বা বেসামরিক তথ্য প্রচার করলে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড বা এক থেকে ১০ লাখ টাকা জরিমানা আরোপের কথা বলা হয়েছে।

এ ছাড়া সরকারের অনুমোদনহীন বা লাইসেন্সবিহীন আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বাজি ও জুয়া, তামাক ও তামাকজাত পণ্য, অ্যালকোহল বা মদজাতীয় পণ্য, কিংবা বিভ্রান্তিকর ও প্রতারণামূলক বিজ্ঞাপন প্রচার করলে বিজ্ঞাপনদাতা ও সংশ্লিষ্ট সম্প্রচারকারীদের দুই বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড বা ৫ থেকে ৩০ লাখ টাকা জরিমানা, অথবা উভয় দণ্ড দেওয়া যাবে বলে খসড়া অধ্যাদেশে উল্লেখ করা হয়েছে।

এতে আরও বলা হয়, রাষ্ট্রীয়ভাবে সংরক্ষিত গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা যেমন জাতীয় সংসদ ভবন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, রাষ্ট্রপতির কার্যালয়, সচিবালয়, আদালত, সেনানিবাস বা কেপিআইভুক্ত প্রতিষ্ঠানের দৃশ্য পণ্যের বিজ্ঞাপনে ব্যবহার করলে সংশ্লিষ্টদের ছয় মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা জরিমানা হতে পারে।

প্রস্তাবিত অধ্যাদেশে আরও বলা হয়েছে, এসব অপরাধে আরোপিত সব অর্থদণ্ড 'পাবলিক ডিমান্ড রিকভারি অ্যাক্ট-১৯১৩' অনুযায়ী আদায় করা হবে।

অপরাধ বিচারে হবে সম্প্রচার ট্রাইব্যুনাল
খসড়া অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, এ অধ্যাদেশের অধীনে সংঘটিত অপরাধের বিচারের জন্য সরকার এক বা একাধিক সম্প্রচার ট্রাইব্যুনাল গঠন করবে। একজন বিচারক সমন্বয়ে ট্রাইবুনাল গঠিত হবে এবং সরকার জেলা ও দায়রা জজদের মধ্য থেকে ট্রাইবুনালের বিচারক নিযুক্ত করবে। সরকার সময়ে সময়ে মামলার সংখ্যা অনুপাতে এ ট্রাইব্যুনালের সংখ্যা বাড়াতে পারবে।

বিচারক মামলার অভিযোগ গঠনের ৯০ কার্য দিবসের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তি করবেন বলেও অধ্যাদেশে জানানো হয়েছে।

যেভাবে গঠন হবে সম্প্রচার কমিশন
খসড়া অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, সরকার এই অধ্যাদেশের অধীনে সম্প্রচার কমিশন নামে একটি কমিশন গঠন করবে।

অধ্যাদেশ অনুযায়ী, সম্প্রচার কমিশন গঠনের জন্য একটি বাছাই কমিটি গঠন করা হবে। এতে থাকবেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব, সম্প্রচার খাতে অন্তত ১৫ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন দুই ব্যক্তি, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিব, যিনি কমিটির সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।

এই বাছাই কমিটি চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগের জন্য প্রতিটি শূন্যপদের বিপরীতে দুইজন বিশিষ্ট নাগরিকের নাম সরকারের কাছে সুপারিশ করবে। সরকার ওই তালিকা থেকে একজন চেয়ারম্যান ও চারজন কমিশনারকে সর্বোচ্চ চার বছরের জন্য নিয়োগ দেবে। পাঁচ সদস্যের কমিশনে অন্তত একজন নারী কমিশনার রাখার বাধ্যবাধকতাও রাখা হয়েছে।

চেয়ারম্যান অনুপস্থিত বা দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হলে জ্যেষ্ঠতম কমিশনার অস্থায়ীভাবে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করবেন। কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্যরা অন্য কোনো লাভজনক পদে কর্মরত থাকতে পারবেন না এবং সম্প্রচার বা গণমাধ্যম সংশ্লিষ্ট কোনো ব্যবসার সঙ্গেও যুক্ত থাকতে পারবেন না।

কমিশনের ক্ষমতা ও দায়িত্ব
খসড়া অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, কমিশনের প্রাথমিক দায়িত্ব হবে উপযুক্ত ব্যবস্থাপনা কাঠামোর অধীনে সরকারি ও বেসরকারি সম্প্রচার কার্যক্রম সুসংগঠিত করা এবং বিষয়বস্তু সম্প্রচারের মানদণ্ড ও নীতিমালা প্রণয়ন ও এর যথাযথ প্রতিপালন তদারকির মাধ্যমে তথ্যের অবাক ও বস্তুনিষ্ঠ প্রবাহ নিশ্চিত করা।

এ জন্য কমিশন সম্প্রচার লাইসেন্স প্রদানের বিষয়ে সরকারকে সুপারিশ করবে, সম্প্রচারকারীদের জন্য আচরণবিধি (কোড অব কন্ডাক্ট), এসওপি ও নির্দেশিকা প্রণয়ন করবে এবং সেসব নীতিমালা যথাযথভাবে মানা হচ্ছে কিনা তা তদারকি করবে।

প্রস্তাবিত অধ্যাদেশে বলা হয়, কমিশন বিটিআরসির সঙ্গে সমন্বয় করে কারিগরি বিষয়গুলো দেখবে এবং দুই কমিশনের মধ্যে মাসে অন্তত একবার বৈঠক আয়োজনের কথা বলা হয়েছে। নির্দেশনা অমান্য করলে জরিমানা, সংশোধিত প্রচারের নির্দেশ বা লাইসেন্স বাতিলসহ ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতাও কমিশনের থাকবে।

এছাড়া সম্প্রচারিত বিষয়বস্তু নিয়ে দর্শক-শ্রোতার অভিযোগ নিষ্পত্তি, সম্প্রচারকারী ও বিষয়বস্তু সরবরাহকারীর মধ্যে বিরোধ মীমাংসা, প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন এবং প্রয়োজনে দলিল ও ডিজিটাল প্রমাণ সংগ্রহের ক্ষমতাও কমিশন পাবে।

কমিশনের কিছু নির্দেশনার বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী সরকারের কাছে আপিল করা যাবে। এক্ষেত্রে সরকারের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে বলেও অধ্যাদেশ জানানো হয়েছে।

আরএমএম/এমএএইচ/

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।