সংসদে বিরোধী দলের প্রধান দায়িত্ব সরকারকে জবাবদিহির মধ্যে রাখা
সংসদে বিরোধী দলের প্রধান দায়িত্ব হলো সরকারকে জবাবদিহির মধ্যে রাখা। তবে সেই সমালোচনা হতে হবে যুক্তিনির্ভর ও দেশ-জনগণের স্বার্থ সামনে রেখে। একই সঙ্গে সরকারের ভালো উদ্যোগে সমর্থন ও প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে গঠনমূলক সমালোচনার মাধ্যমে সংসদীয় রাজনীতির ইতিবাচক সংস্কৃতি গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন বিশ্লেষকরা।
সংসদে রাজনৈতিক সংস্কৃতি কেমন হওয়া উচিত- তা নিয়ে জাগো নিউজের সঙ্গে কথা বলেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. আল মাসুদ হাসানুজ্জামান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. সাবের আহমেদ চৌধুরী, দৈনিক যুগান্তরের সম্পাদক ও কবি আব্দুল হাই শিকদার এবং সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আহসানুল করিম।
প্রধান দায়িত্ব সরকারকে জবাবদিহির মধ্যে রাখা
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. আল মাসুদ হাসানুজ্জামান জাগো নিউজকে বলেন, একটি কার্যকর সংসদের জন্য শক্তিশালী বিরোধী দল অপরিহার্য। সংসদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো বিরোধী দল, যাকে অনেক সময় ‘সরকারি বিরোধী দল’ বলা হয়। সংসদে তাদের নির্দিষ্ট আসন থাকে এবং বিরোধীদলীয় নেতা সেই আসন অলংকৃত করেন। মূলত সংসদের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে সরকারকে জবাবদিহির মধ্যে রাখা। আর এই দায়িত্ব পালনে বিরোধী দলের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, সংসদে সরকারকে জবাবদিহির আওতায় আনতে বিভিন্ন সাংবিধানিক ও প্রক্রিয়াগত ‘অস্ত্র’ রয়েছে। যেমন— প্রশ্নোত্তর পর্ব, দৃষ্টি আকর্ষণী প্রস্তাব, প্রস্তাব ও রেজ্যুলেশন, বাজেট আলোচনা এবং সংসদীয় কমিটি ব্যবস্থা। বিরোধী দল যদি এসব উপায় কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে পারে, তাহলে সরকারের কর্মকাণ্ডের ওপর যথাযথ নজরদারি রাখা সম্ভব হয়। তবে অতীতে দেখা গেছে, কোনো দল বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় এলে সংসদে তাদের একচ্ছত্র প্রভাব তৈরি হয়, যা কার্যকর সংসদীয় চর্চার জন্য অনুকূল নয়। সচেতন নাগরিকরা সেই অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি দেখতে চান না।
আরও পড়ুন
কাল সংসদে ভাষণ দেবেন রাষ্ট্রপতি
সংসদ বসছে কাল, এবার ব্যতিক্রম যে কারণে
সংসদীয় সভায় বসেছে বিরোধীদল
অন্তর্বর্তী সরকারের ১৩৩ অধ্যাদেশ: সংসদে উঠলে ভাগ্যে কী আছে?
অধ্যাপক আল মাসুদ হাসানুজ্জামান মনে করেন, সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকা আরও কার্যকর ও গঠনমূলক করতে কিছু প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার প্রয়োজন। যেমন গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় কমিটি—বিশেষ করে আর্থিক কমিটিগুলোর প্রধান হিসেবে বিরোধী দলের সদস্যদের দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে।
পাশাপাশি সংসদে ‘অপোজিশন ডে’ বা বিরোধীদলীয় দিবস চালুর প্রস্তাব দেন তিনি, যাতে নির্দিষ্ট দিনে বিরোধী দল তাদের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো সংসদে তুলে ধরতে পারে।
এই অধ্যাপক বলেন, বাজেট বা আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে সংসদে আরও গভীর ও পুঙ্খানুপুঙ্খ বিতর্ক হওয়া প্রয়োজন। এজন্য সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে ইস্যুভিত্তিক সমঝোতা থাকা জরুরি, তবে প্রয়োজন অনুযায়ী গঠনমূলক বিরোধিতা ও সমালোচনাও থাকতে হবে। বিরোধিতার অর্থ সবকিছুতেই অস্বীকার করা নয়; বরং যুক্তিনির্ভর সমালোচনার মাধ্যমে নীতিগত উন্নয়ন ঘটানোই বিরোধী দলের মূল দায়িত্ব।
অধ্যাপক হাসানুজ্জামান বলেন, ইতোমধ্যে বিরোধী দল ‘গভর্নমেন্ট ইন ওয়েটিং’ বা ছায়া সরকার গঠনের কথা বলেছে, যা সংসদীয় গণতন্ত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ চর্চা। প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের বিপরীতে বিরোধী দলের একজন প্রতিনিধি থাকলে তারা সরকারের কার্যক্রম নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন করতে পারবেন। এতে সংসদীয় তদারকি আরও শক্তিশালী হবে।
সংসদ সদস্যদের আচরণবিধি উন্নয়ন, ওমবাডসম্যান চালু, সংসদে নৈতিকতা বিষয়ক কমিটি গঠন এবং ই-পার্লামেন্ট ব্যবস্থা চালু করাও সময়ের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় একটি নতুন সূচনা করতে পারে। জুলাই-পরবর্তী রাজনৈতিক সংস্কারের যে আলোচনা চলছে, সেখানে সংসদের ভূমিকা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, নতুন সংসদ অতীতের অকার্যকর সংসদগুলোর পুনরাবৃত্তি ঘটাবে না এবং আরও কার্যকর ও জনবান্ধব সংসদ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। নতুন সংসদের অনেক সদস্যই নবীন হওয়ায় সংসদীয় রাজনীতি ও পদ্ধতি সম্পর্কে তাদের প্রশিক্ষণ এবং প্রস্তুতি প্রয়োজন। ইতোমধ্যে বিভিন্ন দলের পক্ষ থেকে নতুন সদস্যদের প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা ইতিবাচক দিক। তবে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও সাংবিধানিক সংস্কারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সংসদে বড় ধরনের বিতর্ক ও মতবিরোধ দেখা যেতে পারে।
বিরোধী দলের ভূমিকা হতে হবে দায়িত্বশীল ও গঠনমূলক
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সাবের আহমেদ চৌধুরী জাগো নিউজকে বলেন, দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকা হতে হবে দায়িত্বশীল ও গঠনমূলক। বাংলাদেশ এখন বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বৈশ্বিক অস্থিরতা এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার এই সময়ে দেশের জন্য সবচেয়ে প্রয়োজন জাতীয় ঐক্য। এই ঐক্য বজায় রাখতে সংসদে সরকার ও বিরোধী দলের দায়িত্বশীল আচরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, বিরোধী দলের প্রধান কাজ সরকারের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করা। তবে সেই সমালোচনা হতে হবে গঠনমূলক এবং দেশ ও জাতির স্বার্থ সামনে রেখে। শুধু বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা নয়, বরং কোথায় সমস্যা আছে তা তুলে ধরা এবং উন্নয়নের জন্য বিকল্প প্রস্তাব দেওয়াই একটি দায়িত্বশীল বিরোধী দলের বৈশিষ্ট্য।
অধ্যাপক সাবের আহমেদ চৌধুরী বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দেড় বছরে দেশে বিনিয়োগ পরিস্থিতি অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছিল। একটি দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা না থাকলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা সেখানে আগ্রহ দেখান না। একইভাবে দেশীয় উদ্যোক্তারাও বিনিয়োগে উৎসাহ হারান। ফলে অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর সেই স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে সংসদের ভেতরে দায়িত্বশীল রাজনৈতিক আচরণ প্রয়োজন।
সম্প্রতি একটি রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে ‘শ্যাডো গভর্নমেন্ট’ বা ছায়া সরকার গঠনের কথা বলা হয়েছে, যা সংসদীয় গণতন্ত্রে একটি ইতিবাচক উদ্যোগ হতে পারে জানিয়ে বলেন, এতে সরকারের প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমের ওপর নিয়মিত নজরদারি ও মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি হবে। সরকারের ভালো কাজের প্রশংসা যেমন করা উচিত, তেমনি প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে গঠনমূলক সমালোচনাও থাকা দরকার।
ড. সাবের আহমেদ চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশে সংসদীয় শাসনব্যবস্থা মূলত ওয়েস্টমিনস্টার পদ্ধতির অনুসরণে পরিচালিত হয়। বর্তমানে সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপে কিছু পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, এর মাধ্যমে দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। আগামী পাঁচ বছরে যদি গঠনমূলক রাজনৈতিক চর্চা প্রতিষ্ঠিত করা যায়, তাহলে ভবিষ্যতের সরকারগুলোর জন্যও একটি সুস্থ ও দায়িত্বশীল রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে উঠবে।
বিরোধী দলের দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ আচরণ প্রয়োজন
দৈনিক যুগান্তরের সম্পাদক ও কবি আব্দুল হাই শিকদার জাগো নিউজকে বলেন, বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতির অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, অনেক সময় বিরোধী দলগুলো কেবল বিরোধিতার জন্যই বিরোধিতা করে। এ ধরনের রাজনীতি দেশ ও গণতন্ত্রের জন্য খুব একটা উৎসাহব্যঞ্জক নয়। আশা করি এবার বিরোধী দলগুলো গঠনমূলক, দায়িত্বশীল ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ আচরণ করবে।
বিরোধী দলের প্রধান দায়িত্ব সরকারের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করা জানিয়ে তিনি বলেন, তবে সেই সমালোচনা হতে হবে যুক্তিনির্ভর ও গঠনমূলক। রাষ্ট্র ও জনগণের কল্যাণ সামনে রেখে যদি বিরোধী দল দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করে, তাহলে তা বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হয়ে উঠবে।
২০২৪ সালের আন্দোলনে অনেক তরুণ-যুবকের আত্মত্যাগের বিষয়টি স্মরণ করে তিনি বলেন, এ ত্যাগ যেন বৃথা না যায়। তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে বিরোধী দল যদি হটকারী আচরণ করে বা দায়িত্বশীল ভূমিকা না নেয়, তাহলে সেই সম্ভাবনাময় সুযোগ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
তিনি মনে করেন, সংসদে গঠনমূলক ও দায়িত্বশীল বিরোধী রাজনীতির মাধ্যমে গণতান্ত্রিক চর্চা শক্তিশালী হবে এবং দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ আরও পরিপক্ব হয়ে উঠবে।
ইতিবাচক উদ্যোগে বিরোধী দলের সমর্থন থাকা উচিত
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আহসানুল করিম জাগো নিউজকে বলেন, সংসদ কার্যকরভাবে পরিচালনার জন্য বিরোধী দলের দায়িত্বশীল ও গঠনমূলক ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিরোধী দলের কাছ থেকে মূলত গঠনমূলক সমালোচনা প্রত্যাশা করা হয়। সরকার ভালো কোনো কাজ করলে তার প্রশংসা করা এবং কোথাও অন্যায় বা ভুল হলে সেটি যুক্তি ও তথ্যের ভিত্তিতে তুলে ধরা—এটাই একটি দায়িত্বশীল বিরোধী দলের আচরণ হওয়া উচিত।
তিনি বলেন, সংসদ যেন সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হতে পারে সে জন্য বিরোধী দলের সহযোগিতাও প্রয়োজন। সংসদে কোনো ধরনের অচলাবস্থা বা ডেডলক সৃষ্টি না করে বরং আলোচনার মাধ্যমে বিষয়গুলো সমাধান করার সংস্কৃতি গড়ে তোলা জরুরি। একই সঙ্গে সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ দল যদি জনস্বার্থে কোনো ইতিবাচক উদ্যোগ নেয়, সেগুলো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও বিরোধী দলের সমর্থন থাকা উচিত।
আহসানুল করিম আরও বলেন, সংসদ ও সংসদের বাইরে যদি সরকারের কোনো সিদ্ধান্ত বা কর্মকাণ্ড আইনের পরিপন্থি হয়, সেক্ষেত্রে বিরোধী দল যুক্তিনির্ভর ও গঠনমূলক সমালোচনার মাধ্যমে বিষয়টি তুলে ধরতে পারে। তবে সবকিছুই করতে হবে সংসদের প্রচলিত নিয়ম, নীতি ও কনভেনশন মেনে। এতে সংসদীয় গণতন্ত্র শক্তিশালী হবে এবং সংসদ কার্যকরভাবে পরিচালিত হওয়ার পরিবেশ তৈরি হবে।
এসইউজে/এএসএ/এমএফএ