সবচেয়ে উষ্ণতম মাসেও ৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ বৃষ্টি, কারণ কী?
বাংলাদেশে এপ্রিল-মে সময়কে সাধারণত প্রি-মনসুন মৌসুম হিসেবে ধরা হয়। এ সময় তাপমাত্রা বেশি থাকে। বছরের সবচেয়ে উষ্ণ মাসও বলা হয় এপ্রিলকে। সাধারণত এ মাসে গরম বেশি থাকলেও বৃষ্টিপাত তুলনামূলক কম ও বিচ্ছিন্নভাবে হয়ে থাকে। তবে, ২০২৬ সালের এপ্রিলে পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। এবারের এপ্রিল মাসে দেশে স্বাভাবিকের তুলনায় ৭৫ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর, যা গত পাঁচ বছরের এপ্রিল মাসের বৃষ্টিপাতের মধ্যে সর্বোচ্চ।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এবারের ৬ থেকে ৯ এপ্রিল এবং ২৬ থেকে ৩০ এপ্রিল সময়ে বেশি বৃষ্টি হয়েছে। এ সময় দেশের অধিকাংশ স্থানে মাঝারি থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাত হয়। ২৮ এপ্রিল কিশোরগঞ্জের নিকলীতে সর্বোচ্চ ১৬০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়।

এ বছর সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয় সিলেট বিভাগে। এই বিভাগে গড়ে ৬০৩ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া, ঢাকায় গড়ে ২১৩ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। সবচেয়ে কম বৃষ্টি হয়েছে রাজশাহী বিভাগে। মাসজুড়ে গড়ে ৭৮ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। এবারের এপ্রিলে শুধু রাজশাহী বিভাগেই স্বাভাবিকের চেয়ে ১ মিলিমিটার কম বৃষ্টি হয়েছে।
আগের চার বছরের চিত্র
এর আগে, ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে সারাদেশে স্বাভাবিকের চেয়ে ৪ শতাংশ বেশি বৃষ্টি হয়েছে। ওই বছর শুধু সিলেট ও রংপুর বিভাগে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টি হয়েছে। তবে গত বছরের এপ্রিলে ঢাকা বিভাগে স্বাভাবিকের চেয়ে ৩১ শতাংশ কম বৃষ্টিপাত হয়েছে।
আরও পড়ুন
এক দেশের বৃষ্টি কি আরেক দেশ ‘চুরি’ করতে পারে?
ঢাকায় মুষলধারে বৃষ্টি, রাস্তায় জমেছে পানি
আবহাওয়া অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে এপ্রিল মাসে দেশে স্বাভাবিকের চেয়ে ৮১ শতাংশ কম বৃষ্টি হয়েছে। বছরটিতে এপ্রিল মাসে ঢাকায় গড়ে মাত্র ১৪ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়। ওই বছর রাজশাহী ও রংপুর বিভাগে কোনো বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেনি আবহাওয়া অধিদপ্তর। সিলেট ছাড়া প্রতিটি বিভাগে গড়ে ১ দিন করে বৃষ্টি হয়।
২০২৩ সালেও দেখা গেছে একই চিত্র। সে বছরের এপ্রিলে স্বাভাবিকের চেয়ে ৬৩ শতাংশ কম বৃষ্টিপাত হয়। ঢাকায় ওই মাসে স্বাভাবিকভাবে ১৪৮ মিলিমিটার বৃষ্টি হওয়ার কথা থাকলেও গড়ে বৃষ্টি হয়েছে মাত্র ২৪ দশমিক ৫ মিলিমিটার। সবচেয়ে কম বৃষ্টি হয় ঢাকা বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগে।

২০২২ সালের এপ্রিল মাসে সারাদেশে স্বাভাবিকের চেয়ে ৩৬ শতাংশ কম বৃষ্টি হয়েছে। ওই বছর শুধু রংপুর বিভাগে স্বাভাবিকের চেয়ে ১২৪ শতাংশ বেশি বৃষ্টি হয়েছে। সবচেয়ে কম বৃষ্টি হয়েছে খুলনা, বরিশাল ও ঢাকায়।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদরা বলছেন, এবার এপ্রিলে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি বৃষ্টির পেছনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আবহাওয়াগত কারণ একসঙ্গে কাজ করছে।
তাদের মতে, পশ্চিমা লঘুচাপ এবং বঙ্গোপসাগর থেকে আসা আর্দ্র পূবালি বায়ুপ্রবাহের শক্তিশালী সংযোগের কারণে বায়ুমণ্ডলে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি হয়। পশ্চিম দিক থেকে আসা অপেক্ষাকৃত শুষ্ক ও ঠান্ডা বায়ুর সঙ্গে বঙ্গোপসাগরীয় উষ্ণ ও জলীয়বাষ্পসমৃদ্ধ বায়ুর সংঘর্ষে শক্তিশালী বজ্রমেঘ বা কিউমুলোনিম্বাস মেঘ তৈরি হয়। এর ফলে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ভারী বৃষ্টি, বজ্রপাত, শিলাবৃষ্টি ও দমকা হাওয়া বয়ে যায়।
বেড়েছে বজ্রঝড়ের ধারাবাহিকতা
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ ড. আবুল কালাম মল্লিক জাগো নিউজকে বলেন, এবারের এপ্রিল মাসে দেশে গড়ে নয়দিন বজ্রঝড় হয়েছে। এবার প্রায় স্বাভাবিক সংখ্যক বজ্রঝড় তৈরি হলেও সেগুলোর ধারাবাহিকতা বেশি ছিল। কালবৈশাখী ও বজ্রবৃষ্টির ঘটনাও ছিল বেশি। ফলে বছরের উষ্ণতম মাস হওয়া সত্ত্বেও এবারের এপ্রিল তুলনামূলকভাবে অনেকটাই স্বস্তিদায়ক ছিল।
আরও পড়ুন
মেঘভাঙা বৃষ্টি কী? কেন এটি এত ভয়াবহ? কারণ ও প্রতিরোধের উপায়
ফেনীতে এক ঘণ্টার বৃষ্টিতে শহরে জলাবদ্ধতা
আবুল কালাম মল্লিক বলেন, আমাদের স্থানীয় আবহাওয়াগত বৈশিষ্ট্য ও বৈশ্বিক উষ্ণায়নের যৌথ প্রভাবে বজ্রমেঘ ও বজ্রঝড় তৈরির প্রবণতা বেড়েছে। এসব বজ্রঝড় থেকেই স্বল্প সময়ে ভারী বৃষ্টিপাত হয়েছে।
ছিল শিলাবৃষ্টির আধিক্য
এবার অরোগ্রাফিক রেইন বা শৈলক্ষেপ বৃষ্টিপাতও বেশি হয়েছে। পাহাড়ি বাধার কারণে আর্দ্র বাতাস ওপরে উঠে মেঘ তৈরি করে এবং সেখান থেকে ভারী বৃষ্টিপাত ঘটে বলে জানান ড. মল্লিক।
জলবায়ু পরিবর্তনের ফল ‘এক্সট্রিম ওয়েদার ইভেন্ট’
বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ও গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের কারণে আবহাওয়ায় নানা বৈচিত্র্য বিরাজ করছে।
আবহাওয়াবিদ ড. আবুল কালাম মল্লিক বলেন, বিশ্বব্যাপী উষ্ণায়ণের কারণে স্বল্প সময়ের চরম আবহাওয়া বা ‘এক্সট্রিম ওয়েদার ইভেন্ট’ বাড়ছে। আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, তাপমাত্রা এক ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লে বিভিন্ন ধরনের আবহাওয়া ব্যবস্থার তীব্রতা ও প্রবণতা প্রায় ১০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
তিনি আরও বলেন, এবার কনভেক্টিভ ক্লাউড বা গভীর সঞ্চালনশীল মেঘমালার সৃষ্টি ধারাবাহিক ছিল, যা কিছুটা অস্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যের। এর ফলে ঘনঘন বজ্রঝড় ও কালবৈশাখী তৈরি হয়েছে এবং স্বল্প সময়ে ভারী বৃষ্টিপাত হয়েছে।
ঢাকায় ৫ বছরের এপ্রিলের মধ্যে এবার সর্বোচ্চ বৃষ্টি
চলতি বছরের এপ্রিলে ঢাকায় সবমোট ১১ দিন বৃষ্টি হয়। আবহাওয়া অফিসের সবশেষ ৫ বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এই বছর ঢাকায় গড়ে ২১৩ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। ২০২৫ সালে ঢাকায় বৃষ্টি হয়েছে গড়ে ৮১ মিলিমিটার, ২০২৪ সালে ১৪ মিলিমিটার, ২০২৩ সালে ২৪ দশমিক ৫ মিলিমিটার, ২০২২ সালে ৭৩ দশমিক ৫ মিলিমিটার।

বড় কারণ অতিরিক্ত আর্দ্রতা
এবার অতিবৃষ্টির আরেকটি বড় কারণ বায়ুমণ্ডলে অতিরিক্ত আর্দ্রতা বলে উল্লেখ করেছেন আবহাওয়াবিদ এ কে এম নাজমুল হক।
জাগো নিউজকে তিনি বলেন, বঙ্গোপসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি থাকায় বেশি জলীয়বাষ্প তৈরি হয়েছে। উষ্ণ বায়ু বেশি আর্দ্রতা ধারণ করতে পারে। পরে সেই আর্দ্র বায়ু ওপরে উঠে ঠান্ডা হলে দ্রুত ঘনীভূত হয়ে ভারী বৃষ্টিপাত সৃষ্টি করে।
তিনি আরও বলেন, এছাড়া প্রি-মনসুন মৌসুমে ভূপৃষ্ঠ উত্তপ্ত হলে নিচের স্তরের গরম বায়ু দ্রুত ওপরে উঠে যায়, যাকে কনভেকশন বলা হয়। পর্যাপ্ত আর্দ্রতা থাকলে এ প্রক্রিয়ায় বজ্রঝড় দ্রুত শক্তিশালী হয়ে ওঠে। চলতি এপ্রিলে এমন পরিস্থিতি বারবার তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন আবহাওয়াবিদ নাজমুল হক।
আরও পড়ুন
চট্টগ্রামে পানিতে ডুবেছে স্বপ্ন
দেড় ঘণ্টার বৃষ্টিতে পুরান ঢাকায় জলাবদ্ধতা, ভোগান্তিতে সাধারণ মানুষ
তিনি বলেন, পশ্চিমা লঘুচাপের সক্রিয়তা, বঙ্গোপসাগরীয় আর্দ্র বায়ুপ্রবাহ, বায়ুমণ্ডলে অতিরিক্ত জলীয়বাষ্প এবং শক্তিশালী কনভেকশন- এসব কারণ একসঙ্গে কাজ করায় ২০২৬ সালের এপ্রিল স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি বৃষ্টিবহুল মাসে পরিণত হয়েছে।

আবহাওয়াবিদ ড. ওমর ফারুক জাগো নিউজকে বলেন, এবারের এপ্রিলে বেশি বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস আমরা আগেই জানিয়েছিলাম। বজ্রমেঘ আর ঘন ঘন কালবৈশাখী ঝড় এই এপ্রিলের তাপমাত্রাকে স্বস্তিদায়ক করেছে। এই বৃষ্টির ধারাবাহিকতা কিছুটা মে মাসেও থাকতে পারে।
মানবসৃষ্ট কারণের প্রভাব কতটা
হঠাৎ বৃষ্টি বা অতিবৃষ্টির পেছনে মানবসৃষ্ট কোনো করণ নিহিত আছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে আবহাওয়াবিদ হাফিজুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, অধিক বৃষ্টি কিংবা কম বৃষ্টিতে মানবসৃষ্ট কারণ সরাসরি থাকে না। জলবায়ু পরিবর্তনে যে প্রভাব রয়েছে দেশে, তার ৯৮ শতাংশই মানবসৃষ্ট। কয়েক বছর পরপর এমন বৃষ্টি হয়। তাই এর পেছনে বর্তমানে মানবসৃষ্ট কারণ খোঁজাটা যুক্তিযুক্ত হবে না। এটা যখন প্রাক-বর্ষা মৌসুমে বা এপ্রিলে ঘন ঘন হতে থাকবে তখন এটা নিয়ে গবেষণার প্রশ্ন আসবে।
আরএএস/এএমএ/এমএমএআর