এক দেশের বৃষ্টি কি আরেক দেশ ‘চুরি’ করতে পারে?

সাজিদ হাসান
সাজিদ হাসান সাজিদ হাসান , সহ -সম্পাদক
প্রকাশিত: ০৯:০৮ পিএম, ০৬ মে ২০২৬
প্রতীকী ছবি/ এআই দিয়ে বানানো

এক দেশের বৃষ্টি কি আরেক দেশ ‘চুরি’ করে নিতে পারে- শুনতে অবাক লাগলেও এমন আশঙ্কা বহু বছর ধরেই রয়েছে, বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের মতো পানির সংকটে থাকা অঞ্চলে। খরা, তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও কৃত্রিমভাবে বৃষ্টি ঘটানোর প্রযুক্তি ‘ক্লাউড সিডিং’র বিস্তারের ফলে এই বিতর্ক আরও জোরালো হয়েছে। তবে বিজ্ঞানীরা বলছেন, বাস্তবে এমনটি প্রায় অসম্ভব, যদিও রাজনৈতিক বক্তব্যে এর ভিন্ন দাবিও সামনে এসেছে।

মার্কিন সাংবাদিক অ্যালিসা জে. রুবিন ‘দ্য নিউইয়র্ক টাইমসে’ লিখেছেন, ইরানি কর্মকর্তারা বহু বছর ধরে আশঙ্কা করে আসছিলেন যে অন্য দেশগুলো তাদের গুরুত্বপূর্ণ পানির উৎস থেকে বঞ্চিত করছে। তবে এই আশঙ্কা কোনো উজানের বাঁধ বা ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিয়ে ছিল না।

২০১৮ সালে তীব্র খরা ও বাড়তে থাকা তাপমাত্রার মধ্যে ইরানের কিছু জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এ সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে, কেউ তাদের ‘মেঘ থেকেই পানি চুরি’ করছে। সেসময় ইরানী সেনাবাহিনীর অভিজাত শাখা আইআরজিসির জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা গোলাম রেজা জালালি বলেন, ইসরায়েল ও আরেকটি দেশ ইরানের মেঘ থেকে বৃষ্টি হতে দিচ্ছে না।

পরবর্তীসময়ে জানা যায়, ওই ‘অন্য দেশ’টি ছিল সংযুক্ত আরব আমিরাত, যারা মেঘে রাসায়নিক প্রয়োগ করে বৃষ্টি ঘটানোর উচ্চাকাঙ্ক্ষী কর্মসূচি চালু করেছিল। যদিও বাস্তবে এই প্রযুক্তির উদ্দেশ্য পানি চুরি নয়, বরং শুষ্ক অঞ্চলে বৃষ্টি বাড়ানো।

খরা মোকাবিলায় ‘মেঘ দখল’ প্রতিযোগিতা

মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার দেশগুলো দ্রুত শুকিয়ে যাওয়ার ফলে এই অঞ্চলে এক ধরনের ‘বৃষ্টির দৌড়’ শুরু হয়েছে। দেশগুলো বিভিন্ন রাসায়নিক ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে মেঘ থেকে বৃষ্টির ফোঁটা বের করার চেষ্টা করছে।

এই অঞ্চলের ১৯টি দেশের মধ্যে ১২টিতে বছরে গড়ে ১০ ইঞ্চিরও কম বৃষ্টি হয়, যা গত ৩০ বছরে প্রায় ২০ শতাংশ কমেছে। ফলে সামান্য অতিরিক্ত মিঠা পানির জন্যও সরকারগুলো মরিয়া হয়ে উঠেছে।

ধনী দেশগুলো, বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাত এই প্রযুক্তিতে কোটি কোটি ডলার বিনিয়োগ করছে। অন্য দেশগুলোও পিছিয়ে না থাকতে একই পথে হাঁটছে, যদিও এই প্রযুক্তির কার্যকারিতা নিয়ে বড় ধরনের সন্দেহ রয়েছে।

মরক্কো, ইথিওপিয়া ও ইরানের নিজস্ব ক্লাউড সিডিং কর্মসূচি রয়েছে। সৌদি আরব সম্প্রতি বড় আকারে এটি শুরু করেছে ও আরও কয়েকটি দেশ তা বিবেচনা করছে।

বিশ্বে সবচেয়ে বড় কর্মসূচি পরিচালনা করছে চীন, যারা দেশের প্রায় অর্ধেক এলাকায় বৃষ্টি বাড়ানো বা শিলাবৃষ্টি কমানোর চেষ্টা করছে। তারা বিশেষ করে ‘ইয়াংজি নদী’ অঞ্চলে বৃষ্টি ঘটানোর চেষ্টা করছে, যেখানে কিছু স্থানে নদী শুকিয়ে যাচ্ছে।

মেঘের আয়ু ও বাস্তবতা

ক্লাউড সিডিং প্রায় ৭৫ বছর ধরে ব্যবহার করা হলেও, বিজ্ঞানীরা বলছেন এর কার্যকারিতা এখনো প্রমাণিত নয়। বিশেষ করে, এক দেশ অন্য দেশের বৃষ্টি ‘চুরি’ করতে পারে- এই ধারণা তারা গুরুত্ব দেন না।

বিজ্ঞানীদের মতে, বৃষ্টিপাত ঘটাতে সক্ষম কিউমুলাস বা তুলোর মতো সাদা, স্তূপাকার ও নিচু উচ্চতার মেঘের আয়ু সাধারণত কয়েক ঘণ্টার বেশি নয়। খুব কম ক্ষেত্রেই তা দীর্ঘস্থায়ী হয়, এমনকি পারস্য উপসাগরের মতো ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চলেও একটি দেশের মেঘ আরেক দেশে পৌঁছানোর মতো সময় পায় না।

বায়ুমণ্ডলে আসলে কী পরিমাণ পানি আছে?

এই প্রশ্নের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন যুক্তরাজ্যের রিডিং বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়াবিদ্যা বিভাগের বায়ুমণ্ডলীয় পদার্থবিদ্যা ও গতিবিদ্যার অধ্যাপক মারটেন অ্যামবাউম।

তার মতে, পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রতি বর্গমিটারে গড়ে প্রায় ২৫ কেজি পানি থাকে, যা মূলত জলীয় বাষ্প আকারে। এর মধ্যে মাত্র ৫০ গ্রাম পানি তরল বা বরফ আকারে মেঘে থাকে। উষ্ণ অঞ্চলে এই পরিমাণ ২৫০ গ্রাম পর্যন্ত হতে পারে। অর্থাৎ, আকাশে দৃশ্যমান মেঘ আসলে মোট পানির মাত্র ০.২ শতাংশের মতো।

প্রতিদিন গড়ে প্রতি বর্গমিটারে প্রায় ২.৫ কেজি পানি বৃষ্টি হিসেবে পড়ে, যা আবার একই হারে বাষ্প হয়ে ফিরে আসে। ফলে বায়ুমণ্ডলের মোট পানির পরিমাণ প্রায় স্থিতিশীল থাকে।

তিনি আরও বলেন, যদি হঠাৎ করে সব মেঘ বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ে, তবে মাত্র আধা ঘণ্টার মধ্যেই নতুন মেঘ তৈরি হতে পারে।

তাহলে কি বৃষ্টি চুরি সম্ভব?

এই বিশ্লেষণ থেকে স্পষ্ট, একটি মেঘ থেকে বৃষ্টি নামিয়ে দিলে তা মোট পানি ব্যবস্থায় খুবই সামান্য প্রভাব ফেলে। কারণ বায়ুমণ্ডলে বিপুল পরিমাণ জলীয় বাষ্প রয়েছে, যা দ্রুত নতুন মেঘ তৈরি করতে পারে।

অর্থাৎ, একটি দেশের মেঘ থেকে বৃষ্টি নামিয়ে অন্য দেশের বৃষ্টি ‘চুরি’ করা বাস্তবসম্মত নয়। তবে খুব ছোট পরিসরে- যেমন একটি খামার থেকে অন্য খামারে এর প্রভাব পড়তে পারে। কিন্তু বর্তমান প্রযুক্তি এতটা নিখুঁত নয়।

প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা ও ঝুঁকি

ক্লাউড সিডিংয়ের কার্যকারিতা নিয়ে অনেক বিজ্ঞানীর সন্দেহ রয়েছে।

আমেরিকান জলবায়ুবিদ অ্যালান রোবক বলেন, সমস্যা হলো, আপনি মেঘে সিডিং করার পর বোঝা যায় না, এটি নিজে থেকেই বৃষ্টি দিত কি না। আরেক বিজ্ঞানী রয় রাসমুসেন বলেন, গরম অঞ্চলের কিউমুলাস মেঘ এতটাই অস্থির যে সিডিংয়ের প্রভাব নির্ধারণ করা কঠিন।

অন্যদিকে ইসরায়েল ৫০ বছর পর ২০২১ সালে তাদের ক্লাউড সিডিং কর্মসূচি বন্ধ করে দেয়। গবেষক পিনহাস অ্যালপার্ট জানান, এটি অর্থনৈতিকভাবে কার্যকর ছিল না।

ইতিহাস ও বাস্তব প্রয়োগ

১৯৪৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ক্লাউড সিডিং শুরু হয়। পরে ভিয়েতনাম যুদ্ধে এটি ব্যবহার করা হয়েছিল, যাতে বর্ষাকাল দীর্ঘায়িত করে শত্রুপক্ষের সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত করা যায়।

বর্তমানে সংযুক্ত আরব আমিরাত এই প্রযুক্তিতে সবচেয়ে এগিয়ে। দেশটি সিলভার আয়োডাইড ও ন্যানোপ্রযুক্তি ব্যবহার করে মেঘে রাসায়নিক প্রয়োগ করে।

দেশটির জাতীয় আবহাওয়া কেন্দ্রের পরিচালক আবদুল্লা আল মানদাউস দাবি করেন, এই প্রযুক্তির মাধ্যমে বছরে অন্তত ৫ শতাংশ বেশি বৃষ্টি হচ্ছে। যদিও আরও দীর্ঘমেয়াদি তথ্য প্রয়োজন।

অনিশ্চয়তা ও ভবিষ্যৎ

কখনো কখনো ক্লাউড সিডিংয়ের ফলে অতিরিক্ত বৃষ্টি বা অপ্রত্যাশিত স্থানে বৃষ্টি হতে পারে। ২০১৯ সালে দুবাইয়ে এমন ভারী বৃষ্টি হয়েছিল যে আবাসিক এলাকা প্লাবিত হয়।

আবহাওয়াবিদ জেমস ফ্লেমিং বলেন, আপনি মেঘকে পরিবর্তন করতে পারেন, কিন্তু এরপর সেটি কী করবে, তা নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না।

সূত্র: দ্য নিউইয়র্ক টাইমস, সিএনএন, ওয়ার্ডপ্রেস ডট কম

এসএএইচ

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।