সক্রিয় হচ্ছে এল নিনো, এবারের বর্ষায় কম বৃষ্টির আভাস
প্রশান্ত মহাসাগরে আবারও সক্রিয় হওয়ার পথে রয়েছে এল নিনো। আন্তর্জাতিক আবহাওয়া ও জলবায়ু পর্যবেক্ষণ সংস্থাগুলো বলছে, ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে এল নিনো পরিস্থিতি গড়ে ওঠার আশঙ্কা দ্রুত বাড়ছে। এর প্রভাবে বাংলাদেশে বর্ষাকালের আগমন বিলম্বিত হওয়া, বৃষ্টিপাত কমে যাওয়া এবং ভ্যাপসা গরম বাড়ার আশঙ্কা করছেন আবহাওয়াবিদরা।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওশানিক অ্যাটমোসফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের ক্লাইমেট প্রেডিকশন সেন্টার চলতি বছরের এপ্রিলে জানিয়েছে, মে-জুলাই মৌসুমে এল নিনো শুরু হওয়ার সম্ভাবনা ৬১ শতাংশ। অন্যদিকে এল নিনো সাউদার্ন অসকিলেশন (ইএনএসও) পূর্বাভাস কেন্দ্র আইআরআইয়ের মডেল অনুযায়ী, এপ্রিল-জুন মৌসুমে এল নিনো পরিস্থিতির সম্ভাবনা প্রায় ৭০ শতাংশ এবং বছরের শেষভাগে তা ৮৮ থেকে ৯৪ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
এছাড়া ইউরোপিয়ান সেন্টার ফর মিডিয়াম রেঞ্জ ওয়েদার ফরকাস্টের সাম্প্রতিক মৌসুমি পূর্বাভাসে দেখা যাচ্ছে, প্রশান্ত মহাসাগরের নিনো অঞ্চলের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা দ্রুত বাড়ছে। সংস্থাটির একাধিক মডেল ইঙ্গিত দিচ্ছে, বছরের দ্বিতীয়ার্ধে মাঝারি থেকে শক্তিশালী এল নিনো তৈরি হতে পারে।
এল নিনো কি?
এল নিনো হচ্ছে প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্বাংশের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার একটি প্রাকৃতিক জলবায়ুগত ঘটনা। সাধারণত দুই থেকে সাত বছর পরপর এটি দেখা দেয়। এর বিপরীত অবস্থাকে বলা হয় ‘লা নিনা’, যখন ওই অঞ্চলের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে কমে যায়।
বিশ্বজুড়ে আবহাওয়ার ধরনে বড় পরিবর্তন আনতে পারে এই দুই ঘটনা। এল নিনোর সময় অনেক অঞ্চলে খরা, তাপপ্রবাহ ও কম বৃষ্টিপাত দেখা যায়। অন্যদিকে লা নিনার সময় অনেক এলাকায় অতিবৃষ্টি ও বন্যার প্রবণতা বাড়ে।
বাংলাদেশে কী হবে?
এল নিনো সরাসরি বাংলাদেশের আবহাওয়া নিয়ন্ত্রণ না করলেও এটি দক্ষিণ এশিয়ার মৌসুমি বায়ুর ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ ড. আবুল কালাম মল্লিক জাগো নিউজকে বলেন, বর্তমানে এল নিনো কেবল সক্রিয় হওয়ার পথে রয়েছে। বিষয়টিকে আমাদের দেশে অনেকে অতিরঞ্জিতভাবে ‘সুপার এল নিনো’ বলে উল্লেখ করে। বাস্তবে এর প্রভাব টেলিকানেকশনের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করতে হয়।
তিনি বলেন, এল নিনো সক্রিয় হলে বর্ষাকালের আগমন কিছুটা বিলম্বিত হতে পারে। একই সঙ্গে বর্ষাকালে বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ারও আশঙ্কা থাকে। তবে এসব বিষয়ে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যায় না। জলবায়ু সবসময় নির্দিষ্টভাবে আচরণ করে না। তবে মৌসুমি বায়ুর আগমন বিলম্বিত হওয়া, বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কমে যাওয়া ও ভ্যাপসা গরম বাড়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
আরও পড়ুন
সবচেয়ে উষ্ণতম মাসেও ৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ বৃষ্টি, কারণ কী?
মেঘভাঙা বৃষ্টি কী? কেন এটি এত ভয়াবহ? কারণ ও প্রতিরোধের উপায়
চট্টগ্রামে পানিতে ডুবেছে স্বপ্ন
ড. আবুল কালাম মল্লিক বলেন, ২০২৪ সালে এল নিনো সক্রিয় ছিল। সে সময় দেশে টানা ৩৫ দিন তাপপ্রবাহ দেখা গেছে। তবে ২৪ সালের বর্ষাকালে পরিস্থিতি ভিন্ন ছিল। তখন এল নিনো নিউট্রাল অবস্থায় চলে যাওয়ায় বর্ষায় আবার বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছিল, দেশে ফ্ল্যাশ ফ্লাড কিংবা বন্যা পরিস্থিতি অব্যাহত ছিল।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের বর্ষা ও এল নিনোর মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক এখনো সুস্পষ্ট নয়। এ ধরনের সম্পর্ক নিয়ে গবেষণাকে বলা হয় ‘কোরিলেশন’ বা ‘টেলিকানেকশন’। প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্ব ও পশ্চিম অংশের তাপমাত্রার পার্থক্য কমে গেলে এবং ট্রেড উইন্ড বা বাণিজ্যিক বায়ুর গতিবেগ কমে গেলে দেশের বৃষ্টিপাতেও প্রভাব পড়তে পারে। এ কারণে সাধারণভাবে এল নিনো সক্রিয় থাকলে বর্ষাকালে বৃষ্টিপাত কিছুটা কম হতে পারে বা বর্ষার আগমন বিলম্বিত হতে পারে।
বর্ষায় ভ্যাপসা গরম
বর্ষাকালে সাধারণত বাতাসে জলীয়বাষ্প বা আর্দ্রতার পরিমাণ অনেক বেড়ে যায়। এ সময় ঘনঘন বৃষ্টি হলেও বাতাসে থাকা অতিরিক্ত আর্দ্রতার কারণে শরীর থেকে ঘাম সহজে শুকাতে পারে না। ফলে শরীরের তাপ বের হতে বাধাগ্রস্ত হয় এবং মানুষ বেশি অস্বস্তি অনুভব করে।
আবহাওয়াবিদরা বলছেন, বর্ষাকালের ভ্যাপসা গরমের পেছনে শুধু তাপমাত্রা নয়, বাতাসে আর্দ্রতার মাত্রা বড় ভূমিকা রাখে।
আরও পড়ুন
বৃষ্টিতে ঘর স্যাঁতস্যাঁতে? জানুন শুকনো রাখার উপায়
ঝড়-বৃষ্টিতে বাইরে যাচ্ছেন? আগে জেনে নিন এই টিপস
শহরেও বাড়ছে বজ্রপাতে মৃত্যু: সুউচ্চ ভবন কতটুকু রক্ষা করতে পারে
আবহাওয়াবিদ কাজী জেবুন্নেছা জাগো নিউজকে বলেন, বর্ষাকালে মেঘ, বাতাসের গতিবেগ, সূর্যের তাপ, সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রার পার্থক্যসহ বিভিন্ন উপাদান একসঙ্গে কাজ করে। বিশেষ করে বাতাসের গতি কম থাকলে এবং আর্দ্রতা বেশি হলে অস্বস্তি আরও বাড়ে। এ কারণে অনেক সময় তাপমাত্রা খুব বেশি না থাকলেও মানুষের কাছে গরম বেশি অনুভূত হয়।
আবহাওয়াবিদ ড. আবুল কালাম মল্লিক বলেন, বর্ষাকালের গরমে অস্বস্তি বেশি। মাঝেমধ্যে এটা মার্চ-এপ্রিলের চেয়েও কষ্টদায়ক হয়। কিন্তু আমাদের দেশে একটা প্রশ্ন প্রায় ই উঠে ‘এবারের গরম জীবনে দেখিনি’। কিন্তু বর্ষার সময় বৃষ্টি কম থাকলে, গরমের এই অস্বস্তিটা স্বাভাবিক। এভাবেই হয়ে আসছে। তাই মানুষ আগের অভিজ্ঞতা ভুলে যায়।
কেমন যেতে পারে এবারের বর্ষা
আবহাওয়া অধিদপ্তরের (মে-জুলাই) তিন মাসব্যাপী পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, সামগ্রিকভাবে দেশে স্বাভাবিক অপেক্ষা কম বৃষ্টিপাতের আভাস রয়েছে। এছাড়া বঙ্গোপসাগরে তিন থেকে চারটি লঘুচাপ সৃষ্টি হতে পারে যার মধ্যে এক-দুটি নিম্নচাপ/ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হতে পারে। জুন মাসের প্রথমার্ধে সারাদেশে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু (বর্ষাকাল) বিস্তার লাভ করতে পারে। এছাড়া দেশে বিক্ষিপ্তভাবে শিলাসহ ৮-১০ দিন হালকা/মাঝারি যার মধ্যে দুই-তিন দিন তীব্র কালবৈশাখী ঝড়সহ বৃষ্টি/বজ্রসহ হতে পারে।

আবহাওয়াবিদ ওমর ফারুক জাগো নিউজকে বলেন, আমরা প্রতিনিয়ত পাঁচ দিনের পূর্বাভাস দিয়ে থাকি। আবহাওয়া ও ক্লাইমেটের প্যাটার্ন এখন চেঞ্জ হওয়ায় পূর্বাভাস পুরোপুরি নাও মিলতে পারে। তবে এবারের বর্ষায় বৃষ্টিপাত কম হওয়ার সম্ভাবনা আছে।
আরএএস/এমআইএইচএস/এমএমএআর