নীরব জাতীয় সংকট ‘ডুবে শিশুমৃত্যু’, টনক নড়ে না সরকারের
নরসিংদীর মনোহরদী উপজেলার অর্জুন চর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনের সড়কটি পার হলেই বিশাল পুকুর। স্কুলের পেছনেই তালুকদার বাড়ি। এই বাড়ির নাসিমা বেগম এই পুকুরেই ১০ বছর আগে হারিয়েছেন ছেলেকে। আট বছরের সিফাত তালুকদার শৈবাল পুকুরের কোন জায়গাটিতে ডুবে গিয়েছিল ছলছল চোখে তাই দেখাচ্ছিলেন নাসিমা বেগম।
শুকনো মৌসুমের শেষদিকে পুকুরের পানি এখন তলানিতে। পুকুরের একদিকে শানবাধানো ঘাট। বর্ষার সময় পানিতে থই থই করে পুকুর।
ঘাটের দিকে নিয়ে গিয়ে নাসিমা বেগম বলেন, ‘আমার তিন ছেলে ছিল। আমি অনেক অসুস্থ ছিলাম তখন। জরায়ুর অপারেশন হয়েছিল। শৈবাল স্কুলে যায়, ক্লাস ওয়ানে পড়তো। তখন বয়স আট বছরের মতো। স্কুল থেকে ফিরে বাড়িতে বই-খাতা রেখে সবার অলক্ষ্যে অন্য বাচ্চাদের সঙ্গে পুকুরে গোসল করতে চলে যায়।’
তিনি বলেন, ‘একসঙ্গে চার-পাঁচজন পুকুরে লাফ দেয়, তারা কেউই সাঁতার জানতো না। যারা দেখছিল তারা চারজনকে তুলতে পারে। তারা কেউ মারা যায়নি। কিন্তু, আমার ছেলে পড়েছিল সবার নিচে। তারে আর তুলতে পারেনি। সে কোনো দিন একলা পুকুরে আসেনি। কেউ জানেও না যে সিফাতও লাফ দিছিল।’
‘অসুস্থতা নিয়েও আমি পাগলের মতো ছোটাছুটি শুরু করি। মায়ের মন মানে না। কোথায় গেলে আমার ছেলেরে পাবো! এক চাচির কাছে খবর পেয়ে কামেল এক লোকের কাছে যাই। বিকেলে আমি ওই লোকের কাছ থেকে যখন আধাআধি রাস্তা আসছি, তখন মাইকিং করছে যে বাচ্চা পাওয়া গেছে। তখন তো আর করার কিছু নেই।’
সন্তান হারানোর অসীম বেদনা অক্টোপাসের মতো নাসিমার সমস্ত অস্তিত্ব গ্রাস করে নেয়।
এই পুকুরেই নাসিমা বেগমের ছেলে আট বছরের সিফাত তালুকদার শৈবাল ডুবে মারা যায়/ছবি: জাগো নিউজ
তারপরও ‘আল্লাহ পাক যেন এভাবে কোনো মায়ের কোল না খালি করে…’ বলতে বলতে দু’চোখে অঝোর ধারা নামে নাসিমা বেগমের। এরপর আর কথা চলে না।
দীর্ঘদিন ধরেই শিশুমৃত্যুর অন্যতম বড় কারণ হয়ে থাকলেও ডুবে মৃত্যুকে এখনো জাতীয় জনস্বাস্থ্য সংকট হিসেবে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর দেন-দরবারে সীমিত পরিসরে সরকারি উদ্যোগ দেখা গেলেও তা ডুবে শিশুমৃত্যু রোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না।
নাসিমার মতো দেশে প্রতিদিন বুকের ধন হারানোর এমন ব্যথার হাহাকার ৩০ জনেরও বেশি মায়ের। কারণ, দেশে প্রতিদিন ৩০ জনেরও বেশি শিশু পানিতে ডুবে মারা যাচ্ছে, যাদের বয়স পাঁচ বছরের কম।
দীর্ঘদিন ধরেই শিশুমৃত্যুর অন্যতম বড় কারণ হয়ে থাকলেও ডুবে মৃত্যুকে এখনো জাতীয় জনস্বাস্থ্য সংকট হিসেবে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর দেন-দরবারে সীমিত পরিসরে সরকারি উদ্যোগ দেখা গেলেও তা ডুবে শিশু মৃত্যুরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পর্যাপ্ত সরকারি উদ্যোগ, স্থায়ী প্রকল্প ও জাতীয় পর্যায়ের সমন্বিত পরিকল্পনার অভাবে এই নীরব বিপর্যয় থেকে উত্তরণ ঘটছে না। যদিও বেসরকারি উদ্যোগে উদ্ভাবিত বাংলাদেশের কমিউনিটিভিত্তিক শিশু যত্নকেন্দ্র বা আঁচল মডেল ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ডসহ ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলো লুফে নিয়ে তাদের পরিস্থিতির উন্নতি ঘটাচ্ছে।
আরও পড়ুন
পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু যেন ‘নীরব মহামারি’
নানাবাড়িতে বেড়াতে গিয়ে পানিতে ডুবে প্রাণ গেলো দুই ভাইয়ের
মা ব্যস্ত রান্নাঘরে, পুকুরে ডুবে প্রাণ গেলো ৩ বছরের শিশুর
সরকার প্রাথমিকভাবে ‘সমাজভিত্তিক সমন্বিত শিশুযত্ন কেন্দ্রের মাধ্যমে শিশুর প্রারম্ভিক বিকাশ ও সুরক্ষা এবং সাঁতার সুবিধা প্রদান (আইসিবিসি) প্রকল্প’ নিয়েছে। প্রকল্পটি গত ডিসেম্বরে শেষও হয়েছে। অন্যদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর গত বছর ‘পানিতে ডুবা প্রতিরোধে জাতীয় কর্মকৌশল ও কর্মপরিকল্পনা’ প্রণয়ন করেছে। তবে এখনো এটি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
বাংলাদেশ পরিস্থিতি
পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু একটি বৈশ্বিক সমস্যা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) হিসাব অনুযায়ী, প্রতি বছর পৃথিবীতে তিন লাখ মানুষ পানিতে ডুবে মারা যায়। এর ৯২ শতাংশই মারা যায় নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে।
পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর ক্ষেত্রে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ। ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট ফর হেলথ ম্যাট্রিক্স অ্যান্ড ইভ্যালুয়েশনের (আইএইচএমই) তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি এক লাখের মধ্যে পানিতে ডুবে মৃত্যু হয় ৮ দশমিক ৯ জনের।
আইএইচএমইর ২০১৭ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী, পানিতে ডুবে মানুষ মারা যাওয়ার হারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কমনওয়েলথভুক্ত শীর্ষ দেশগুলোর মধ্যে পঞ্চম।
ডব্লিউএইচওর গ্লোবাল রিপোর্ট অন ড্রাউনিংয়ে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে এক থেকে চার বছরের শিশুমৃত্যুর ক্ষেত্রে ৪৩ শতাংশই মারা যায় পানিতে ডুবে।
২০১৬ সালের বাংলাদেশ হেলথ ও ইনজুরি সার্ভে রিপোর্ট অনুযায়ী, ইনজুরি বা আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে মৃত্যুর ক্ষেত্রে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে পানিতে ডুবে মৃত্যু। ইনজুরি বা আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে মৃত্যুর মধ্যে ১১ দশমিক ৭ শতাংশ পানিতে ডুবে মারা যায়। এক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু আত্মহত্যায়, এই হার ১৪ দশমিক ৭ শতাংশ। ১৪ দশমিক ৪ শতাংশ হার নিয়ে এরপরেই রয়েছে সড়ক দুর্ঘটনা।
দেশে প্রতি বছর পানিতে ডুবে মারা যাচ্ছে ১৪ হাজার ২৬৯ শিশু/ছবি: জাগো নিউজ
গবেষণায় দেখা যায়, বাংলাদেশে গড়ে প্রতিদিন ৪০টি শিশু পানিতে ডুবে মারা যায়। এর মধ্যে ৩০টি শিশুর বয়স পাঁচ বছরের কম।
হেলথ অ্যান্ড ইনজুরি সার্ভে অনুযায়ী, প্রতি বছর বাংলাদেশে সব বয়সের প্রায় ১৯ হাজার মানুষ পানিতে ডুবে মারা যায়। এর মধ্যে ১৮ বছরের কম বয়সী মানুষ রয়েছে সাড়ে ১৪ হাজার, ১১ হাজারই হচ্ছে ৫ বছরের কম বয়সী শিশু।
দেশে প্রতি বছর পানিতে ডুবে মারা যাচ্ছে প্রায় ১৮ হাজার ৬৬৫ জন মানুষ। তার মধ্যে ১৪ হাজার ২৬৯ জনই শিশু—অর্থাৎ ৭৫ শতাংশের বেশি। শিশুদের মধ্যে সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছে এক থেকে চার বছর বয়সীরা। গবেষণায় উঠে এসেছে, সব ডুবে মৃত্যুর ৭০ শতাংশই ঘটছে বাড়ির পাশে থাকা পুকুরে।- ন্যাশনাল হেলথ অ্যান্ড ইনজুরি সার্ভে ২০২৪
২০২৪ সালে শেষ করা ন্যাশনাল হেলথ অ্যান্ড ইনজুরি সার্ভে বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন দেশে ৫১ জনের বেশি মানুষ মারা যাচ্ছে পানিতে ডুবে। এর ৭৫ শতাংশের বেশি শিশু। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সহযোগিতা নেওয়া হয়েছে এই জরিপের ক্ষেত্রে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কারিগরি ও আর্থিক সহায়তায় সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ বাংলাদেশ (সিআইপিআরবি) এই গবেষণার কাজ করে।
২০২৪ সালের করা জরিপে বাংলাদেশে আঘাতজনিত মৃত্যু এবং আঘাতজনিত আহতদের পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয়েছে। জরিপ অনুযায়ী, দেশের প্রতি এক লাখ মানুষের মধ্যে প্রায় ৬০ জনের আঘাতজনিত মৃত্যু হয়। আঘাতজনিত মৃত্যুর প্রধান তিনটি কারণ হলো সড়ক দুর্ঘটনা, আত্মহত্যা এবং পানিতে ডোবা। এর মধ্যে সর্বোচ্চ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রায় ১৫ শতাংশ, আত্মহত্যা ১২ দশমিক ৪২ শতাংশ, আর পানিতে ডোবা ১১ শতাংশ।
জরিপের ফল অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর পানিতে ডুবে মারা যাচ্ছে প্রায় ১৮ হাজার ৬৬৫ জন মানুষ। তার মধ্যে ১৪ হাজার ২৬৯ জনই শিশু—অর্থাৎ ৭৫ শতাংশের বেশি। শিশুদের মধ্যে সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছে এক থেকে চার বছর বয়সীরা। গবেষণায় উঠে এসেছে, সব ডুবে মৃত্যুর ৭০ শতাংশই ঘটছে বাড়ির পাশে থাকা পুকুরে।
যা বলছেন শিশু সুরক্ষা বিশেষজ্ঞরা
শিশু সুরক্ষা বিশেষজ্ঞ ও ইউনিসেফের শিশু সুরক্ষা বিভাগের সাবেক স্পেশালিস্ট মুনিরা হাসান জাগো নিউজকে বলেন, ‘এটি একটি ন্যাশনাল ইস্যু, ন্যাশনাল সাইলেন্ট কিলার (জাতীয় নীরব ঘাতক)। আমাদের এটাকে অ্যাড্রেস করতে হবে মেইনস্ট্রিমে। প্রকল্প ছাড়াও শিক্ষা মন্ত্রণালয়, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য মন্ত্রণালয়কে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘পাঠ্যক্রমে থাকতে হবে সাঁতার শেখানো কতটা জরুরি। টিচার্স ট্রেনিংয়ে থাকতে হবে এবং পুরো সমাজটাকে তৈরি করতে হবে যে সাঁতার একটা বেসিক স্কিল। আমাদের নদীমাতৃক দেশ।’
মুনিরা হাসান বলেন, ‘সাঁতার না শিখলে প্রাথমিকে শিক্ষার্থী সনদ পাবে না। এটা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আছে। অস্ট্রেলিয়াতে, আরও উন্নত দেশগুলোতে ম্যান্ডেটরি করে দেওয়া। হ্যাঁ, এটা আমরা আমাদের দেশে চেষ্টা করেছিলাম। আমাদের দেশে তো সহজভাবে কোনোকিছু হবে না। তো এটা আমাদের স্কুলের সঙ্গে লিংক করলে অনেক শিশু বেঁচে যেতো।’
‘এটা যদি আমি ন্যাশনাল ইস্যু না বানাই, আমি পয়সা এনে...আমি ডোনারদের থেকে পয়সা এনে খুব বেশি কিছু করতে পারবো না। আমাদেরটা আমাদেরই করতে হবে। আমি বলতে চাই—এটাকে আমাদের মেইনস্ট্রিম করতে হবে, মেইনস্ট্রিম এবং ফিন্যান্সিং। আমরা সবাই মিলে দায়িত্বটা নিই—আমার সন্তানকে আমি সাঁতার শেখাবো। সেটা যেখানেই হোক এবং সেটা কস্ট-ইফেক্টিভ হতে হবে।’
আরও পড়ুন
দুই ভাইয়ের ছবি এখন কেবল স্মৃতি, পুকুরে ডুবে একসঙ্গে মৃত্যু
পাঠ্যবইয়ে ফুটবল-ক্রিকেট-দাবাসহ ৭টি খেলা যুক্ত করার নির্দেশ
দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে স্বজনদের অপেক্ষা-আহাজারি
তিনি বলেন, ‘কড়াইলের যে দুইটা লেক আছে, এরশাদ মার্কেটের পেছনে একটা পুকুরের মতো, প্রত্যেক বছরে কতগুলো বাচ্চা মারা যায় কড়াইল বস্তিতে। এই বাচ্চাদের সাঁতার শেখানো যাচ্ছে না। কেন?’
‘আমাদের অবকাঠামো আছে, কিন্তু কাজে লাগাচ্ছি না’ জানিয়ে এই শিশু সুরক্ষা বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘বাংলাদেশ শিশু একাডেমিতে একটা পুল আছে, সেভ দ্য চিলড্রেন-এর বানানো। এটার মধ্যে শুকনোপাতা পড়ে আছে। এখানেই যে সাড়ে চার হাজার শিশু নাচ-গান শিখতে আসে, ইভেন ওরাও এখানে যেতে পারে না। শুকনোপাতা পড়ে আছে, তো স্ট্রাকচার আছে আর কাজে লাগাচ্ছি না।’
তিনি আরও বলেন, ‘এখানে আমি ৩-৪ হাজার টাকা দিয়ে ১২টা সেশনে আমার বাচ্চাকে সাঁতার শেখাতে পারি, যারা পারবে না তাদের গভর্নমেন্টকে সাবসিডি (আর্থিক সহায়তা) দিতে হবে।’
পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু নিয়ে গবেষণা ও রোধে কাজ করছে বেসরকারি সংস্থা সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ, বাংলাদেশ (সিআইপিআর’বি)। সিআইপিআর’বি-এর পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু প্রতিরোধবিষয়ক গবেষক মো. আল আমিন ভূইয়া জাগো নিউজকে বলেন, ‘২০১৬ সালে ১৯ হাজার ড্রাউনিং ডেথ (পানিতে ডুবে মৃত্যু) রেকর্ড করা হয়। এর ভেতরে আপনার ১৪ হাজার ৫০০-ই হচ্ছে ১৮ বছরের নিচে। যেটা ২০২৩-এ করে, ২০২৪-এ পাবলিশ করি, সেটাতে টোটাল ড্রাউনিং ডেথ ১৮ হাজারের ওপরে। পরিস্থিতি বদলায়নি।’
সব ডুবে মৃত্যুর ৭০ শতাংশই ঘটছে বাড়ির পাশে থাকা পুকুরে/ছবি: জাগো নিউজ
তিনি বলেন, ‘ডুবে মৃত্যুরোধে কাজ করার জন্য একটি বডি দরকার, সেটা হবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নেতৃত্বে। এছাড়া সমন্বিতভাবে এটি হবে না। এ মন্ত্রণালয় ওই মন্ত্রণালয়কে ঠেলে, ওই মন্ত্রণালয় এ মন্ত্রণালয়কে ঠেলে। এটা (ডুবে শিশুমৃত্যু) এত অবহেলিত একটা ইস্যু। একবার যদি চিন্তা করেন, একটা ক্লাসরুম নাই হয়ে যাচ্ছে প্রতিদিন, ওটা কিন্তু আমরা কেউ ভাবছি না।’
‘ডুবে মৃত্যুর অনেক আনরিপোর্টেড থাকে। এটা দিয়ে শুরু করা উচিত। যে এটাকে একটা হিসাবের মধ্যে আনা, এ রকম একটা ম্যাকানিজম তৈরি করা দরকার। ডুবে শিশুমৃত্যুতে অনেকে মনে করে এটা তো হওয়ারই কথা ছিল, সেজন্যই হয়েছে।’
মন্ত্রণালয় মূলত ডেটা, সার্ভে বা তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে পলিসি নেয়। আমরাও চাই পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর হার কমুক। শুধু কমানো নয়, আমরা চাই একেবারে জিরো হোক। ডুবে শিশুমৃত্যুর প্রকৃত তথ্য পেলে আমাদের পরবর্তী সময়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে কিংবা নীতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কাজে লাগবে।- ইয়াসমীন পারভীন, সচিব, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়
আল আমিন ভূইয়া বলেন, ‘আমি জানছি শিশুরা এই সময়ে বেশি ডুবে মারা যাচ্ছে, তারপরও আমরা কিন্তু কোনো অ্যাকশন নিচ্ছি না। আমাদের এত বড় বড় গ্লোবাল এক্সপার্ট ট্রেনিং করে আসি, মানুষজনকে শিখাই, আমি বিভিন্ন ক্লাস নেই, কিন্তু আমরা প্র্যাকটিস করতে পারি না। আমাদের মডেল সেম জিনিস ভিয়েতনামে হচ্ছে। তো আমরা রিকগনিশন (স্বীকৃতি) পাচ্ছি না আমাদের দেশে। অথচ আমরা বাইরে বাইরে গিয়ে এ বিষয়ে ক্লাস নিচ্ছি। ওরা করতে পারছে, নেপাল করতে পারছে, ভারত করছে, আমাদের জিনিস, সেম জিনিস নিয়ে। থাইল্যান্ড এগিয়ে গেছে আমাদের জিনিসগুলো নিয়ে, কিন্তু আমরা কোথায় রইলাম?’
‘অথচ আমরা গ্লোবালি পায়োনিয়ার। যে ড্রাউনিং প্রিভেনশন ডে রেজুলেশন হয়েছে জাতিসংঘে, সেটা আমাদের বাংলাদেশের জন্য। অথচ আমরা এটাকে পাত্তাই দিচ্ছি না। এটাই হচ্ছে, মানে আমাদের যারা পলিসি মেকার বা আমাদের যারা ধরেন এটাকে গুরুত্ব দেওয়ার লোক, তারাই এটা ভাবছেন না বা আমরা পারছি না ভাবাতে যে এটা একটা মেজর ইস্যু।’ বলেন জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয় এবং কেপ টাউন ইউনিভার্সিটির এক্সটারনাল এ এক্সামিনার।
তিনি আরও বলেন, ‘সাঁতার শিক্ষা স্কুলে বাধ্যতামূলক করে দেওয়া প্রয়োজন। এ বিষয়ে গাইডলাইনও করে দেওয়া যেতে পারে। আমাদের সুইমিং ফেডারেশন আছে, তারা কি আপনার জীবনের জন্য সাঁতার কার্যক্রম করে? সো এই ল্যাকিংসগুলোর জন্য এক জায়গায় আসতে হবে, একই টেবিলে বসতে হবে এবং একই কথা বলতে হবে। মানে সবাইকে একই ছাতার নিচে আসতে হবে।’
কী বলছে সরকার
মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব ইয়াসমীন পারভীন জাগো নিউজকে বলেন, ‘মন্ত্রণালয় মূলত ডেটা, সার্ভে বা তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে পলিসি নেয়। আমরাও চাই পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর হার কমুক। শুধু কমানো নয়, আমরা চাই একেবারে জিরো হোক। ডুবে শিশুমৃত্যুর প্রকৃত তথ্য পেলে আমাদের পরবর্তী সময়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে কিংবা নীতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কাজে লাগবে।’
তিনি বলেন, ‘শিশুদের ডুবে মৃত্যুরোধে আমাদের একটা বড় প্রকল্প আছে। আগামীতেও আমরা সেটি অব্যাহত রাখবো। শিশুমৃত্যু শূন্যে নেমে আসুক। কোনো শিশুর মৃত্যুই কাম্য না, সেটা পানিতে ডুবে হোক বা যে কোনোভাবে হোক।’
স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (বিশ্ব স্বাস্থ্য অনুবিভাগ) শেখ মোমেনা মনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যু রোধে আমরা একটা স্ট্র্যাটেজি করেছি। সেখানে ডুবে শিশুমৃত্যুর তথ্যগুলো আসছে। এটা তো একটা বিরাট কনসার্ন। স্ট্র্যাটেজি হয়েছে, এটা একসেপ্টও হয়েছে, এটা এখন হয়তো ডেসিমিনেশনে (সংশ্লিষ্ট সবার মধ্যে প্রচার) যাবে। সহসাই হবে এটা। ডব্লিউএইচও আমাদের প্রপোজাল দেবে, এখনো দেয়নি। দিলে আমরা ডেসিমিনেশন করবো এটা। স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে কনসাল্টেশন করে, এটা আমরা ডেসিমিনেট করবো।’
ডুবে মৃত্যুরোধে আমাদের কোনো বিধি-বিধান ছিল না জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের তো আসলে এই বিষয়ে কোনো কিছু ছিল না। এ বিষয়ে আসলে সব মন্ত্রণালয় মিলে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।’
আরএমএম/ইএ/এমএমএআর