সাংহাইয়ের এই ভবনে শতবর্ষ আগে শুরু, এখন বিশ্বশক্তি
বিশ্বের ব্যস্ততম শহরের একটি সাংহাই। শত ব্যস্ততার মধ্যেও সময় যেন হঠাৎ থেমে যায় একটি সরু গলিতে। পুরোনো ধাঁচের শিকুমেন স্থাপত্যের বাড়ি। পাথরের ফ্রেমে তৈরি প্রবেশদ্বার। শান্ত পরিবেশ। প্রথমে দেখে বোঝার উপায় নেই, এখানেই শত বছর আগে বদলে যেতে শুরু করেছিল চীনের রাজনৈতিক ইতিহাস।
এ ভবনেই ১৯২১ সালে বসেছিল ১৩ জন প্রতিনিধির ছোট্ট এক বৈঠক। সেই বৈঠক থেকেই জন্ম নেয় চীনের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিসি)। পরে সেই দলই বিপ্লব, রাষ্ট্রগঠন ও দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিযাত্রার মধ্য দিয়ে চীনকে পরিণত করে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিতে।
বর্তমানে ভবনটি ‘সিপিসির প্রথম জাতীয় কংগ্রেস মেমোরিয়াল হল’ নামে পরিচিত। দেশ-বিদেশের পর্যটক, গবেষক ও রাজনৈতিক ইতিহাসে আগ্রহীদের অন্যতম আকর্ষণ এখন এই স্থান।
ঢাকায় চীনা দূতাবাসের আমন্ত্রণে সাংহাই সফররত বাংলাদেশি সাংবাদিক প্রতিনিধিদলের অংশ হয়ে সম্প্রতি এই ঐতিহাসিক মেমোরিয়াল হল পরিদর্শনের সুযোগ হয়। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, প্রতিদিন হাজার হাজার দর্শনার্থী ভবনটি ঘুরে দেখতে আসছেন। চীনের বিভিন্ন প্রদেশের মানুষ যেমন আসছেন, তেমনি বিদেশি পর্যটকদের উপস্থিতিও চোখে পড়ার মতো।
সিপিসির প্রথম জাতীয় কংগ্রেস মেমোরিয়াল হলে ছবির প্রদর্শনী
শুধু ঐতিহাসিক গুরুত্ব নয়, দর্শনার্থীদের অভিজ্ঞতাকেও আলাদা করে তুলতে বিশেষ ব্যবস্থাপনা করেছে কর্তৃপক্ষ। কিছু অংশে এখনো আগাম অ্যাপয়েন্টমেন্ট ছাড়া প্রবেশ করা যায় না। দর্শনার্থীদের নির্ধারিত সময়ে গেটের সামনে অপেক্ষা করতে হয়। এরপর মেমোরিয়াল হলের কর্মীরা নিয়ে যান ভেতরে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এতে আশপাশের বাসিন্দাদের অসুবিধা কমে। একই সঙ্গে দর্শনার্থীরা অনেকটা গোপন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিবেশও অনুভব করতে পারেন।
মেমোরিয়াল হল ঘুরে দেখা যায়, এখানে সংরক্ষণ করা হয়েছে কংগ্রেসের মূল স্থান, শপথ হল, বক্তৃতা হল ও নবনির্মিত প্রদর্শনী ভবন। নতুন প্রদর্শনী হলটির আয়তন প্রায় ৯ হাজার ৬শ বর্গমিটার। এর মধ্যে রয়েছে মূল প্রদর্শনী হল, দর্শনার্থী সেবাকেন্দ্র ও অন্য সুবিধা।
আরও পড়ুন
চীনের ‘দ্য পেপার’/দেশের স্বার্থ, জনআকাঙ্ক্ষা ও ফ্যাক্ট-চেকিংয়ে ভারসাম্যই গণমাধ্যম নীতি
চীনের বিভিন্ন শহরে হবে ৩০টি ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ আউটলেট
চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ক অন্য কোনো শক্তিতে প্রভাবিত হবে না: চীনা দূতাবাস
মেমোরিয়াল হল ঘুরে দেখা যায়, বিভিন্ন বয়সী দর্শনার্থীদের ভিড়। বিশেষ করে তরুণ শিক্ষার্থী ও গবেষকদের আগ্রহ চোখে পড়ে। একদল বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীকে দেখা যায় প্রদর্শনীতে দাঁড়িয়ে ইতিহাসের সময়রেখা মনোযোগ দিয়ে পড়তে, আবার কিছু বিদেশি পর্যটক গাইডের ব্যাখ্যা শুনে ছবি তুলছেন। অনেকের কাছেই এটি শুধু একটি জাদুঘর নয়, বরং রাজনৈতিক ইতিহাসকে কাছ থেকে দেখার অভিজ্ঞতা।
সিপিসির প্রথম জাতীয় কংগ্রেস মেমোরিয়াল হলে প্রদর্শনী
মূল প্রদর্শনীতে তুলে ধরা হয়েছে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির জন্ম, সংগ্রাম, বিপ্লব ও রাষ্ট্রক্ষমতায় পৌঁছানোর ইতিহাস। ‘যুগান্তকারী সূচনা: চীনের কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠা’ শীর্ষক প্রদর্শনীটি সাতটি ভাগে সাজানো হয়েছে। সেখানে জাতীয় সংকট, মার্কসবাদের বিস্তার, প্রাথমিক কমিউনিস্ট গোষ্ঠীগুলোর উত্থান, দল গঠনের প্রক্রিয়া ও পরবর্তী পথচলার বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
ঐতিহাসিক তথ্যমতে, সাংহাইয়ের তৎকালীন ফরাসি নিয়ন্ত্রিত এলাকায় ১৯২১ সালের ২৩ জুলাই সিপিসির প্রথম জাতীয় কংগ্রেস শুরু হয়। চীনের বিভিন্ন অঞ্চলের সাতটি প্রাথমিক কমিউনিস্ট গ্রুপের ১৩ জন প্রতিনিধি এতে অংশ নেন। তাদের সঙ্গে ছিলেন আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের দুই প্রতিনিধি মারি ও নিকোলস্কি।
সম্মেলনের প্রথম ছয়টি অধিবেশন এ ভবনেই অনুষ্ঠিত হয়। তবে শেষ অধিবেশনের সময় নিরাপত্তাজনিত কারণে বৈঠকটি ঝেজিয়াং প্রদেশের জিয়াক্সিং শহরের দক্ষিণ হ্রদের একটি নৌকায় স্থানান্তর করা হয়।
সেই কংগ্রেসেই গৃহীত হয় দলের ‘কর্মসূচি’ ও ‘প্রস্তাবনা’। একই সঙ্গে গঠন করা হয় কেন্দ্রীয় নেতৃত্বদানকারী পরিষদ ও আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠা ঘোষণা করা হয় চীনের কমিউনিস্ট পার্টির।
১৩ জনের সেই মিটিংয়ে ছিলেন লি দা (সাংহাই), লি হানজুন (সাংহাই), ঝ্যাং গোতাও (বেইজিং), লিউ রেনজিং (বেইজিং), মাও সেতুং (চাংশা), হে শুহেং (চাংশা), দং বিউউ (উহান), চেন তানচিউ (উহান), ওয়াং জিনমেই (জিনান), দেং এনমিং (জিনান), চেন গংবো (গুয়াংজু), ঝৌ ফোহাই (জাপানে অধ্যয়নরত চীনা শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি), বাও হুইশেং (অনুপস্থিত চেন দুশিউর প্রতিনিধি)
১৯৪৯ সালে মাও সেতুংয়ের নেতৃত্বে বিপ্লবের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসে সিপিসি। এরপর টানা কয়েক দশকের শাসনে কৃষিনির্ভর চীন ধীরে ধীরে শিল্প, প্রযুক্তি, অবকাঠামো ও সামরিক শক্তিতে বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী রাষ্ট্রে পরিণত হয়।
সিপিসির প্রথম জাতীয় কংগ্রেস মেমোরিয়াল হলে প্রদর্শনী
বর্তমানে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের নেতৃত্বে ২০৪৯ সালের মধ্যে চীনকে ‘পূর্ণাঙ্গ উন্নত, সমৃদ্ধ ও বিশ্বনেতৃত্বের উপযোগী রাষ্ট্রে’ পরিণত করার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে দেশটি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু ইতিহাস সংরক্ষণ নয়, নতুন প্রজন্মের কাছে ‘রেড কালচার’ বা বিপ্লবী ঐতিহ্য পৌঁছে দিতেও বড় উদ্যোগ নিয়েছে সাংহাই। বর্তমানে শহরটিতে ৬শ’র বেশি ‘রেড থিম’ জাদুঘর, স্মৃতিস্থান ও ঐতিহাসিক স্থাপনা রয়েছে। অনেক জায়গায় ইতিহাসকে আকর্ষণীয় করতে ইমার্সিভ নাটক, ইন্টারঅ্যাকটিভ গেম, স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ও ডিজিটাল প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা হয়েছে।
মেমোরিয়াল হলের ভেতরে দলটির প্রতিষ্ঠাতাদের আদলে তৈরি ভাস্কর্য, দুর্লভ দলিল, ঐতিহাসিক নথি ও আলোকচিত্র সংরক্ষণ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, ভবনটির মূল কাঠামো প্রায় অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ইতিহাসকে বাস্তব রূপে অনুভব করতে পারে।
১৯৫২ সালে ভবনটি পুনরুদ্ধার করে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। পরে ১৯৬১ সালে এটিকে জাতীয় পর্যায়ের সুরক্ষিত ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক স্থানের মর্যাদা দেয় চীনের স্টেট কাউন্সিল। আর ২০২১ সালে উদ্বোধন করা হয় নতুন প্রদর্শনী ভবন।
একসময় ১৩ জনের গোপন বৈঠকের সাক্ষী ছিল যে ভবন, আজ সেটিই চীনের রাজনৈতিক ইতিহাস, রাষ্ট্রদর্শন ও উত্থানের প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
চীনে রাজনৈতিক ইতিহাসকে শুধু পাঠ্যবই বা আনুষ্ঠানিক বর্ণনায় সীমাবদ্ধ না রেখে পর্যটন, সংস্কৃতি ও ডিজিটাল প্রদর্শনীর মাধ্যমে জনসম্পৃক্ত অভিজ্ঞতায় রূপ দেওয়া হয়েছে। ফলে ঐতিহাসিক স্থানগুলো একই সঙ্গে শিক্ষা, স্মৃতি সংরক্ষণ এবং রাষ্ট্রীয় বর্ণনার অংশ হিসেবে কাজ করছে।
ঢাকা থেকে সাংহাই যাওয়ার জন্য সাধারণত কোনো সরাসরি ফ্লাইট নেই, তাই অন্তত একবার ট্রানজিট নিতে হয়। সবচেয়ে প্রচলিত রুটগুলো হলো হংকং, গুয়াংজু বা কুয়ালালামপুর হয়ে সাংহাই যাওয়া। ট্রানজিটসহ মোট ভ্রমণ সময় সাধারণত ৪ থেকে ১২ ঘণ্টার মধ্যে হয়, তবে স্টপওভারের সময় অনুযায়ী এটি কম-বেশি হতে পারে।
তুলনামূলকভাবে হংকং বা গুয়াংজু হয়ে যাওয়া রুটগুলো বেশি সুবিধাজনক হিসেবে ধরা হয়, কারণ এসব পথে সংযোগ ফ্লাইট সহজে পাওয়া যায় এবং ট্রানজিট ব্যবস্থাও তুলনামূলক স্বচ্ছন্দ। ভ্রমণের আগে ভিসা, লাগেজ ট্রান্সফার ও ট্রানজিট সময় ভালোভাবে যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ।
আমরা গুয়াংজু হয়ে গিয়েছিলাম। সেখানে প্রায় চার ঘণ্টার ট্রানজিট ছিল। এরপর গুয়াংজু থেকে সাংহাই পর্যন্ত ফ্লাইটে যেতে সময় লাগে প্রায় ২ ঘণ্টা ৩০ মিনিট থেকে ৩ ঘণ্টা। আপনারা চীন ভ্রমণের সময় ঐতিহাসিক এ জাদুঘর দেখতে এভাবে যেতে পারেন।
জেপিআই/এএসএ