ফসিল থেকে একতারা—সবই আছে, নেই শুধু দর্শনার্থী
পরিপাটি কক্ষ। ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়ে অনেক পুরোনো জিনিসপত্র। এর কোনটি পলিথিনে মোড়ানো, আবার কোনটি সুরক্ষিত কাচের মধ্যে রাখা। এগুলোতে ঢুঁ মারলেই জেলার ইতিহাস-ঐতিহ্যের কথা মনে পড়ে যায়। তবে এগুলো দেখতে আসা দর্শনার্থীর সংখ্যা হাতেগোনা। অনেকটা সুনসান নীরবতা।
বলছিলাম মাদারীপুরের একমাত্র মিউজিয়ামের কথা। ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা পুরোনো জিনিস ও ইতিহাস-ঐতিহ্য সংরক্ষণের জন্য গড়ে ওঠা মিউজিয়ামটি দিনে দিনে সমৃদ্ধ হচ্ছে। তবে জেলার দর্শনার্থীদের এ ব্যাপারে আগ্রহ কম। প্রতিদিন বিকেলে মিউজিয়াম খোলা থাকলেও তেমন একটা লোকজনের দেখা মেলে না। অনেকটাই অলসভাবে পড়ে আছে মিউজিয়ামটি।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০২৩ সালের ৩১ মার্চ মাদারীপুর শহরের ঐতিহ্যবাহী শকুনি লেকপাড়ের পুরাতন ট্রেজারি ভবনে মাদারীপুর মিউজিয়ামের উদ্বোধন করা হয়। তৎকালীন জেলা প্রশাসক ড. রহিমা খাতুনের উদ্যোগে সরকারিভাবে মাদারীপুর মিউজিয়ামের উদ্বোধন করা হয়। তবে মিউজিয়ামটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হলেও সেসময় দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়নি। দীর্ঘদিন প্রধান গেট বন্ধ থাকায় লতাপাতার আড়ালে আবদ্ধ হয়ে যায় জেলার একমাত্র মিউজিয়ামটি।

জঙ্গলে ভরে যায় প্রধান ফটক। বাইরে থেকে দেখে বোঝার উপায় ছিল না এটি একটি মিউজিয়াম। এমনকি ‘মাদারীপুর মিউজিয়াম’ নাম লেখা সাইনবোর্ডটিও লতা-পাতায় ভরে যাওয়ায় কারও চোখে পড়েনি।
‘প্রতিদিনই আশপাশের বিভিন্ন এলাকার কয়েকশ দর্শনার্থী শকুনি লেকপাড়ে আসেন। সেই তুলনায় মিউজিয়ামে তেমন একটা দর্শনার্থী দেখা যায় না। মাদারীপুরবাসীর জন্য এটি প্রথম ও একমাত্র মিউজিয়াম। তাই এ বিষয়ে আরও বেশি প্রচার-প্রচারণা দরকার বলে আমি মনে করি’—দর্শনার্থী
দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করে দিতে ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে আবার নতুন করে কাজ শুরু করা হয়। জঙ্গল পরিষ্কার করে টানিয়ে দেওয়া হয় ‘মাদারীপুর মিউজিয়াম’ লেখা সাইনবোর্ড। এরপর থেকেই মিউজিয়ামটি দর্শনার্থীদের জন্য উন্মক্ত হয়ে যায়। সপ্তাহে শুধু মঙ্গলবার বাদে প্রতিদিন বিকেল ৫টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য খোলা রাখা হয়। তবে বিকেলে মিউজিয়াম খোলা থাকলেও তেমন দর্শনার্থীদের আনাগোনা তেমন চোখে পড়ে না। প্রতিদিন গড়ে ৫-৬ জন দর্শনার্থীর আগমন ঘটে।

আরও পড়ুন:
হারিয়ে যাচ্ছে ৫০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী পালগিরি জামে মসজিদ
আঁকেন ছবি, সংগ্রহ করেছেন ৩০০ পুরোনো সামগ্রী
পুরান ঢাকার ‘বাকরখানি’: স্বাদের আড়ালে বেদনাময় প্রেমকাহিনি
বাঁশ-বেতের শিল্পে পাহাড়ের প্রাণ, টিকিয়ে রাখার সংগ্রাম লাকি চাকমার
পিরোজপুরের ২০০ বছরের মৃৎশিল্প বিলুপ্তির পথে
সরেজমিনে দেখা যায়, মাদারীপুরের প্রাচীন নির্দশন, ইতিহাস, ঐতিহ্য, ঐতিহাসিক ব্যক্তির সংক্ষিপ্ত জীবনী ও ছবি, বিলুপ্তি হওয়া জিনিসপত্রসহ নানা বিষয়বস্তু স্থান পেয়েছে মিউজিয়ামে। পুরোনো ফ্যাক্স মেশিন, টাইপিং মেশিন, টেলিফোন, আফ্রিকান একতারা, ৯০ দশকের ক্যাসেট প্লেয়ার, ডাইনোসারের দাঁতের ফসিল, হাঙরের দাঁতের ফসিল, প্রাগৈতিহাসিক যুগের ঝিনুক-শামুক জাতীয় প্রাণীর ফসিল, বৃটিশ আমলের মুদ্রা, পাকিস্তান আমলের মুদ্রাসহ নানা দেশের মুদ্রা ও টাকা, বাংলাদেশের বিলুপ্ত হওয়া কিছু টাকা ও পয়সা, পিতলের তৈরি পানদানি, সুরাপাত্রসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র, বীর মুক্তিযোদ্ধা গোলাম মাওলার কোট, জুতা, ক্যাপ ও পাঞ্জাবি; পুরোনো কিছু পত্রিকা, একতারা, একুশে পদকপ্রাপ্ত চিত্রশিল্পী কাজী আনোয়ার হোসেন, চিত্রশিল্পী তপন কুমার হালদার, চিত্রশিল্পী সত্যরঞ্জণ বারুবী আঁকা বিভিন্ন ছবি, পুরোনো টিনের তৈরি ট্যাংক, মাদারীপুরের বিলুপ্ত হওয়া নীলকুটিরের ধ্বংসস্তূপের নমুনা, কয়লার ইস্ত্রি, পুরোনো কাঠের দোলনাসহ বেশ কিছু পুরোনো জিসিনপত্র রয়েছে।
মিউজিয়ামে ঘুরতে আসা দর্শনার্থী শাখাওয়াত হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, ‘প্রতিদিনই আশপাশের বিভিন্ন এলাকার কয়েকশ দর্শনার্থী লেকপাড়ে আসেন। সেই তুলনায় এখানে তেমন একটা দর্শনার্থী দেখা যায় না। মাদারীপুরবাসীর জন্য এটি প্রথম ও একমাত্র মিউজিয়াম। তাই এ বিষয়ে আরও বেশি প্রচার-প্রচারণা দরকার বলে আমি মনে করি।’

মাদারীপুরের তারুণ্য পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক সোহাগ হাসান জাগো নিউজকে বলেন, ‘মাদারীপুরের মিউজিয়ামটি জেলার ঐতিহ্য বহন করে। তবে এটি তেমন একটা প্রচার না থাকায় মানুষজন খুব একটা যায় না। প্রচার-প্রচারণা বাড়াতে হবে।’
‘আমাদের সংগ্রহে বেশি পুরোনো কিছু তৈজসপত্র রয়েছে। কিছু পুরোনো খাট-পালঙ্কও আছে। তবে আমাদের পরিকল্পনা রয়েছে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের পৈতৃক ভিটা, এফ আর খানের বাড়ি, খালিয়া জমিদার বাড়িসহ জেলার যেসব বিখ্যাত ব্যক্তিদের বাড়ি রয়েছে, তাদের কাচের রেপ্লিকা তৈরি করে পাশে আবার তাদের বায়ো বা মূর্তি ছোট করে রাখা হবে। বিভিন্ন বিখ্যাত ব্যক্তিদের পরিচিতি তুলে ধরা হবে’—অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক
মিউজিয়ামটিকে সমৃদ্ধ করার কাজ চলছে বলে জানান সহকারী কিউরেটর অরুপ ব্যানার্জী। তিনি বলেন, সংগ্রহ বাড়লে দর্শনার্থীর সংখ্যাও বাড়বে।
এ বিষয়ে মাদারীপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) আল নোমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমাদের সংগ্রহে বেশি পুরোনো কিছু তৈজসপত্র রয়েছে। কিছু পুরোনো খাট-পালঙ্কও আছে। তবে আমাদের পরিকল্পনা রয়েছে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের পৈতৃক ভিটা, এফ আর খানের বাড়ি, খালিয়া জমিদার বাড়িসহ জেলার যেসব বিখ্যাত ব্যক্তিদের বাড়ি রয়েছে, তাদের কাচের রেপ্লিকা তৈরি করে পাশে আবার তাদের বায়ো বা মূর্তি ছোট করে রাখা হবে। বিভিন্ন বিখ্যাত ব্যক্তিদের পরিচিতি তুলে ধরা হবে। তবে সমস্যা হচ্ছে বাজেট। বাজেট না থাকায় কাজ তেমন এগোচ্ছে না।’
এসআর/এএইচ/জেআইএম