নবম পে-স্কেল: বেতন কমিশনের সুপারিশ ছিল কী, সরকারের পরিকল্পনা কী

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০১:০৭ পিএম, ১৮ মে ২০২৬
ফাইল ছবি

প্রায় ১১ বছর পর সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হতে যাচ্ছে। নতুন এই বেতন কাঠামো বা নবম পে স্কেল বাস্তবায়নে আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ৩৭ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের পরিকল্পনা করা হয়েছে। তবে নবম জাতীয় বেতন কমিশনের মূল সুপারিশ পুরোপুরি বাস্তবায়ন না করে তা কাটছাঁট ও ধাপে ধাপে কার্যকরের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার।

অর্থ বিভাগ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আগামী ১ জুলাই থেকে নতুন কাঠামোর আংশিক বাস্তবায়ন শুরু হতে পারে। প্রথম ধাপে সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, আধা-সরকারি, বিচার বিভাগ এবং বিভিন্ন বাহিনীর কর্মীরা নতুন বেসিক বেতনের ৫০ শতাংশ পাবেন। বাকি অংশ এবং ভাতা পরবর্তী দুই অর্থবছরে ধাপে ধাপে কার্যকর করা হবে।

তিন ধাপে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের পরিকল্পনা

সরকারি পরিকল্পনা অনুযায়ী নতুন বেতন কাঠামো তিন ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। প্রথম ধাপে (২০২৬-২৭ অর্থবছর) নতুন বেসিকের ৫০ শতাংশ কার্যকর হবে। দ্বিতীয় ধাপে (২০২৭-২৮ অর্থবছর) বাকি ৫০ শতাংশ বেসিক দেওয়া হবে। তৃতীয় ধাপে (২০২৮-২৯ অর্থবছর) বিভিন্ন ভাতা ও সুবিধা সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন করা হবে।

বেতন কমিশনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, পূর্ণ পে-স্কেল বাস্তবায়নে কমিশনের হিসাবে প্রায় ৪৩ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হলেও বর্তমানে বিদ্যমান ১০ শতাংশ মহার্ঘভাতা সমন্বয়ের পর এই ব্যয় কমে ৩৭ হাজার কোটি টাকায় নেমে এসেছে।

জানা গেছে, সাবেক সচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বাধীন পে-কমিশনের প্রতিবেদনে বেতন কাঠামোতে ১০০ থেকে ১৪৭ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছিল। পাশাপাশি সর্বনিম্ন বেতন ৮২৫০ টাকা থেকে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ ৭৮ হাজার থেকে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার সুপারিশ ছিল।

কমিশনের প্রস্তাবে ২০টি গ্রেড অপরিবর্তিত রেখে বিভিন্ন স্তরে বেতন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর কথা বলা হয়।

তবে, পরে গঠিত সচিব কমিটি সুপারিশের বড় অংশ কাটছাঁট করে ভাতার ক্ষেত্রেও সীমিত পরিবর্তনের পক্ষে মত দেয়। বিশেষ করে কুক-মালি-গাড়ি সংক্রান্ত ভাতা এবং উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের কিছু সুবিধা অপরিবর্তিত রাখার সুপারিশ করা হয়।

সূত্র জানায়, কমিশনের প্রস্তাবিত মোট বাস্তবায়ন ব্যয় প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা থেকে কমিয়ে ৯০ হাজার কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়েছে।

পেনশন ও ভাতায় পরিবর্তনের প্রস্তাব

মাসে ২০ হাজার টাকার কম পেনশন পেলে তা ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হতে পারে। ২০ থেকে ৪০ হাজার টাকার পেনশনে বাড়তে পারে সর্বোচ্চ ৭৫ শতাংশ এবং ৪০ হাজার টাকার বেশি পেনশনে বাড়তে পারে ৫৫ শতাংশ পর্যন্ত।

এছাড়া, বয়সভিত্তিক চিকিৎসা ভাতাও নির্ধারণ করা হয়েছে। ৭৫ বছরের বেশি হলে ১০ হাজার টাকা, ৫৫ থেকে ৭৪ বছর বয়সীদের জন্য ৮ হাজার এবং ৫৫ বছরের কম বয়সীদের জন্য ৫ হাজার টাকা।

প্রতিবন্ধী সন্তান থাকলে মাসিক ২ হাজার টাকা ভাতা, টিফিন ভাতা ২০০ টাকা থেকে ১ হাজার টাকা এবং বৈশাখী ভাতা ২০ শতাংশ থেকে ৫০ শতাংশ করার সুপারিশ করা হয়েছে।

নতুন বেতন স্কেল: গ্রেডভিত্তিক কাঠামো

প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী ১ম গ্রেডে সর্বোচ্চ বেতন ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা এবং ২০তম গ্রেডে সর্বনিম্ন ২০ হাজার টাকা নির্ধারণের সুপারিশ রয়েছে। মাঝের গ্রেডগুলোতেও ধাপে ধাপে বেতন বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

২০১৫ সালে অষ্টম পে-স্কেল ঘোষণার প্রায় ১১ বছর পর নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও প্রশাসনিক পুনর্মূল্যায়নের কারণে সুপারিশ চূড়ান্ত হলেও তা আংশিকভাবে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।

সরকারি সূত্র বলছে, সামরিক ও বিচার বিভাগের জন্য আলাদা বেতন কমিশন চূড়ান্ত করার কাজও চলমান।

বেতন কমিশনের সুপারিশের বিস্তারিত

সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বাধীন ২১ সদস্যের বেতন কমিশন চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাস্মদ ইউনূসের কাছে প্রতিবেদন জমা দেন। এ প্রতিবেদন তৈরির ক্ষেত্রে অনলাইনে জরিপের মাধ্যমে ২ লাখ ৩৬ হাজার অংশগ্রহণকারী মতামত দেন। মূল্যস্ফীতি, জীবনমানসহ বিভিন্ন বিষয়ে তাদের মতামত বিবেচনায় নেয় বেতন কমিশন। বেতন কমিশন চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে নতুন বেতন কাঠামো কার্যকরের সুপারিশ করে। তবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তা বাস্তবায়ন না করে, বর্তমান সরকারের ওপর ছেড়ে দেয়।

নতুন বেতন কাঠামোতে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বৈশাখী ভাতা ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করার সুপারিশ করা হয়। বর্তমানে ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের জন্য যাতায়াত ভাতা রয়েছে। এ যাতায়াত ভাতা নতুন বেতন কমিশন ১০ম থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত দেওয়ার সুপারিশ করেছে।

প্রথম থেকে দশম গ্রেড পর্যন্ত সরকারি চাকরিজীবীদের বাড়িভাড়া তুলনামূলক কম হারে দেওয়ার সুপারিশ করা হয়। ১১তম থেকে ২০তম ধাপে বাড়িভাড়ার হার তুলনামূলক বেশি দেওয়ার সুপারিশ করে কমিশন।

কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, ১ম গ্রেডের মূল বেতন (নির্ধারিত) ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা, ২য় গ্রেডের ১ লাখ ৩২ হাজার থেকে ১ লাখ ৫৩ হাজার টাকা, ৩য় গ্রেডের ১ লাখ ১৩ হাজার থেকে ১ লাখ ৪৮ হাজার টাকা, ৪র্থ গ্রেডের ১ লাখ থেকে ১ লাখ ৪২ হাজার ৪০০ টাকা, ৫ম গ্রেডের ৮৬ হাজার থেকে ১ লাখ ৩৯ হাজার ৭০০ টাকা।

৬ষ্ঠ গ্রেডের ৭১ হাজার থেকে ১ লাখ ৩৪ হাজার টাকা, ৭ম গ্রেডের ৫৮ হাজার থেকে ১ লাখ ২৬ হাজার ৮০০ টাকা, ৮ম গ্রেডের ৪৭ হাজার ২০০ থেকে ১ লাখ ১৩ হাজার ৭০০ টাকা, ৯ম গ্রেডের ৪৫ হাজার ১০০ থেকে ১ লাখ ৮ হাজার ৮০০ টাকা, ১০ম গ্রেডের ৩২ হাজার থেকে ৭৭ হাজার ৩০০ টাকা, ১১তম গ্রেডের ২৫ হাজার থেকে ৬০ হাজার ৫০০ টাকা সুপারিশ করা হয়েছে।

১২তম গ্রেডের ২৪ হাজার ৩০০ থেকে ৫৮ হাজার ৭০০ টাকা, ১৩তম গ্রেডের ২৪ হাজার থেকে ৫৮ হাজার, ১৪তম গ্রেডের ২৩ হাজার ৫০০ থেকে ৫৬ হাজার ৮০০ টাকা, ১৫তম গ্রেডের ২২ হাজার ৮০০ থেকে ৫৫ হাজার ২০০ টাকা, ১৬তম গ্রেডের ২১ হাজার ৯০০ থেকে ৫২ হাজার ৯০০ টাকা, ১৭ তম গ্রেডের ২১ হাজার ৪০০ থেকে ৫১ হাজার ৯০০ টাকা সুপারিশ করা হয়েছে।

এছাড়া, ১৮তম গ্রেডের ২১ হাজার থেকে ৫০ হাজার ৯০০ টাকা, ১৯তম গ্রেডের ২০ হাজার ৫০০ থেকে ৪৯ হাজার ৬০০ টাকা এবং ২০তম গ্রেডের মূল বেতন ২০ হাজার থেকে ৪৮ হাজার ৪০০ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

এমএএস/এএমএ

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।