বেকারত্বে বাংলাদেশ দ্বাদশ
দেশে হু হু করে বাড়ছে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা। এর চেয়ে অনেক গুণ বাড়ছে অশিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা। কিন্তু সম্পদের সীমাবদ্ধতা, অবকাঠামো সমস্যা, গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট আর উদ্যোক্তাদের আস্থাহীনতায় বাড়ছে না বিনিয়োগ। সৃষ্টি হচ্ছে না নতুন নতুন কর্মক্ষেত্র। ফলে হচ্ছে না প্রয়োজন অনুসারে কর্মসংস্থান ।
বিশ্বে বেকারত্ব বাড়ছে এমন ২০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ১২তম অবস্থানে রয়েছে । আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার একটি প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য পাওয়া গেছে।
এদিকে, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যমতে, দেশে গত এক দশকে বেকারত্ব বেড়েছে ১ দশমিক ৬ শতাংশ। আর নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির হার কমেছে ২ শতাংশ। প্রতি বছর ২৭ লাখ মানুষ শ্রমবাজারে ঢুকছে। অথচ সরকারি বা বেসরকারিভাবে কাজ পাচ্ছে মাত্র ১ লাখ ৮৯ হাজার মানুষ। ফলে প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক মানুষ বেকার থাকছে। এতে উৎপাদন কমে যাচ্ছে। ফলে দেশের অর্থনীতিতে এক ধরনের অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে এই বেকার জনশক্তি। এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। আর বিনিয়োগ বৃৃদ্ধির জন্য সরকারের পক্ষ থেকে উদ্যোক্তাদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
গত জানুয়ারিতে প্রকাশিত আইএলও`র বিশ্ব কর্মসংস্থান ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি-২০১৫ শীর্ষক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০১৪ সালে বাংলাদেশে বেকারত্ব বৃদ্ধির হার ৪ দশমিক ৩৩ শতাংশ, যা এক বছর আগে ছিল ৪ দশমিক ২০ শতাংশ। এ ধারা অব্যাহত থাকলে চলতি বছর শেষে মোট বেকারের সংখ্যা ৬ কোটিতে দাঁড়াবে।
আইএলও`র মতে, বাংলাদেশে বেকারত্ব বৃদ্ধির কারণ বিনিয়োগ না হওয়া, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও অবকাঠামো সমস্যা। প্রতিবেদনে এশিয়ার দেশগুলো কর্মসংস্থান বৃদ্ধির ক্ষেত্রে বর্তমান কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে বাংলাদেশ এবং শ্রীলঙ্কা টানা কয়েক বছর ধরে ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করছে। যা এ অঞ্চলের অন্য দেশগুলো এমন কি ভারতও করতে পারছে না।
বিবিএসের সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী ২০১০ সালে দেশে বেকারের সংখ্যা ছিল ২৬ লাখ। এরপর আর কোনো জরিপ করেনি সংস্থাটি। তবে বিবিএসের একটি সূত্র জানায়, বর্তমানে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ৩০ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। গত ১০ বছরে দেশে বেকারত্ব বেড়েছে ১ দশমিক ৬ শতাংশ, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির হার কমেছে ২ শতাংশ।
এদিকে সরকারের দাবি, গত পাঁচ বছরে ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার আলোকে দেশে-বিদেশে ১ কোটি ৮২ হাজার লোকের কর্মসংস্থান হয়েছে। আর সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার বাস্তবায়ন করতে পারলে আগামী পাঁচ বছরে আরও ১ কোটি ৩২ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হবে বলে ৩১ মার্চ এনইসির এক সভায় জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত।
আইএলও বলছে, বর্তমানে বাংলাদেশের ৪৭ শতাংশ স্নাতকোত্তর যুবক-যুবতীই বেকার। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি শিক্ষিত বেকার রয়েছে আফগানিস্তানে ৬৫ শতাংশ। এর বাইরে ভারতে এ হার ৩৩ শতাংশ, নেপালে ২০ শতাংশের বেশি, পাকিস্তানে ২৮ শতাংশ এবং শ্রীলঙ্কায় ৭ দশমিক ৮ শতাংশ।
বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির ২০১২ সালের এক গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর ২২ লাখ মানুষ শ্রমবাজারে প্রবেশ করে। কিন্তু কাজ পায় মাত্র সাত লাখ। এর মধ্যে উচ্চশিক্ষিত অর্থাৎ স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে যারা শিক্ষাজীবন শেষ করেছেন, তারাও আছেন। ফলে প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক জনগোষ্ঠী বেকারের তালিকায় নাম লেখাচ্ছেন।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বি আইডিএস) গবেষক, অর্থনীতিবিদ ও অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান জায়েদ বখত মনে করেন, প্রতি বছরই শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে। তাই শিক্ষার ভিত্তিতে অর্থনৈতিক নীতি এবং অর্থনীতির গতি-প্রকৃতির আলোকে শিক্ষাব্যবস্থার সমন্বয় না করলে এ সংখ্যা ক্রমাগত বাড়তেই থাকবে।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালে দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক-স্নাতকোত্তরসহ উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেছেন প্রায় চার লাখ। অথচ প্রতি বছর চাকরি পান ৫০ হাজারের কমসংখ্যক যুবক-যুবতী। এ ছাড়া শিক্ষিত নন কিন্তু প্রতি বছর কর্মক্ষম হচ্ছেন এমন মানুষের সংখ্যা কমপক্ষে ১৮ লাখ।
এসএস/এআরএস/এমএস