খাবার নিয়ে মারামারি : শতাধিক অভিবাসীর মৃত্যু
বাংলাদেশ এবং মিয়ানমার থেকে নৌকায় করে যেসব অবৈধ অভিবাসী ইন্দোনেশিয়ার আচেহ প্রদেশে আশ্রয় নিয়েছেন, তারা যাত্রাপথের করুণ, রোমহর্ষক সব ঘটনার বর্ণনা দিচ্ছেন। খাবার নিয়ে দাঙ্গা বেধে গেলে একটি নৌকাতেই অন্তত একশোর লোকের মৃত্যু ঘটে বলে জানান কয়েকজন অভিবাসী। অন্য একটি নৌকায় বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গাদের মধ্যে মারামারিতে প্রায় কয়েক ডজন লোক মারা যান। মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও ইন্দোনেশিয়া উপকূল এবং আন্দামান সাগরে এখনো মৃত্যুঝুঁকিতে প্রায় ছয় হাজার অভিবাসী।
সংশ্লিষ্ট দেশগুলো এ ব্যাপারে জোরালো উদ্যোগ না নিয়ে দোষ চাপানোর কূটনৈতিক খেলা শুরু করায় এবং উপকূল থেকে অভিবাসীদের নৌকা তাড়িয়ে দেয়ায় এ সংকট আরও তীব্রতর হয়েছে। তবে রোববার মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আনিফাহ আমান বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাহমুদ আলীর সঙ্গে বৈঠক করেছেন। বৈঠকে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া ৩১ দফা চুক্তি সই হয়েছে। আনিফাহ আমান সোমবার ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে এবং এরপর থাই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করবেন।
এদিকে যে তিন হাজার অভিবাসী উদ্ধার হয়েছেন তাদের বেশিরভাগই আছেন মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায়। ইতিমধ্যে তাদের পরিচয় শনাক্তকরণ শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্ট দেশগুলো এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইএমও) এ কাজ করছে। রোববার পর্যন্ত উদ্ধার অভিবাসীদের মধ্যে মালয়েশিয়ায় ৬০৩ জন এবং ইন্দোনেশিয়ায় ২৩৮ জন বাংলাদেশির পরিচয় নিশ্চিত করা হয়েছে। খবর বিবিসি, এএফপি, ব্যাংকক পোস্ট।
রোববার ইন্দোনেশিয়ার আচেহ প্রদেশের আশ্রয় কেন্দ্রে বেশ কয়েকজন অভিবাসী বিবিসির সাংবাদিকদের বলেছেন- একবার খাবার নিয়ে দাঙ্গা বেধে গেলে একটি নৌকাতেই অন্তত একশো লোক মারা গেছেন। তারা বলেন, খাবার নিয়ে এদের কাউকে কাউকে ছুরি মারা হয়, কাউকে গলায় রশি পেঁচিয়ে হত্যা করা হয়। আবার কাউকে কাউকে নৌকা থেকে সাগরে ছুড়ে ফেলা হয়।
ইন্দোনেশিয়ার আচেহ প্রদেশের একটি ক্যাম্পে আশ্রয় পাওয়া অবৈধ অভিবাসীদের মুখ থেকে এসব কথা জানা গেছে। তাদের মধ্যে একজন বাংলাদেশি মোহাম্মদ রফিক। তিনি বলছিলেন, অন্তত ১০৪ জন লোক এভাবে মারা গেছেন। তিনি বলেছেন, নৌকায় আমাদের মারধর করা হয়েছে। মারধর সহ্য করতে না পেরে আমরা পানিতে ঝাঁপ দেই। এর মধ্যে যারা সাঁতার জানতেন তারা ভেসে ছিলেন। যারা জানতেন না তারা পানিতে ডুবে মারা গেছেন। ১০৪ জনের মতো মানুষ মারা গেছেন।
তিনি আরো বলেন, ছোট ছেলেমেয়েদের আমরা খুঁজে পাচ্ছি না। এ ঘটনাটা চলে রাত ৯টা পর্যন্ত। এরপর ৬ ঘণ্টা পর্যন্ত আমরা পানিতে ভেসেছিলাম। তারপর ইন্দোনেশিয়ার নেভি এবং জেলে যারা অনেক দূরে মাছ ধরতে যান, তারা আমাদের তুলে নেন।
এদের অনেকে বলেছেন, কয়েকজনকে ছুরি মারা হয়েছে এবং কয়েকজনকে ফাঁসি দেয়া হয়েছে। কিন্তু এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা কঠিন। তবে অন্যান্য সংবাদ মাধ্যম একই ঘটনার কথা যেভাবে রিপোর্টে করেছে- তার বর্ণনার সঙ্গে এর মিল রয়েছে। বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের হাজার হাজার লোক থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়ার কাছাকাছি সমুদ্রে অনেক নৌকায় এখনো ভাসছেন।
জানা গেছে, আটকেপড়া বোটগুলোতে অভিবাসীরা বেঁচে আছেন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে। তাদের দেহ হাড্ডিসার। ফ্যাল ফ্যাল করে ওরা তাকিয়ে রয়েছেন সমুদ্রের উত্তাল জলরাশির দিকে। রোগে ভুগে, ক্ষুধায় কাতর এসব মানুষ। তাদের পান করার মতো পানি নেই। এমন বর্ণনা দিলেন মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশের রোহিঙ্গা আবদুল্লাহ (২০)। তিনি জানান, আমি যদি জানতাম নৌকায় সমুদ্র পাড়ি দেয়া এতোটাই কঠিন তাহলে প্রয়োজনে দেশের মাটিতেই মারা যেতাম।
শনিবার যেসব মানুষ ইন্দোনেশিয়ার তীরে উঠতে পেরেছেন তাদের একজন তিনি। বিভিন্ন দেশের কর্তৃপক্ষ যখন সমুদ্রে মানব পাচার বন্ধে পদক্ষেপ জোরালো করে তখন তাদের বহনকারী নৌযানটি সমুদ্রের মাঝে। তারপর কেটে গেছে দুই সপ্তাহ। মানবাধিকারবিষয়ক বিভিন্ন গ্রুপ সতর্কতা উচ্চারণ করেছে আগেই। তারা বলেছে, এ অভিযান জোরালো হওয়ার ফলে পাচারকারী চক্রের ক্যাপ্টেন, যে নৌযান চালাচ্ছিল, সে নৌযান ফেলে এতোগুলো মানুষকে বিপদের মুখে ফেলে পালাতে পারে। হয়েছেও তাই।
আবদুল্লাহ বলেন, বেশ কয়েক দিন আগে একটি ফোন আসে। সেই ফোন পেয়ে একটি স্পিডবোট নিয়ে পালিয়ে যায় চালক। তার আগে সে তাদের নৌযানের ইঞ্জিন বিকল করে দিয়ে যায়। তারপর থেকে তারা ভাসছিল গভীর সমুদ্রে। একপর্যায়ে ওই নৌযানের খাবার ফুরিয়ে যায়। পানি শেষ হয়ে যায়। অধৈর্য হয়ে পড়েন সবাই। ফলে রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশি অভিবাসীদের মধ্যে শুরু হয় মারামারি। এতে কমপক্ষে কয়েক ডজন মানুষ নিহত হন।
আবদুল্লাহ আরো বলেন, বাংলাদেশিরা মনে করেছিল ক্যাপ্টেনের বাড়ি ছিল মিয়ানমারে। তাই বাংলাদেশিরা আমাদের ওপর লাঠি ও ছুরি নিয়ে আক্রমণ চালায়। তবে এই ঘটনায় বেঁচে আছেন ১৯ বছর বয়সী বাংলাদেশি সাইদুল ইসলাম। তিনওি বললেন, ওই মারামারির পর অনাহারে ও আঘাতের ক্ষত নিয়ে তাদের নৌযানের কয়েক ডজন মানুষ মারা গেছেন।
বিএ/এমএস