সেলুন থেকে টিকটক, কিশোর গ্যাং তৈরির চেষ্টাও ছিল অপুর

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৫:২৪ পিএম, ০৫ আগস্ট ২০২০

সড়কে মারামারির ঘটনায় আলোচিত-সমালোচিত বাংলাদেশি টিকটকার ইয়াসিন আরাফাত অপু ওরফে ‘টিকটক অপু’ ওরফে ‘অপু ভাইকে’ সোমবার (৩ আগস্ট) গ্রেফতার করে উত্তরা পূর্ব থানা পুলিশ। মারধরের ঘটনায় গ্রেফতার করা হলেও তার বিরুদ্ধে কিশোর গ্যাং তৈরির প্রচেষ্টা খুঁজে পেয়েছে পুলিশ। তার বিরুদ্ধে থাকা আরও অপরাধের অভিযোগের বিষয়ে জানতে তদন্ত করছে তারা।

অস্ত্র দিয়ে মারপিট করে রক্তাক্ত জখম, চুরি ও হুমকির অভিযোগে তার তিন দিনের রিমান্ডে চেয়েছিল পুলিশ। তবে মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) তার রিমান্ড না দিয়ে তাকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন আদালত।

এ ঘটনায় নাজমুল নামের একজনকে গ্রেফতার করা হলেও এজাহারভুক্ত আরও সাত আসামি এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে।

পুলিশ জানায়, পলাতক আসামিদের গ্রেফতারের পাশাপাশি মামলার তদন্ত কার্যক্রম চালাচ্ছে তারা।

অপুর গোড়াপত্তনের বিষয়ে তদন্ত করতে গিয়ে পুলিশ জানতে পারে, সে নোয়াখালীর ছেলে। সেখানে একটি মাদরাসায় পড়াশোনা করত সে। টাকার অভাবে মাদরাসা ছেড়ে ঢাকায় চলে আসে। ঢাকায় একটি সেলুনে কাজ করত। সেলুনের বন্ধুরা তাকে ভিডিও শেয়ারিং অ্যাপ টিকটক ও লাইকি’র কথা জানালে সে ভিডিও তৈরি করতে শুরু করে। তার ভিডিওগুলো নির্দিষ্ট কোনো গল্প বা বিষয় নিয়ে তৈরি করত না। এমনিতে বিভিন্ন ইস্যুতে নিজের মতামত দিত সে। এছাড়া তার সমালোচকদের ভিডিওর মাধ্যমে জবাব দিত।

তদন্ত সূত্রে জানা গেছে, অপু সেলুনে কাজ করার পাশাপাশি রাস্তায়, অন্যের বাসার ছাদে, ক্ষেতে, বাসের ভেতরেও খুব উদ্দেশ্যহীনভাবে টিকটক বানাত। তার টিকটকে দেড় লাখ ও লাইকিতে ১০ লাখ ফলোয়ার হওয়ার কারণে সে গত দুই মাসে শুধু ভিডিও তৈরি করে অর্ধলাখের মতো টাকা আয় করে। টাকা আসছে এ কারণে সে পেশাদার টিকটকার হিসেবে ভিডিও তৈরি করতে ঢাকার বিভিন্ন ফাঁকা সড়কে শুটিং শুরু করে। অল্পদিনেই তার ফ্যান-ফলোয়ার বাড়তে থাকায় তার মধ্যে একটা দাম্ভিক ভাব চলে আসে। সেই ভাব থেকেই রোববারের মারধরের ঘটনার সূত্রপাত। এছাড়া সে কিশোর গ্যাং প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে।

পুলিশ তদন্তে জানতে পারে, অপুর সহযোগীরা অধিকাংশই ভবঘুরে, ঢাকার বিভিন্ন বস্তিতে বসবাস করে। কেউ হোটেলে বেয়ারার কাজ করে, কেউ মোটরসাইকেল মেরামতের দোকানে। অপুর ভিডিওগুলোতে তার আচরণ প্রথম থেকেই উশৃঙ্খল ছিল। তবুও তার ফলোয়াররা এটাকে খুব স্বাভাবিকভাবে নিয়েই তাকে সমর্থন করে যাচ্ছিল।

অপুর বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উত্তরা পূর্ব থানার এসআই আজিজুর তালুকদার জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমরা ঘটনার তদন্ত করছি। পুলিশি হেফাজতে থাকা অপু তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো স্বীকার করেছে। আমরা তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছি। এছাড়া বাকি আসামিদের ধরতেও অভিযান চলছে। মারধরের মামলাটি তদন্ত করতে গিয়ে অপুর কিশোর গ্যাং প্রতিষ্ঠার বিষয়টি উঠে আসে। এছাড়া তার বিরুদ্ধে অন্য কোনো অপরাধের অভিযোগ আছে কি না- তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’

এ বিষয়ে পুলিশের উত্তরা বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) নাবিদ কামাল শৈবাল বলেন, ‘অপু নোয়াখালী থেকে বছরখানেক আগে ঢাকায় এসেছে। সেলুনের পাশাপাশি টিকটকের কাজ করছে। সে ও তার সঙ্গীদের কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা আছে কি না- আমরা দেখছি। তবে আমরা ধারণা করছি, কিশোর গ্যাং হিসেবে নিজেদের আত্মপ্রকাশে একটি জোর প্রচেষ্টা তারা চালিয়ে যাচ্ছে। আমরা তদন্ত করছি।’

এর আগে সোমবার রাতে সাধারণ নাগরিকদের হেনস্তা এবং মারধর করার অপরাধে রাজধানীর উত্তরা থেকে টিকটক ভিডিও নির্মাতা অপুকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

গ্রেফতারের পর মঙ্গলবার তাকে ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতে হাজির করে মামলার সুষ্ঠু তদন্তের জন্য তিন দিনের রিমান্ডে নিতে আবেদন করে পুলিশ। অন্যদিকে তার আইনজীবী রিমান্ড বাতিল চেয়ে আবেদন করেন। উভয় পক্ষের শুনানি শেষে ঢাকা মহানগর হাকিম বেগম মাহমুদা আক্তার রিমান্ড আবেদন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।

মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, রোববার প্রকৌশলী মেহেদি হাসান রবিন উত্তরার সড়কটি দিয়ে তার ব্যক্তিগত গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছিলেন। সঙ্গে তার দু-তিনজন বন্ধুও ছিল। তবে আলাউল অ্যাভিনিউয়ের সড়ক আটকে ‘অপু ভাই’ ও তার সহযোগীরা টিকটক বানাচ্ছিল। রবিন রাস্তা আটকানো দেখে হর্ন বাজান। হর্ন বাজানোর পর অপু ও তার সহযোগীরা বিরক্ত বোধ করে এবং গাড়ি উদ্দেশ করে অশালীন কথা বলতে থাকে। রবিন ও তার বন্ধুরা গাড়ি থেকে নেমে সাইড দিতে বলেন। তবে ‘কেন গাড়ির হর্ন বাজানো হলো’ এবং ‘কেন রাস্তা ছাড়তে বলল’, এ কারণে অপু ও তার সহযোগীরা রবিনসহ তার দুই বন্ধুকে মারধর করে। এতে রবিন এবং বাকি দুৎজন গুরুতর আহত হন।

উত্তরা পশ্চিম থানা সূত্র জানায়, মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, ‘অপু ও তার সহযোগীরা বেআইনিভাবে দলবদ্ধ হয়ে গতিরোধ করে দেশীয় ধারালো অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে মারপিট করে রক্তাক্ত ও গুরুতর জখমসহ চুরি, ভয়ভীতি ও হুমকির অপরাধ করেছে।’

মামলায় দণ্ডবিধি ১৪৩, ৩৪১, ৩২৩, ৩২৪, ৩২৫, ৩৫৯ ও ৩৭৯ ধারায় অপরাধ করার উল্লেখ করা হয়েছে। মামলায় দণ্ডবিধির ধারা ১৪৩ বেআইনি সমাবেশ করার অপরাধে, ৩৪৩ অন্যায়ভাবে কাজে বাধা প্রদানের জন্য, ৩২৩ কোনো ব্যক্তিকে হাত দ্বারা বা ভোতা অস্ত্র দ্বারা আঘাত করায়, ৩২৫ কোনো ব্যক্তিকে হাত দ্বারা বা ভোতা অস্ত্র দ্বারা ‘গুরুতর’ আঘাত করার সাজা, ৩২৬ কোনো ব্যক্তিকে (শুধুমাত্র) ধারালো অস্ত্র দ্বারা গুরুতর আঘাত করা এবং ৩৭৯ ঘরের বাইরে বা খোলা জায়গা থেকে মালামাল চুরি করার অপরাধে দেয়া হয়েছে।

মামলার এজাহারে অপুসহ তার বন্ধু রনি, মুরাদ, জমিরউদ্দিন, নাজমুল, শাহদাত হোসেন শাকিলসহ অজ্ঞাত ২০-২৫ জনকে আসামি করা হয়েছে।

এআর/এফআর/এমকেএইচ

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]