নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে খাদ্য ও পানীয় পরীক্ষার ফল প্রকাশের দাবি

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১০:০৬ পিএম, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২১

জনস্বাস্থ্য ও রপ্তানি বৃদ্ধির স্বার্থে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে সব খাদ্য ও পানীয় নিয়মিত পরীক্ষা ও জনসম্মুখে তা প্রকাশ করার দাবিতে মানববন্ধন করেছেন পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা), নাগরিক অধিকার সংরক্ষণ ফোরাম (নাসফ) ও বারসিকসহ ১৪টি সংগঠনের নেতাকর্মীরা।

শনিবার (১১ সেপ্টেম্বর) জাতীয় জাদুঘরের সামনে এ মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।

মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, বাংলাদেশ আয়তনে ছোট ও দুর্যোগপূর্ণ দেশ হলেও বিশ্বের বড় দেশগুলোর সাথে পাল্লা দিয়ে বর্তমানে ধান, মাছ ও সবজি উৎপাদনে বিশ্বের প্রথম সারির দেশগুলোর কাছাকাছি চলে এসেছে।

প্রচলিত ও প্রায় অনিয়ন্ত্রিত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ভিত্তিক উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ ব্যবস্থাপনার দাপটে অর্গানিক বা জৈব কৃষিজাত পণ্যের ব্যাপক চাহিদা থাকা সত্ত্বেও জৈবকৃষির উৎপাদন ও বাজার আশানুরূপ বৃদ্ধি পাচ্ছে না। ফসলে কীটনাশকের অপপ্রয়োগ ও মাত্রাতিরিক্ত সার ব্যবহারে খাদ্য দূষিত হচ্ছে।

একইসঙ্গে মজুতদার, পাইকারী ও খুচরা বিক্রেতারা খাদ্যে বিভিন্ন রাসায়নিক তথা ফরমালিন, ক্যালসিয়াম, কার্বাইড, ইথোফেন, কীটনাশক, কাপড়ের রং, পোড়া তেল ও মবিল মিশ্রিত তেলসহ নানা রকম ক্ষতিকারক রাসায়নিক উপকরণ, হরমোন এবং এন্টিবায়োটিক মেশাচ্ছেন। প্রক্রিয়াজাত খাদ্যেও নানা ধরণের বিষাক্ত রাসায়নিক মেশানো হচ্ছে।

এর ফলে প্রায় সব খাদ্য ও পানীয়তে বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থের উপস্থিতি পাওয়া যাচ্ছে। দেশে প্রতি বছর দেড় লাখ মানুষ ক্যানসারে আক্রান্ত হন। যার মধ্যে মারা যান ৯১ হাজার ৩০০ জন। কিডনি জটিলতায় দেশে ২০১৯ সালে যত মানুষ মারা গেছেন, তার প্রায় তিনগুণ মানুষ মারা গেছেন ২০২০ সালে। ২০২০ সালে কিডনি সংক্রান্ত জটিলতায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন ২৮ হাজার ১৭ জন। বাংলাদেশে প্রতি বছর ২ লাখ ৭৭ হাজার মানুষ হৃদরোগে মারা যান। যার ৪ দশমিক ৪১ শতাংশের জন্য দায়ী ট্রান্সফ্যাট।

এসময় বক্তারা বলেন, জমির মাটি থেকে খাবার থালা অবধি খাদ্য নিরাপদ হওয়া জরুরি। খাবার নিরাপদ কি-না এ নিয়ে নিয়মিত খাদ্য পরীক্ষাও জরুরি। আমরা যেমন খাবারে কোনো ভেজাল চাই না, তেমনি আবার ফরমালিন-কার্বাইড বা ক্ষতিকর কোনো উপাদান খাবারে মিশে থাকুক তাও চাইনা। খাদ্য উৎপাদনের পরিবেশ এবং কোনো ধরণের শস্য থেকে খাদ্য উৎপাদিত হচ্ছে তাও পরখ করে দেখতে চাই।

প্রতিদিন দেশে কমছে কৃষিজমি এবং প্রাকৃতিক পানির উৎসস্থল। আমরা কৃষিজমি ও জলাভূমিকে বাঁচাতে পারছি না। আবার প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্থ কৃষক বাধ্য হয়ে অধিক খাদ্য ফলানোর নামে খাদ্য উৎপাদনে ব্যবহার করছে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক।

ক্ষতিকর কীটনাশক, আগাছানাশক কিংবা ছত্রাকনাশক মাটির অণুজীব থেকে শুরু করে শামুক-কেঁচোসহ নানা উপকারী পতঙ্গ মেরে ফেলছে। দূষিত করছে সামগ্রিক পরিবেশ। ফলে মানবস্বাস্থ্যসহ অন্যান্য প্রাণবৈচিত্র্য ক্রমেই হুমকির মুখে পড়ছে। জমিতে ব্যবহৃত কীটনাশক বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে তা শেষ পর্যন্ত জলাশয়ের পানিতে গিয়ে মিশছে। এভাবে হারিয়ে যাচ্ছে দেশি মাছের বৈচিত্র্য। পাশাপাশি জলজ জীব ও জলচর পাখিদের জন্যও খাদ্যসংকট তৈরি হচ্ছে।

বক্তারা আরও বলেন, জাতীয় সংসদ ২০১৩ সালের ১০ অক্টোবর দেশের নাগরিকের জীবন ও স্বাস্থ্য সুরক্ষায় নিরাপদ খাদ্যপ্রাপ্তির অধিকার নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩ অনুমোদন করে। এ আইন বাস্তবায়নের জন্য নিরাপদ খাদ্য বিধিমালা ২০১৪ তৈরি হয়েছে। খাদ্যে ভেজাল ও ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ মেশানোর দায়ে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড ও ২০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।

jagonews24

২০১৫ সালের ২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ গঠিত হয়েছে। একইসঙ্গে ২০১৮ সালে অনুমোদিত হয়েছে ‘নিরাপদ খাদ্য (স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ সংরক্ষণ) প্রবিধানমালা ২০১৮’। এ প্রেক্ষাপটে দেশে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন দিন দিন বাড়তে শুরু করেছে এবং প্রতি বছর দেশ থেকে প্রচুর পরিমাণ আম, সবজি, মাছ, আলুসহ বিভিন্ন ধরণের কৃষিপণ্য বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করে প্রচুর পরিমান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব হচ্ছে।

নাগরিক অধিকার সংরক্ষণ ফোরামের (নাসফ) সভাপতি মো. হাফিজুর রহমান ময়নার সভাপতিত্বে ও পবার সম্পাদক এম এ ওয়াহেদের সঞ্চালনায় মানববন্ধনে আরও বক্তব্য দেন পবার চেয়ারম্যান আবু নাসের খান, সাধারণ সম্পাদক মো. আবদুস সোবহান, সম্পাদক ফেরদৌস আহম্মেদ উজ্জ্বল, নাসফ’র সাধারণ সম্পাদক মো. তৈয়ব আলী, বারসিক’র সমন্বয়ক মো. জাহাঙ্গীর আলম, বানিপা’র সভাপতি মো. আনোয়ার হোসেন, মানবাধিকার উন্নয়ন কেন্দ্রের মহাসচিব মাহাবুল হক, বিডিক্লিকের সভাপতি আমিনুল ইসলাম টুব্বুস, সামাজিক আন্দোলন সংস্থার চেয়ারম্যান অধ্যাপক হুমায়ন কবির হিরু, বাংলাদেশ ট্যুরিস্ট সাইক্লিংয়ের সমন্বয়ক রোজিনা আক্তার, ডাব্লিউবিবি ট্রাস্টের প্রকল্প কর্মকর্তা মো. আতিকুর রহমান, গ্রিণফোর্স’র আহসান হাবিব, বাংলাদেশ যুব সমিতির সভাপতি মো. আক্তার হোসেন প্রমুখ।

মানববন্ধনে পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনসহ ১৪টি সংগঠন জনস্বাস্থ্য ও রপ্তানি বৃদ্ধির স্বার্থে সবার জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার জন্য সরকারের কাছে কয়েকটি সুপারিশ জানায়।

তাদের সুপারিশগুলো:

১. সকল খাদ্য ও পানীয় নিয়মিত পরীক্ষা ও ফলাফল জনসম্মুখে প্রকাশ করতে হবে।
২. ভেজালবিরোধী অভিযান জোরদার করতে হবে। শুধুমাত্র শহরের বিপণিবিতান নয়, একেবারে সরাসরি মাঠ পর্যায়ে খাদ্য উৎপাদন নজরদারিতে আনতে হবে।
৩. নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতকরণে মাটি ও পানি দূষণ বন্ধ করতে হবে। দেশে নিষিদ্ধ কীটনাশক ও রাসায়নিকের ব্যবহার ও বিক্রি বন্ধ করতে হবে। প্রতিটি ইউনিয়নে খাদ্যের মান নিয়মিত পরীক্ষা করে জনগণকে জানাতে হবে।
৪. মাঠ থেকে ভোক্তা পর্যন্ত সব পর্যায়ে খাদ্য কীটনাশকসহ সব ধরনের ক্ষতিকর রাসায়নিক মুক্ত রাখতে হবে।
৫. নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩ এর যথাযথ বাস্তবায়ন ও প্রচারণা চালাতে হবে। নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে সুনির্দিষ্টভাবে জাতীয় বাজেট বরাদ্দ বাড়াতে হবে। কৃষিকে প্রকৃত কৃষকের কাছে রেখে তাদের দক্ষতা রাড়াতে সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে।
৬. নারী, আদিবাসী ও ভিন্ন ভিন্ন কৃষিপ্রতিবেশ অঞ্চলের কৃষকের লোকায়ত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দিয়ে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনে সকলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
৭. নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ এবং ভোক্তা অধিকার আন্দোলনকে আরও জনবান্ধব ও যুববান্ধব করে সক্রিয় করতে হবে।
৮. দূর্যোগ ও জলবায়ুগত সংকট মোকাবেলায় দেশের অঞ্চল ও শস্যফসলের জাতের বৈশিষ্ট্যকে গুরুত্ব দিয়ে খাদ্যের বহুমাত্রিক আঞ্চলিক ব্যবহার বাড়াতে হবে। এককভাবে মানুষের জন্য খাদ্য উৎপাদন করতে গিয়ে অন্যান্য প্রাণ ও প্রজাতির খাদ্য ও পরিবেশকে বিনষ্ট করা যাবে না।
৯. দেশের চাহিদার অতিরিক্ত নিরাপদ খাদ্য বিদেশে সহজভাবে রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনসহ বিশ্বের দরবারে দেশের মর্যাদা বাড়ানের উদ্যোগ নিতে হবে।

এফএইচ/ইউএইচ/এএসএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]