কারিগরি শিক্ষা এবং বেকারবিহীন দেশ

রিয়াজুল হক
রিয়াজুল হক রিয়াজুল হক , কলাম লেখক, ব্যাংকার
প্রকাশিত: ০৮:৩২ এএম, ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

সম্প্রতি অনুষ্ঠিত হয়ে গেল ৩৮তম বিসিএস এর প্রিলিমিনারি পরীক্ষা। পরীক্ষা দিয়েছেন ৩ লাখ ৪৭ হাজার পরীক্ষার্থী। মোট পদের সংখ্যা মাত্র ২ হাজার ২৪টি। অর্থাৎ প্রতি পদের বিপরীতে পরিক্ষার্থীর সংখ্যা ১৭১ জন।

সমন্বিতভাবে সোনালী ব্যাংকে ৫২৭টি, জনতা ব্যাংকে ১৬১টি, রূপালী ব্যাংকে ২৮৩টি, বাংলাদেশ ডেভোলপমেন্ট ব্যাংকে ৩৯টি, কৃষি ব্যাংকে ৩৫১টি, রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকে ২৩১টি, বাংলাদেশ হাউজ বিল্ডিং ফাইনান্স কর্পোরেশনে ১টি এবং ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশনের ৭০টিসহ মোট ১ হাজার ৬৬৩টি সিনিয়র অফিসার পদে নিয়োগ দিতে গত ২৩ আগস্ট বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। শিক্ষাগত যোগ্যতায় বলা হয়েছিল,(ক) কোন স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় হতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি/চার বছর মেয়াদী স্নাতক(সম্মান) ডিগ্রী বা সমমানের ডিগ্রি; (খ) মাধ্যমিক এবং তদূর্ধ্ব পর্যায়ের পরীক্ষাসমূহে ন্যূনতম একটিতে প্রথম বিভাগ/শ্রেণি বা সমমানের গ্রেড পয়েন্ট থাকতে হবে।

কোন পর্যায়েই ৩য় বিভাগ/শ্রেণি/সমমানের গ্রেড পয়েন্ট গ্রহণযোগ্য হবে না। এসব পদে অনলাইনে আবেদন করেন ৩ লাখ ২৬ হাজার ৬৭০ জন চাকরিপ্রার্থী। অর্থাৎ প্রতি পদের বিপরীতে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ১৯৬ জন। অনেক উন্নত দেশের মোট জনসংখ্যা আমাদের দেশের এই চাকরি প্রার্থীর সংখ্যার থেকে কম। একটি চাকরি পাওয়ার জন্য কি অসুস্থ প্রতিযোগিতা! এতো শুধু অনার্স সম্পন্ন করা তৃতীয় বিভাগ ব্যতীত চাকরি প্রার্থীর সংখ্যা।

এই হচ্ছে বর্তমান সময়ে আমাদের দেশে শিক্ষিত বেকারের অবস্থা। সবাই সার্টিফিকেটধারী বিএ, এমএ পাস। কিন্তু পুঁথিগত বিদ্যা ছাড়া এদের কোন বিষয়ে কারিগরি জ্ঞান নেই। এদের পুরোপুরি কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা ছোট এই দেশে আদৌ সম্ভব নয়। এতো অফিসারের পদ আমাদের দেশে আদৌ নেই। আর প্রতি বছরই এই সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার বর্তমান ধরন অনুযায়ী এই সমস্যা অদূর ভবিষ্যতে আরো জটিলতর হবে।

আমাদের জনসংখ্যা আছে; কিন্তু কারিগরি জ্ঞান ভিত্তিক জনশক্তির অভাব। বেকারত্বের সংখ্যা বৃদ্ধি অর্থই দেশের অগ্রগতির ধারাকে প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন করা। একই সাথে বেকারত্বে শক্তির সীমাহীন অপচয় ঘটে। ফলে অমিত এই যৌবশক্তিকে উপেক্ষা করে দেশের অর্থনীতি কখনো শক্তিশালী ও স্বনির্ভর হতে পারে না, হওয়া সম্ভব নয়। প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে আমাদের সমস্যার সমাধান।

আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় কর্মমুখী শিক্ষা চালু করতে হবে। সহজ কথায়, কারিগর তৈরি করতে হবে। অষ্টম শ্রেণি শেষ হওয়ার পর শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষা গ্রহণের দুটি দিক থাকবে। একদল যাবে সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থায়, অন্য দল কর্মমুখী শিক্ষায়। যেসব শিক্ষার্থী অষ্টম শ্রেণির সমাপনী পরীক্ষায় জিপিএ ৩-এর কম পাবে, তারাই পরবর্তী পর্যায়ে কর্মমুখী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণ নেবে। বিভিন্ন বিষয়ভেদে এ প্রশিক্ষণের মেয়াদ হবে দুই থেকে পাঁচ বছর।

প্রশিক্ষণ শেষে বোর্ড থেকে তাদের সার্টিফিকেট দেওয়া হবে। কর্মমুখী শিক্ষা ব্যবস্থায় মাছের চাষ, হাঁস-মুরগির খামার, পশুপালন, ফলের চাষ, ড্রয়িং, গ্রাফিকস ডিজাইন, পোল্ট্রি ফার্ম, ডেইরি ফার্ম, বুটিকশিল্প, কম্পিউটার ট্রেনিং অ্যান্ড সার্ভিসিং, মোবাইল সার্ভিসিং, সেলাই, ইলেকট্রনিক সামগ্রী সার্ভিসিং, সেলুন, ক্ষুদ্র ব্যবসা, হস্তশিল্প, কাঠের কাজ, বেতের কাজ, বাঁশের কাজ, লেদ মেশিন স্থাপন, ড্রাইভিং প্রশিক্ষণ, হোটেলসংক্রান্ত ট্রেনিং, চুলকাটার ট্রেনিং, দর্জি, কলকারখানার কাজ, সেলসম্যানশিপ ইত্যাদি বিষয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকবে।

প্রত্যেকেই নিজ নিজ বিষয়ের ওপর প্রশিক্ষিত ও দক্ষ হবে। ওস্তাদের কাছ থেকে দেখে দেখে শেখে। এর মাধ্যমে দক্ষতা অর্জন সম্ভব নয়। আমরা আলপিন পর্যন্ত তৈরি করতে পারিনা, সেপটিপিন তৈরি করতে পারি না, স্ক্রু তৈরি করতে পারি না। অন্য দেশ থেকে আমদানি করতে হয়, এটা উন্নয়ন সহায়ক নয়।

আমাদের প্রয়োজন কারিগর, দক্ষ কারিগর। সবার নামধারী বিএ, এমএ পাস করার দরকার নেই। কারণ সব সার্টিফিকেটধারীকে চাকরি দেওয়ার সুযোগ আমাদের এই দেশে নেই এবং বিষয়ভিত্তিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত না হলে বিদেশেও চাকরির সুযোগ নেই বললেই চলে।

আর অধিকাংশ চাকরি উৎপাদনশীল খাত হিসেবে বিবেচিত নয়। আমাদের প্রয়োজন সবার আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকরণ। আর সেটা করতে হলে কারিগরি প্রশিক্ষণের কোনো বিকল্প নেই। দেশে যারা মোবাইল সার্ভিসিং করে, তাদের প্রায় শতভাগ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নয়।

ওস্তাদের কাজ দেখে দেখে তারা কাজ করা শুরু করে। অথচ তারা যদি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হতো, তবে দু-একবার নষ্ট হয়ে যাওয়া আমাদের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনগুলো ফেলে না দিয়ে সেগুলো মেরামত করতে পারলে ফলপ্রসূ হতো। আমাদের দেশে আধুনিক জ্ঞানসম্পন্ন কৃষক নেই। এখনো তাদের জমিতে বলদের ব্যবহার অপরিহার্য। জমিতে কখন, কতটুকু সার দিতে হবে, সেই জ্ঞান তাদের নেই। যারা চুল কাটে, তাদের প্রশিক্ষণের কোন ব্যবস্থা নেই। গ্যারেজের কাজে কোন প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান নেই। কারিগরি প্রতিটি কাজেই প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকতে হবে।

খসড়া জাতীয় যুবনীতিতে সুস্পষ্টভাবে দেশের কর্মসংস্থানের বিষয়টি বলা হয়েছে। ট্রেডভিত্তিক প্রশিক্ষণে প্রশিক্ষিতদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নিয়োগকারীদের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করা হবে। প্রশিক্ষিতদের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে শিক্ষানবিশ হিসেবে নিযুক্ত রেখে তাদের অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ করে দেওয়া হবে। যুবদের আত্মকর্মসংস্থান ও উদ্যোগের প্রতি ব্যাংকিংসহ প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা ও সুবিধা প্রদান করতে হবে।

কর্মসংস্থানের জন্য বিদেশে যাওয়ার আগে যুবকদের সেই দেশের আচার-আচারণ ও সংস্কৃতি সম্পর্কে ধারণা প্রদান করতে হবে। যুব উদ্যোক্তাদের জন্য স্বল্প সুদে ও সহজ শর্তে ঋণ প্রদানের ব্যবস্থা করতে হবে। যুব ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করে সব যুব নারী ও পুরুষকে এ ব্যাংকের আওতায় আনা হবে।

যুব উদ্যোক্তাদের উৎপাদিত পণ্য প্রদর্শন ও বিপণনের বিশেষ ব্যবস্থা করা হবে। এগুলো অত্যন্ত ইতিবাচক দিক। তবে এই যুবদের সুযোগগুলো দিতে গেলে আগে তাদের প্রশিক্ষিত করতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন কারিগরি প্রশিক্ষণ।

আমাদের দেশে এসএসসি পরীক্ষার পর শিক্ষার্থীদের একাংশ ডিপ্লোমার দিকে যাচ্ছে। একজন শিক্ষার্থী ডিপ্লোমায় পড়বে কি না, সেই বিবেচনা তাকে করতে হচ্ছে এসএসসি পরীক্ষার পর। আর যারা ডিপ্লোমা পাস করে তারা নিজেদের ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে তৈরি করে এবং তাদের পড়ার বিষয়গুলো অত্যন্ত সীমিত। তাদের দিয়ে তো আর রং মিস্ত্রির কাজ করানো যাবে না, গাড়ির ড্রাইভিং করানো যাবে না।

ডিপ্লোমায় সেলুনের কাজ, বুটিক শিল্প কিংবা পশুপালনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় না। হস্তশিল্পের কোন প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় না। তাই একজন শিক্ষার্থী কোন দিকে যাবে, এই সিদ্ধান্ত অষ্টম শ্রেণির পর হলে সবচেয়ে ইতিবাচক ফল পাওয়া যাবে। কারণ অষ্টম শ্রেণির পর জিপিএর ওপর ভিত্তি করে একদল শিক্ষার্থী যাবে কারিগরি প্রশিক্ষণে আর অন্য দল যাবে সাধারণ শিক্ষায়।

এরপর সেই সাধারণ শিক্ষার্থীর মধ্য থেকে এসএসসি পাস করার পর একদল ডিপ্লোমায় ভর্তি হবে এবং অন্য দল উচ্চ মাধ্যমিকে। আমাদের প্রয়োজন প্রতিটি প্রয়োজনীয় কাজের উপর প্রশিক্ষিত কর্মী। আমাদের কর্মীরা বিদেশে যাবার পর অধিকাংশই নিম্নমানের কাজ করে। এতে করে পরিশ্রমের পরিমাণ যেমন বেশি, আয়ের পরিমাণও কম। দেশে রেমিট্যান্সও কম আসে।

অথচ কর্মমুখী শিক্ষায় শিক্ষিত একজন যদি প্রবাসে যেয়ে কাজ করত, তবে ভালো মানের কাজ করতে পারতো। একই সাথে, আয়ও বেশি হত। অদক্ষ কোন ব্যক্তির প্রবাসে যাওয়ার দরকার নেই।

কারিগরি প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর বিদেশে যেতে হবে। এজন্য কর্মমুখী শিক্ষার উপর জোর দিতে হবে। বিদেশে যে বিষয়ের উপর দক্ষ কর্মী চাওয়া হয়, আমাদের তা থাকে না। অথচ আমরা যদি সঠিকভাবে দক্ষ কর্মী তৈরি করতে পারতাম, তবে বেকারত্বের হারও কমে যেত। রেমিট্যান্সের পরিমাণও বৃদ্ধি পেত।

কেন বেশির ভাগ মানুষ সবসময় গরীব থেকে যায়, এই বিষয়ে রবার্ট টি. কিউস্যাকির ‘ধনী পিতা গরীব পিতা’ বইটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রবার্টের মতে, ‘গরীব থাকার অন্যতম মূল কারণ হচ্ছে শিক্ষা ব্যবস্থা। কারণ আমরা প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে যে শিক্ষা গ্রহণ করে থাকি, ব্যবহারিক জীবনে শুধুমাত্র ১০ ভাগ শুধু কাজে লাগে, বাকি ৯০ ভাগ কোন কাজে আসে না।‘

আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা যেন ব্যবহারিক জীবনে কাজে লাগতে পারে, সেজন্য কারিগরি শিক্ষার প্রতি জোর দিতে হবে। কারণ এর মাধ্যমে অর্জিত সকল জ্ঞানই ব্যবহারিক ভাবে কাজে লাগবে। শুধু প্রশিক্ষিত জনশক্তি রপ্তানির মধ্যমেই বেকারত্বের হার শুন্যের কোঠায় নামানো সম্ভব। আর দেশে কর্মসংস্থানের সুযোগও বেড়ে যাবে। শুধু কারিগরি শিক্ষার মাধ্যমেই আমাদের এই দেশ বেকারত্বের অভিশাপ থেকে রেহাই পাবে।

লেখক : উপ-পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক।
[email protected]

এইচআর/এমএস

‘দেশে যারা মোবাইল সার্ভিসিং করে, তাদের প্রায় শতভাগ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নয়। ওস্তাদের কাজ দেখে দেখে তারা কাজ করা শুরু করে। অথচ তারা যদি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হতো, তবে দু-একবার নষ্ট হয়ে যাওয়া আমাদের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনগুলো ফেলে না দিয়ে সেগুলো মেরামত করতে পারলে ফলপ্রসূ হতো।’

আপনার মতামত লিখুন :