অরিত্রীর মৃত্যু: কীসের অশুভ ইঙ্গিত?

শান্তা মারিয়া
শান্তা মারিয়া শান্তা মারিয়া , কবি ও সাংবাদিক
প্রকাশিত: ০৪:০০ পিএম, ০৬ ডিসেম্বর ২০১৮

অরিত্রী অধিকারী নামের তরুণ সতেজ মেয়েটি আর নেই। আত্মহত্যা করেছে সে। তাকে আত্মহত্যায় বাধ্য করেছে যারা তারা এ সমাজে পরিচিত শিক্ষক হিসেবে। বাবা মায়ের পরই যাদের স্নেহ, মমতা, ভালোবাসা পাবার দাবি রাখে শিশু কিশোর তরুণরা তাদেরই কয়েকজনের নির্মমতা মেয়েটিকে ঠেলে দিয়েছে মৃত্যুর পথে।

বাংলাদেশের নামী স্কুল ভিকারুননেসা নূন স্কুল। এখানে ভর্তির জন্য বাবা মাকে রীতিমতো যুদ্ধ করতে হয়, তপস্যা করতে হয়। কেন? কারণ অভিভাবকরা মনে করেন কোনমতে যদি মেয়েকে এখানে ভর্তি করানো যায় তাহলে তার ভবিষ্যত সোনায় বাঁধানো হয়ে যাবে। সত্যিই কি তাই?

ভিকারুননেসা বা এ ধরনের নামীদামী স্কুলে ভর্তি হতে পারলেই কি হাতে হাতে স্বর্গলাভ হয়? যারা এরচেয়ে কম নামী স্কুলে পড়ালেখা করে তাদের দ্বারা কি জীবনে কোন সাফল্য পাওয়াই সম্ভব হয় না? আমার অভিজ্ঞতা অন্তত তা বলে না। ভিকারুননেসার অনেক ছাত্রী যেমন জীবনে কিছুই করতে পারেননি তেমন ভিকারুননেসায় না পড়েও অসংখ্য নারী জীবনে সফল হয়েছেন।

অথচ কি এক মোহের বশে প্রতিবছর অভিভাবকরা নিজের নিজের মেয়েকে এই স্কুলে ভর্তি করাতে হন্যে হয়ে যান। এই মোহই স্কুলটির শিক্ষকদের অহংকারী করে তুলেছে। তারা মানবিকতা ভুলে শিশুর উপর যথেচ্ছ নির্যাতনে প্রবৃত্ত হয়েছেন। একটু ফিরে তাকাই করুণ ঘটনাটির দিকে।

অরিত্রীর অপরাধ কি ছিল? শিক্ষকদের অভিযোগ মেয়েটি স্কুলের পরীক্ষার দিন সঙ্গে মোবাইল ফোন নিয়ে গিয়েছিল। এটি কত বড় অপরাধ? এটি কি এত বড় অপরাধ যে, এজন্য মেয়েটিকে টিসি দিতে হবে? তাকে ও তার বাবা মাকে ইচ্ছামতো অপমান করা চলবে? শিক্ষকরা বলছেন অরিত্রী মোবাইলে নকল নিয়ে গিয়েছিল। ধরলাম তাই। কিন্তু তাতেই কি তাকে টিসি দেওয়ার মতো শাস্তি দেওয়া চলে?

এই সব নামী স্কুলের শিক্ষকরা নিজেদের মনে করেন মিশরের ফারাও। শিক্ষার্থীদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার ক্ষমতা যদি তাদের হাতে থাকতো সম্ভবত তারা তাও দিতেন। কোমলমতি শিশুদের আত্মাকে ক্ষত-বিক্ষত করার দক্ষতা তাদের সীমাহীন। নকল করার অভিযোগে একটি মেয়ের ভবিষ্যত শিক্ষাজীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে তারা দ্বিধাহীন।

অথচ এরাই আবার নিজেরা প্রশ্ন ফাঁস, নকল সাপ্লাই, ক্লাসে না পড়িয়ে বাড়িতে কোচিং, কোচিং না করলে সেই মেয়েকে ফেল করিয়ে দেওয়ার মতো নানাবিধ কার্যকলাপে সিদ্ধহস্ত। অরিত্রীর মতো কোন ছাত্রীকে টিসি দিতে পারলেই তাদের লাভ। কারণ সেই জায়গায় আবার মোটা টাকা ডোনেশন নিয়ে আরেক বলির পাঁঠাকে ভর্তি করানো যাবে।

ভিকারুননেসার শিক্ষকদের দুর্ব্যবহারের বিরুদ্ধে অভিযোগ এই প্রথম নয়। এর আগেও স্কুলটির শিক্ষকদের দুর্ব্যবহার, ও নানা রকম দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। অরিত্রীর মৃত্যু সেইসব দুর্নীতির দিকে আবারও সমাজের চোখটা ফিরিয়ে দিযেছে। শুধু তাই নয়। বলার মতো রয়েছে আরও অনেক কথা। ধরলাম অরিত্রীকে যদি টিসি দেওয়া হতো সে হয়তো পরের বছর অন্য কোন কম নামী স্কুলে ভর্তি হতো। হয়তো এসএসসিতে জিপি এ ফাইভ পেত না। তাহলেই কি এমন সর্বনাশ হতো? জীবন কি থেমে যেত?

মানবজীবনের দীর্ঘযাত্রায় জিপিএ ফাইভ পাওয়া বা না পাওয়া খুবই তুচ্ছ বিষয়। কিন্তু আমাদের দেশে শিক্ষা ব্যবস্থা হয়ে পড়েছে জিপিএ ফাইভ নির্ভর। ফলে ছেলে মেয়েরা ভাবছে এবং তাদের ভাবতে বাধ্য করা হচ্ছে যে যদি তুমি জিপিএ ফাইভ না পাও তাহলে তোমার জীবন থেমে যাবে, তোমার সর্বনাশ হবে এবং এর চেয়ে বরং তোমার মৃত্যুও ভালো।

এইসব ভ্রান্ত ধারণা ও তার সঙ্গে শিক্ষকদের অমানবিক ব্যবহার অরিত্রীর মতো শিশুদের প্ররোচিত করে আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে। প্রতিবছর এসএসসি এবং এইচএসসি পরীক্ষার ফল বের হওয়ার পর গোল্ডেন জিপিএফাইভদের খবরের পাশাপাশি ব্যর্থদের আত্মহত্যার খবরও কিন্তু পাওয়া যায়।

বলতে বাধা নেই এই ছেলেমেয়েদের হন্তারক হলো সেই শিক্ষা ব্যবস্থা যা জিপিএ ফাইভকে জীবনের মোক্ষ বলে নির্ধারণ করেছে। এবং সেই মোক্ষ পাইয়ে দেবার প্রতিষ্ঠান হিসেবে কতিপয় স্কুল কলেজকে আগ্রাসী করে তুলেছে। এইসব স্কুল কলেজের শিক্ষকরা অহংকারে চোখ বন্ধ করে নিজেদের ভাবছেন ছেলেমেয়েদের ভাগ্যবিধাতা।

শিক্ষা এখন পুরোপুরি বাণিজ্যে পরিণত হয়েছে। ডাক্তারি ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে হলে জিপিএ ফাইভ পেতে হবে। আর জিপিএ ফাইভ পেতে হলে নামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়তে হবে এবং এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের ব্যক্তিগত কোচিংয়ে ভর্তি হতে হবে হাজার হাজার টাকা ব্যয় করে। পান থেকে চুন খসলেই তারা শিক্ষার্থীদের টিসি দেবেন অথবা শারীরিক মানসিক নির্যাতন করবেন এবং তাদের ক্ষমা পাওয়ার জন্য বাবা-মাসহ তাদের পায়ে ধরে ক্ষমা চাইতে হবে। এ কেমন বর্বরতা? এ কেমন অশুভ বাণিজ্য?

অরিত্রীর মৃত্যুতে ক্ষুব্ধ সহপাঠিরা আন্দোলন করছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ও নড়ে চড়ে বসেছে। কিন্তু দুদিন পরেই আন্দোলন স্তিমিত হয়ে গেলে আবার যে কে সেই হতে দেরি হবে না। লাখো অরিত্রীকে বাঁচাতে প্রয়োজন সমস্যার মূলে কুঠরাঘাত। আর আত্মহত্যা থেকে ছেলেমেয়েদের বাঁচাতে হলে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে কাউন্সিলিংয়ের ব্যবস্থা থাকার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে আগেও অনেকবারই বলা হয়েছে।

দেশের প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজন কাউন্সিলিং। যাতে শিশু কিশোর তরুণ বয়সীরা যথাযথ কাউন্সিলিং গ্রহণ করে মানসিক আঘাত থেকে আত্মরক্ষা করতে পারে। যেন অরিত্রীর মতো অকালে পৃথিবী ছেড়ে বিদায় নিতে না হয় তাদের। অরিত্রীর বাবামায়ের প্রতি শোক জানাবার ভাষা নেই। তার আত্মহত্যার জন্য প্ররোচনা দানকারী শিক্ষকত্রয়ের কঠোর শাস্তি দাবি করি। যাতে টনক নড়ে অন্যান্য অবিবেচক ও অমানবিক আচরণকারীদেরও।

লেখক : কবি, সাংবাদিক। বর্তমানে চীনের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন।

এইচআর/আরআইপি

‘মানবজীবনের দীর্ঘযাত্রায় জিপিএ ফাইভ পাওয়া বা না পাওয়া খুবই তুচ্ছ বিষয়। কিন্তু আমাদের দেশে শিক্ষা ব্যবস্থা হয়ে পড়েছে জিপিএ ফাইভ নির্ভর। ফলে ছেলে মেয়েরা ভাবছে এবং তাদের ভাবতে বাধ্য করা হচ্ছে যে যদি তুমি জিপিএ ফাইভ না পাও তাহলে তোমার জীবন থেমে যাবে, তোমার সর্বনাশ হবে এবং এর চেয়ে বরং তোমার মৃত্যুও ভালো।’

আপনার মতামত লিখুন :