মুক্তচিন্তার মানুষদের এগিয়ে আসতে হবে

শান্তনু চৌধুরী
শান্তনু চৌধুরী শান্তনু চৌধুরী
প্রকাশিত: ১০:০১ এএম, ২৩ এপ্রিল ২০১৯

পহেলা বৈশাখের দিনে বেশ সেজেগুজেই অফিসের উদ্দেশ্যে বের হয়েছি। ফুরফুরে মেজাজ। নানা বয়সীরা নিজেকে রাঙিয়ে পথ চলছেন। তরুণ তরুণীদেও পথ চলার মনমুগ্ধকর দৃশ্য। তরুণীরা খোঁপায় মালা পরেছে।

রমনা বটমূলে ছায়ানট অনাচারের বিরুদ্ধে শুভবোধ জাগ্রত হওয়ার যে ডাক দিয়েছে ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথে তারই আহ্বানে সাড়া দিতে যেন চলেছে সবাই। কিন্তু রাজধানীর মিরপুর ১০ থেকে লোকাল বাসে উঠার পরই মনটা খারাপ হয়ে গেলো। কয়েকজন মেয়ে উঠেছে তাই দেখে বাসে থাকা লোকজন পহেলা বৈশাখকে জড়িয়ে বাজে মন্তব্য করলো। রাগী চোখে তাকালাম তাদের দিকে। না, কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। তারা নানা কথা বলেই যাচ্ছে।

পাশের জনকে বোঝালাম। দেখলাম তিনিও ওই বখাটেগুলোর প্রতি বিরক্ত। কিছুদূর যেতেই আরো দু’জন মেয়ে উঠলেন শাড়ি পরে, মাথায় ফুল। আবারো বখাটেদের উৎপাত। এবার আর সহ্য করা গেলো না। আমার পাশের জনও প্রতিবাদ করলেন। বাসের আরো অনেকে প্রতিবাদ করছেন। পরে ছেলেগুলোতে বাস থেকে নামিয়ে দেয়া হলো।

ব্যক্তিগত ঘটনাটি এ কারণে শেয়ার করলাম, প্রতিবাদ, প্রতিরোধ নেই বলেই আজ গোঁড়ামি, মন গড়া সামাজিক ব্যাখ্যা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। আবার এটাও ঠিক আমরা ক’জনই বা প্রতিবাদ করতে পারি। স্থান, কাল, পাত্রভেদে চুপ করেই থাকি হয়তো। বাংলার আবহমান সংস্কৃতি নিয়ে বিদ্বেষ যেন দিন দিন বাড়ছে। তার সঙ্গে জুড়ে দেয়া হচ্ছে ধর্মীয় অনুষঙ্গ। একই দিন এক অনুষ্ঠানের একজনতো বলেই ফেললেন, ‘আমিতো হিন্দু নই, পহেলা বৈশাখে কেনো পাঞ্জাবি পরবো!’

আমি যে এলাকায় বড় হয়েছি সে এলাকায় চৈত্র সংক্রান্তিতে বড় মেলা হয়। আমরা বলি চড়ক মেলা বা ক্ষেত্রপাল মেলা। সেখানে পূজা বিষয়টা ধর্মীয় হলেও পার্বণ যেন সবকিছুকে ছাড়িয়ে যেতো। এর ওর বাড়ি গিয়ে নাড়–, মোয়া মুড়ি, মুড়কি খাওয়া দাওয়া চলতো ধুমছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষগুলো বদলে যাচ্ছে দেখি। দিন বদলের মেলাতে, মন বদলের খেলা খেলে মানুষগুলো।

দিনে দিনে মানসিকতা বদলে যেতে দেখি, দিনে দিনে কাপড় চোপড় পরা বদলে যেতে দেখি। এর কারণ, ধর্মীয় উগ্রতা, ধর্মান্ধতা, মৌলবাদ এসব বেড়েছে। কিন্তু বাড়েনি প্রকৃত ধার্মিকের সংখ্যা। বাড়েনি যা মানুষকে ধারণ করে, মানুষের কল্যাণ করে তেমন ধার্মিকের সংখ্যা।

এমনিতে গেলো এক দশকে নিরাপত্তার অজুহাতে আমাদের সংস্কৃতির বিভিন্ন অনুষ্ঠানকে একটা গণ্ডির মধ্যে, নির্দিষ্ট সময় সীমার মধ্যে বেঁধে ফেলা হয়েছে। রাষ্ট্র নিয়ম করে দিচ্ছে ঠিক কোন অনুষ্ঠান কতোটা সময় পর্যন্ত করতে পারবেন। তার মানে ঠিক কতোটা আনন্দ করা যাবে, কতোটা যাবে না সেটাও ঠিক করে দিচ্ছে রাষ্ট্রযন্ত্র। চারপাশে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য বেষ্টিত হয়ে থাকলে কি আর আনন্দ জমে। কখনই না। আমাদের রাষ্ট্রপতি মাঝে মাঝে রঙ্গ রসিকতা করে সেকথা বলেই ফেলেন। তিনি স্বাধীন মনে ঘুরতে পারেন না নিরাপত্তার কারণে। তার মানে মুক্ত আনন্দের জন্য চাই মুক্ত পরিবেশ।

দেশে এখন জঙ্গি উৎপাত নেই, সে কারণে সরকার সাধুবাদ পেতেই পারেন। কিন্তু উগ্রবাদ, মৌলবাদ কি কমেছে না বেড়েছে? ভেতরে ভেতরে মনে হয় বাড়ছে। বিশেষ করে হেফাজত প্রকাশ্যে আসার পর। প্রতিবছর হেফাজতের আমির আহমদ শফী বলেই যাচ্ছেন পহেলা বৈশাখের বিরুদ্ধে। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি।

১২ এপ্রিল এক বিবৃতিতে তিনি বলেছেন, ‘পহেলা বৈশাখ উদযাপনের অন্যতম অনুষঙ্গ হিসেবে মঙ্গল শোভাযাত্রার যে আয়োজন করা হয় তা ইসলামী শরিয়ত সমর্থন করে না। কোন ঈমানদার মুসলমান মঙ্গল শোভাযাত্রায় অংশগ্রহণ করতে পারে না।’ আরো অনেককিছু তিনি বলেছেন। কিন্তু স্বাধীন দেশে একটি রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানের বিরুদ্ধে তিনি কীভাবে এসব কথা বলেন তা বোঝা মুশকিল।

আরেকটা আছে, ওলামা লীগ। এদের কর্মকাণ্ডে সরকার মাঝে মাঝে এতোটাই বিব্রত হয়ে পড়ে শেষ পর্যন্ত বলতে বাধ্য হয় এটি আওয়ামী লীগের কোনো অঙ্গ বা সহযোগী সংগঠন নয়। ২০১৬ সালে ঢাকায় এক মানববন্ধন ও সমাবেশে তারা বলেছিল,‘পহেলা বৈশাখে উৎসব উদযাপন ইসলাম বিরোধী।’ সংগঠনের নেতারা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছিলেন, ‘পহেলা বৈশাখের নামে দেশে কোন বেহায়াপনা সহ্য করা হবে না।’ এর মধ্যে এবারে এক কাঠি সরেস হয়ে আলোচনায় এসেছে সিলেট মহানগর পুলিশ।

বাংলা নববর্ষে স্বামী-স্ত্রী ছাড়া মোটরবাইকে একসঙ্গে আরোহী হওয়ার নিষেধাজ্ঞা দিয়ে বসে তারা। পরে অবশ্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচনা শুরু হলে তারা নানা ব্যাখ্যা দেন। এছাড়া ব্রাহ্মণবাড়িয়ার একদল মৌলবাদীতো তৈরিই ছিল সেখানকার মঙ্গল শোভাযাত্রা বন্ধ করতে। শেষ পর্যন্ত প্রশাসন তাদের বোঝাতে বাধ্য হয়েছে যে, এটি রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান।

গেলো এক দশকে এমন নানা ঘটনা ঘটেছে। লালন ফকিরের অনুসারীদের মাথার চুল কেটে দেয়া, শহীদ মিনার অবমাননাসহ ফতোয়ারতো অন্ত নেই। আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম খুললেতো বোঝাই যায়, উগ্রবাদী, গোঁড়া মানুষের সংখ্যা কী হারে বাড়ছে। তবে পরিচিত ক্ষমতাসীন দলের এক নেতা একথা মানতে নারাজ।

চট্টগ্রামের এই নেতার মত হলো, আবহমান বাঙালির সংস্কৃতি ধারণ করে চলা অনুষ্ঠানের ব্যাপ্তি ও পরিধি বেড়েছে। তিনি উদাহরণ দেন, আগে চট্টগ্রামে শুধুমাত্র ডিসি হিলে হতো বর্ষবরণ অনুষ্ঠান। আর এখন সেটা ছড়িয়ে গেছে, চারুকলা, শিরীষ তলা, পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ নানা জায়গায়।

তাহলে তার মতে, মানুষের মাঝে ধর্মান্ধ বা মৌলবাদীরা যতোই ওয়াজ মাহফিল বা বক্তৃতা বিবৃতি দিয়ে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি সৃষ্টির চেষ্টা করুক না কেনো মানুষ কিন্তু এখন আর আগের মতো বোকা নেই। ক্ষমতাসীন দলের আমার এই বন্ধুটির বক্তব্য হয়তো আংশিক সত্য। কিন্তু এরপরও বলতে হয়, সামনে দিনগুলোতে গোঁড়ামি রুখে দেয়াই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

নিজ এলাকায় দেখেছি ‘গীতার আসর’ থেকে শুরু করে নানা ‘বাবা’, ‘মা’ এর নামে গজিয়ে উঠেছে প্রতিষ্ঠান। অথচ এই লোকগুলোকেই দেখা যায় মদের আসরে, ঘুষখোর হতে বা গোপনে নারীর বস্ত্রহরণে। ভারতে গিয়েছি রাস্তাঘাট বন্ধ করে মৌলবাদের আস্ফালন। নেপালে গিয়েছি পথে পথে পাথরে পাথরে শিব-দুর্গা।

এই যে মৌলবাদের জয়জয়কার সেটা শুধু আমাদের দেশে নয়, সারা বিশ্বে। এবং এটি মোকাবিলায় যে বড় চ্যালেঞ্জ সেটি বলছেন ব্রিটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার। পত্রিকায় প্রকাশিত এক নিবন্ধে তিনি রিখেছেন, ‘আজকের যুগে রাষ্ট্রগুলোর প্রধান সমস্যা হচ্ছে ধর্মীয় জঙ্গিবাদ ও গোঁড়া সন্ত্রাসীদের চিহ্নিত করা। এটা এক ধরনের ভয়াবহ ফেনোমেনা। কেননা এসব কর্মকাণ্ড সহজে অনলাইন, বয়স এবং সর্বক্ষেত্রে সহজেই ছড়িয়ে পড়ে।

বিগত দশকে বা বিশের দশকে যেমন করে এটা সম্ভব ছিলো সহজে আইডেন্টিফাই করে এই রিলিজিয়াস বা সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ও উগ্রতা রুখে দেয়া সহজ ছিলো রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে, একুশ শতকে সেটা আসলেই বড় এক চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছে।’ এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার দায়িত্ব নিতে হবে রাষ্ট্রকেই। যারা তৈরি করবে একটি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ।

যে বাংলাদেশের কথা সংবিধান বলে। সব ধর্মের সমান অধিকার নিশ্চিত হয়। ধর্মভিত্তিক বা সামাজিক বিভাজনের অশুভ রাহুগ্রাস থেকে জাতিকে মুক্ত রাখতে হবে। সাম্প্রদায়িক, ধর্মীয় বা আদর্শিক জঙ্গিবাদ, অসহনশীলতা ও গোঁড়ামি ত্যাগ করতে পারলেই রাষ্ট্র এগিয়ে যাবে সমৃদ্ধির পথে। যার স্বপ্ন বঙ্গবন্ধু দেখতেন বর্তমান সরকার প্রধান বাস্তবে রূপ দিতে চেষ্টা করছেন।

সেক্ষেত্রে নাগরিক হিসেবেও আমাদের কর্তব্য রয়েছে। উদ্দেশ্যমূলকভাবে কোনো ধর্মকে অবমাননা করা মুক্তচিন্তা বা বাক স্বাধীনতা বলে আমি মনে করি না। সমস্ত অজ্ঞতা ধর্মীয় গোঁড়ামি কুসংস্কার-পশ্চাৎপদ ধ্যান-ধারণা থেকে মুক্ত থাকার নামই মুক্তচিন্তা। সেটি করতেই পারলেই কাঠমোল্লা, ভণ্ডসাধুরা পার পাবে না ধর্মের দোহাই দিয়ে। তাহলেই সমাজের সবাই মাথা তুলতে পারবে অনন্ত আকাশে।
ধর্মীয় মৌলবাদ রোধের নীতি পড়ে থাকবে না বইয়ের মলাট আর সেমিনারে। বাস্তবে হবে প্রয়োগ। এই মুক্তচিন্তার মানুষরাই রোধ করবে অনাচার, জাগ্রত হবে শুভবোধ।

লেখক : সাংবাদিক ও সাহিত্যিক।

এইচআর/এমকেএইচ

ধর্মভিত্তিক বা সামাজিক বিভাজনের অশুভ রাহুগ্রাস থেকে জাতিকে মুক্ত রাখতে হবে। সাম্প্রদায়িক, ধর্মীয় বা আদর্শিক জঙ্গিবাদ, অসহনশীলতা ও গোঁড়ামি ত্যাগ করতে পারলেই রাষ্ট্র এগিয়ে যাবে সমৃদ্ধির পথে। যার স্বপ্ন বঙ্গবন্ধু দেখতেন বর্তমান সরকার প্রধান বাস্তবে রূপ দিতে চেষ্টা করছেন।

আপনার মতামত লিখুন :