‘শ্রাবণের ধারার মতো পড়ুক ঝরে’

ড. আহমেদ আমিনুল ইসলাম
ড. আহমেদ আমিনুল ইসলাম ড. আহমেদ আমিনুল ইসলাম , অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
প্রকাশিত: ১২:২১ পিএম, ১৭ আগস্ট ২০১৯

আগস্ট শোকের মাস। এ মাসে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। যিনি বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির স্বপ্নদ্রষ্টা ও স্থপতি তাঁকেই এ মাসের পনেরো তারিখে পরিবারের নিহত হতে হয়েছে। বিশ্বের ইতিহাসে এমন পৈশাচিক ও জঘন্য হত্যাকাণ্ডের নজির নেই। কোন রাষ্ট্রের স্বপ্নদ্রষ্টা এমন নির্মম ও নৃশংসভাবে নিহত হয়েছেন পরিবারের সকল সদস্য নিয়ে এরূপ তথ্য আমাদের জানা নেই। তাই আগস্ট অন্তহীন বেদনা ও শোকের মাস।

এ মাসের শোক কোনভাবেই শেষ হওয়ার নয়। অনিঃশেষ শোক ও দুঃখভারাক্রান্ত হৃদয় নিয়ে আমরা আগস্ট জুড়ে শোক করি পনেরো আগস্টে শোক করি। শোক করি কেবল বঙ্গবন্ধু তাঁর পরিবারের আঠারো জন সদস্যসহ ঘাতকের হাতে নিহত হয়েছিলেন বলে নয়। শোক করি বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে বাঙালির হাজার বছরের ‘সোনার বাংলা’র স্বপ্নেরও মৃত্যু ঘটেছিল বলে।

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম আর রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশ প্রমুখের কাব্যের সোনার বাংলা, বাঙালির বাংলা ও রূপসী বাংলাকে ইতিহাসের অমর ও অবিসংবাদিত রাজনীতিক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাস্তবের সোনার বাংলা রূপে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। সেই স্বপ্ন পূরণের অভিলাষে দেশবাসীকে নিয়ে যাত্রারাম্ভ করেছিলেন। কিন্তু ক্ষমতার লোভে মত্ত ঘাতকেরা বঙ্গবন্ধু মুজিবকে নৃশংসভাবে হত্যার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের স্বপ্ন-অভিযাত্রার পথ রুদ্ধ করে পুনরায় এদেশে পাকিস্তান-পন্থা প্রতিষ্ঠায় তৎপর হয়ে ওঠে।

হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দির রাজনৈতিক সংস্পর্শ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের চিত্তকে শৈশবে থেকেই করেছিল বাঙালি ও বাংলাদেশের প্রতি মমত্ববোধে অধীর। দারিদ্রপীড়িত বাঙালি আর দুঃখিনী বাংলা মায়ের অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে তাই তাঁর সংগ্রাম ছিল অন্তহীন। দার্শনিকভাবে ওপরে উল্লিখিত তিনজন প্রসিদ্ধ বাঙালি কবির সামগ্রিক ভাবাদর্শকেই বঙ্গবন্ধু তাঁর রাজনৈতিক চেতনার মর্মমূলে স্থাপন করেছিলেন। কবি নির্মলেন্দু গুণ তাই বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে ‘পুনশ্চ মুজিবকথা’ কবিতায় লেখেন :
‘তিনি বাংলার মুখের দিকে তাকিয়েছিলেন জীবনানন্দবৎ,
তিনি বাংলার মুখের দিকে তাকিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথবৎ,
তিনি এই ভূখণ্ডবাসীর দিকে তাকিয়েছিলেন নজরুলবৎ।
তাই তাঁর চোখে ধরা পড়েছিল রূপসী বাংলার স্নিগ্ধ মুখশ্রী,
তাই তাঁর চোখে ধরা পড়েছিল- আমার সোনার বাংলা’,
তাই তাঁর চোখে ধরা পড়েছিল মুক্তি-স্বপ্ন, প্রিয় স্বাধীনতা।’

রবীন্দ্রনাথ, নজরুল ও জীবনানন্দের ভাবাদর্শগত মনন নিয়ে বঙ্গবন্ধু নিজেকে একজন খাঁটি বাঙালি হিসেবে তৈরি করেছিলেন। তাই তিনি এই ভূখণ্ডবাসীকে বাঙালিত্বের অহংকার নিয়ে জেগে ওঠার স্পর্ধিত আহ্বান জানিয়েছিলেন। বাঙালিকে জেগে ওঠবার স্বপ্নে সঞ্চার করেছিলেন অমিত প্রেরণা। সমগ্র জীবনের রাজনৈতিক সাধনার ফলে তিনিও অর্জন করেছিলেন বাঙালির ভালোবাসা, অর্জন করেছিলেন বাঙালির অকুণ্ঠ সমর্থন আর সবিশেষ অর্জন করেছিলেন বাঙালির ভরসা। একজন নেতা তখনই সার্থক হয়ে উঠেন যখন জনগণ তাঁকে বিশ্বাস ও ভরসা করে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব এদেশবাসীর ভালোবাসার পাশাপাশি অর্জন করেছিলেন অপরিসীম বিশ্বাস।

আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন, সাধারণ মানুষের এই ভালোবাসা, বিশ্বাস ও ভরসা বঙ্গবন্ধু হঠাৎ করে কোন একটি বিশেষ ঘোষণার মধ্য দিয়ে অর্জন করেননি। অর্জন করেছিলেন দীর্ঘ দিনের বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রাম এবং বাঙালির স্বার্থ সংশ্লিষ্ট নানা কর্মকাণ্ডের সফল পরিণতি দানের মাধ্যমে। আবহমান কালের বাংলাদেশের গভীর মননের সাথে ও বঙ্গবন্ধু কার্যত একপ্রাণে যেন মিশে গিয়েছিলেন। তিনি হয়ে উঠেছিলেন বাংলাদেশেরই সমার্থক এক নাম। বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রই পাকিস্তানিদের বিপক্ষে সশস্ত্র সংগ্রামের প্রেরণা হয়ে দাঁড়ায়। তাই পাকিস্তানের কারাগারে অন্তরীণ থাকা সত্ত্বেও তিনিই হয়ে উঠেন মুক্তি বাহিনীর অন্যতম নেতা।

বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বেই নয় মাস সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে বাংলাদেশ অর্জন করে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব। যদিও আমরা জানি ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর দেওয়া ভাষণের পর থেকেই পাকিস্তানি শাসকদের বিরুদ্ধে এক ধরনের যুদ্ধ শুরু হয়ে গিয়েছিল। অথচ স্বাধীনতালাভের মাত্র চার বছরের মাথায় নিজ দেশের নিজের হাতে গড়া সেনাবাহিনীর কিছু উচ্চাভিলাষী কর্মকর্তার হাতে প্রাণ দিতে হয় পরিবারের আঠারো জন সদস্যসহ। বিদেশে অবস্থানের কারণে প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুকন্যাদ্বয় শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা।

বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব ছিল বিশ্বের বিস্ময়! তাঁর জাদুকরি বক্তৃতা মানুষকে মুহূর্তেই করতো মন্ত্রমুগ্ধ! তাঁর নেতৃত্বশৈলী সমকালীন বিশ্বের অনেকের নিকটই ছিল ঈর্ষণীয়। নিজ-নেতৃত্বগুণেই তিনি বৈশ্বিক নেতা হয়ে উঠেছিলেন। এমনও নজির আছে যে, বঙ্গবন্ধুর নামেই বিশ্বের অনেকে বাংলাদেশকে চিনেছেন। বাংলাদেশ সম্পর্কে নানা বিষয়ে আগ্রহী হয়েছেন। তাঁর সাহস, মনোবলের দৃঢ়তা ও নেতৃত্বগুণদৃষ্টে ফিদেল ক্যাস্ট্রো বলেছিলেন, ‘আমি হিমালয় দেখিনি, কিন্তু শেখ মুজিবকে দেখেছি। ব্যক্তিত্ব ও সাহসিকতায় তিনিই হিমালয়।’ আবার বঙ্গবন্ধু হত্যার সংবাদে মর্মাহত ফিদেল ক্যাস্ট্রো বলেছিলেন, শেখ মুজিবের মৃত্যুতে বিশ্বের শোষিত মানুষ হারালো তাদের একজন মহান নেতাকে, আর আমি হারালাম এক অকৃত্রিম বিশাল হৃদয়ের বন্ধুকে।’

এদেশেরই একদল ক্ষমতালোভী চক্রের কাছে বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা ও স্থপতির এমন করুণ পরিণতি দেখে বাঙালিদের সম্পর্কে বিশ্ববাসী হতাশ ও নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে। এর মধ্যে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার দিনই ১৯৭৫ সালের পনেরো আগস্ট বিবিসি মন্তব্য করে, ‘শেখ মুজিব নিহত হলেন তাঁর নিজেরই সেনাবাহিনীর হাতে অথচ তাঁকে হত্যা করতে পাকিস্তানিরা পর্যন্ত সংকোচ বোধ করেছে।’ আর ফিনান্সিয়াল টাইমস লিখেছিল, ‘মুজিব না থাকলে বাংলাদেশ কখনোই জন্ম নিতে পারতো না।’ মার্কিন কূটনীতিক হেনরি কিসিঞ্জার বলেছিলেন, ‘আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের মতো তেজী এবং গতিশীল নেতা আগামী বিশ বছরের মধ্যে এশিয়া মহাদেশে আর পাওয়া যাবে না।’ কী আশ্চর্য! হেনরি কিসিঞ্জার বাংলাদেশ সম্পর্কে সর্বদা নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করলেও বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বকে তিনি কোন দৃষ্টিতে দেখেছেন তা তাঁর বক্তব্য থেকেই উপলব্ধি করা যায়। ২০ বছর তো বটেই, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে হত্যার পর ইতোমধ্যে ৪৪ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পরও কেবল মাত্র এশিয়া মহাদেশ শুধু নয়- তামাম বিশ্বও তাঁর মতো নেতা এখনো জন্ম দিতে পারেনি।

জাম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট কেনেথ কাউন্ডা বঙ্গবন্ধুকে স্মরণ করতে গিয়ে বলেছিলেন, ‘শেখ মুজিব দৈহিকভাবেই মহাকায় ছিলেন, সাধারণ বাঙালির থেকে অনেক উঁচুতে ছিল তাঁর মাথাটি- সহজেই চোখে পড়তো তাঁর উচ্চতা। একাত্তরে বাংলাদেশকে তিনিই আলোড়িত-বিস্ফোরিত করে চলেছিলেন, আর তাঁর পাশে ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর হয়ে যাচ্ছিল তাঁর সমকালীন এবং প্রাক্তন সকল বঙ্গীয় রাজনীতিবিদ।’ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রাজনৈতিক ক্ষেত্রেই শুধু নয়- ব্যক্তিগত সম্পর্কেও যাঁকে বোনের মতো শ্রদ্ধা করতেন তিনি শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী। পনেরো আগস্টের মর্মান্তিক সংবাদ শোনার পর তিনি বলেছিলেন, ‘শেখ মুজিব নিহত হবার খবরে আমি মর্মাহত।

তিনি একজন মহান নেতা ছিলেন। তাঁর অনন্যসাধারণ সাহসিকতা এশিয়া ও আফ্রিকার জনগণের জন্য ছিল অপরিসীম প্রেরণাদায়ক। এদিকে হুমায়ুন আজাদ বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের মূল্যায়ন করেছিলেন এইভাবে : ‘জনগণকে ভুল পথেও নিয়ে যাওয়া যায়; হিটলার মুসোলিনির মতো একনায়কেরা জনগণকে দাবানলে, প্লাবনে, অগ্নিগিরিতে পরিণত করেছিল- যার পরিণতি হয়েছিল ভয়াবহ। তারা জনগণকে উন্মাদ আর মগজহীন প্রাণিতে পরিণত করেছিল। একাত্তরে শেখ মুজিব সৃষ্টি করেছিল দাবানল, শুভপ্লাবন, শুভ আগ্নেয়গিরি, নতুনভাবে সৃষ্টি করেছিলেন বাঙালি মুসলমানকে, যার ফলে আমরা স্বাধীন হয়েছিলাম।’

১৯৭৫ সালের পনেরো আগস্টে এরূপ একজন নেতাকে হত্যা করা হয়েছে। তাই আগস্ট শোকের মাস- নিরন্তর শোকের মাস। বছরের পর বছর আসবে আমাদের জীবনে, ক্যালেন্ডারের পাতায় ফিরে ফিরে আসবে আগস্ট। কিন্তু এইভাবে কালক্রমে সহস্রবর্ষ পেরিয়ে গেলেও বাংলাদেশে কোন দিন শোকহীন আগস্ট আসবে না। বঙ্গবন্ধুর জন্য বাঙালির অন্তর বিদারিয়া অশ্রু শ্রাবণের ধারার মতোই ঝরবে অনন্তকাল। আর সামগ্রিকভাবে বঙ্গবন্ধু বাঙালি-হৃদয়ে যে-একটি সুর সৃষ্টি করে গেছেন তাকে শ্রদ্ধার সাথে বরণ করে নেবো আমরা রবীন্দ্রাথের এই গানের সুরে :
শ্রাবণের ধারার মতো পড়ুক ঝরে, পড়ুক ঝরে,
তোমারই সুরটি আমার মুখের ‘পরে, বুকের ‘পরে।

লেখক : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

এইচআর/জেআইএম

বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব ছিল বিশ্বের বিস্ময়! তাঁর জাদুকরি বক্তৃতা মানুষকে মুহূর্তেই করতো মন্ত্রমুগ্ধ! তাঁর নেতৃত্বশৈলী সমকালীন বিশ্বের অনেকের নিকটই ছিল ঈর্ষণীয়। নিজ-নেতৃত্বগুণেই তিনি বৈশ্বিক নেতা হয়ে উঠেছিলেন। এমনও নজির আছে যে, বঙ্গবন্ধুর নামেই বিশ্বের অনেকে বাংলাদেশকে চিনেছেন। বাংলাদেশ সম্পর্কে নানা বিষয়ে আগ্রহী হয়েছেন।