ক্রিকেট সাফল্যে মাথায় তুলে আছাড়: হাতে ধরে মাথা নষ্ট

মোস্তফা কামাল
মোস্তফা কামাল মোস্তফা কামাল , সাংবাদিক
প্রকাশিত: ১০:০৫ এএম, ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২০

ক্রিকেট এখন আবেগী বাঙালির বড় আবেগের জায়গায়। খালি পেটেও ক্রিকেটকে ঘিরে কতো জল্পনা কল্পনা। আবার সবাইকে মাতিয়ে রেখে ভরা পেট আরো ভরাটের কাণ্ডকীর্তিও কম নয়। ভয়টা এখানেই। প্রাকটিসিং, ট্রেইনিং বা নার্সিং না দিয়ে ক্রিকেট তারকাদের সর্বনাশের আয়োজনটা মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে কি-না, প্রশ্নটি ঘুরপাক খাচ্ছে বিভিন্ন মহলে।

কখনো কখনো তারকা হওয়ার সিঁড়িতেই ধপাস করে নিভিয়ে ফেলার ক্রিয়াকর্মও কম নয়। এবার তো আর রাখঢাক নেই। ক্যাশকেপিটালসহ প্লট দেয়ার গলা ফাটানো দাবি সংসদেই। যুব বিশ্বকাপ ক্রিকেট জয়ী খেলোয়াড়দের প্লট ও নগদ টাকা দেবার দাবিতে ফার্স্ট হয়েছেন গনফোরামের সুলতান মোহাম্মদ মনসুর ও জাতীয় পার্টির মজিবুল হক চুন্নু।

সেখানে যুবারা বিশ্বমঞ্চে সাতবারের ফাইনালিস্টদের বোকা বানিয়ে ছাড়ল। আকবর আলীদের এই বাজিমাত বিশ্বকে অবাক করে দিয়েছে। এই বয়সে তার পরিপক্বতার ছাপ ক্রিকেট বিশ্বকে অবাক করেছে। তাদের উছিলায় ৬৮০ কোটি জনসংখ্যার সাথে পরিচিতি পেয়েছে ১৬ কোটি বাঙালি। উচ্ছ্বাস-আনন্দটা তাই বেশি হওয়াই স্বাভাবিক। তাই বলে হাতে ধরে তাদের মাথা নষ্ট করার নিয়মিত চর্চা কাম্য নয়। বিষয়টিকে স্বাভাবিকভাবে না দেখে যেন উপায়ও নেই। এই মাননীয়দের ভাবনার জগতের দৌড় এমনই। মন-মগজের বেশিরভাগ জায়গা দখল করে আছে প্লট- ফ্ল্যাট আর শুল্কমুক্ত গাড়ি। হরহামেশা তাদের মাথায় ভন ভন করে এসবই। সেই বীজ তারা পুততেছেন ক্রিকেটসহ অন্যান্য সেক্টরেও। লোভী করে ছাড়ছেন যতো সম্ভাবনাময়কে। অতি লোভে তাঁতি নষ্ট করতে পারঙ্গমরা বেশ সাফল্যের সঙ্গে এগিয়েও যাচ্ছেন।

ভারতকে হারিয়ে যুব ক্রিকেট জয়ে বাংলাদেশ এখন আনন্দে মত্ত। ক্রিকেট বিশ্বকে শাসন করা ভারতের ক্রিকেটারদের চোখে চোখ রেখে এমন লড়াইয়ের সাহসের বদলে লেজ গুটানোর দৃষ্টান্ত সিনিয়র টাইগারদের। তাদেরও মাথায় তুলে পরে আবার আছাড় দিতে সময় লাগেনি। অধঃপতনে নিতে নিতে ম্যাচের আগেই হেরে বসার রোগ পাইয়ে দেয়া হয়েছে। জাতীয় ক্রিকেট দলকে নিয়ে অনেক আজেবাজে কথা রয়েছে।

পাতানো ম্যাচের কেলেঙ্কারিও রয়েছে। বাদ নেই ক্যাসিনোকাণ্ডে জড়ানোর অভিযোগও। সাকিব আল হাসানের নিষেধাজ্ঞাও একটি ঘটনা। এই সিনিয়রদেরও এক সময় সীমা ছাড়িয়ে দান, অনুদান, উপহার, খাতির দেয়া হয়েছে। পরিনাম-প্রতিদান ভালো হয়নি। জাতীয় দলের হতাশাজনক পারফরম্যান্স ও নানা ঘটনায় দেশের ক্রিকেট যখন খাদের কিনারে তখনই উনিশের হাত ধরে বাংলাদেশ করল বিশ্বজয়। ধুঁকতে থাকা ক্রিকেট এলো তারুণ্যের বসন্ত। এই বসন্তকে ধরে রাখার বদলে নষ্ট পথে না নেয়ার আকুল মিনতি।

ক্রিকেটসহ সব খেলায়ই তরুণদের কঠোর পরিশ্রমের জন্য তৈরি থাকতে হয়। জায়গা ধরে রাখতে আরো খাটতে হয়। কোনো শর্টকাট নেই। কিন্তু, সেই পথ বের করে ফেলা হচ্ছে। বেশি দূর যাওয়ার আগেই তরুণ ক্রিকেটাররা ভালো টাকা পাচ্ছে। এর বিপরীতে পরিশ্রম থামাচ্ছে। সেরা পারফর্ম করে নিজেদের আরো ভালোর জন্য তৈরি রাখলে টাকা আরো বেশি আসবে-সেটার তালিমটা কেন দেয়া হচ্ছে না তাদের? একই সময়ে আমরা রাওয়ালপিন্ডি আর পচেফস্ট্রমে বাংলাদেশের বৈপরিত্য দেখেছি। রাওয়ালপিন্ডতে পাকিস্তানের কাছে হেরেছে বাংলাদেশ। আর পচেস্ট্রমে করেছে বাজিমাত। বাংলাদেশ ক্রিকেটের একটা কঠিন সময়ে এসেছে এই সাফল্যটা। এ নিয়ে রাজনীতি শুরু করতে দেরি হয়নি।

এটা কারো নামাজের সুফল, মুজিববর্ষের উপহার- এ ধরনের নগদ ফায়দা লোটা অত্যন্ত কুৎসিত। জয়টাকে নফল নামাজের ফল-উপহার, আর পরাজয়টা চেপে যাওয়ার মধ্যে দিয়ে গোটা সাফল্যটা হাস্যকর হয়ে যায়। প্রকারান্তরে হাইজ্যাকের দিকে চলে যায়। সাফল্যের কৃতিত্ব নিয়ে বিসিবি কর্মকর্তাদের প্রতিযোগিতাও আরেক বিনোদন আইটেমে ঠেকেছে। নানা প্রশ্নও উঠেছে। বিসিবি সভাপতি যখন বলেন-এই সাফল্য দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার ফল, তখন প্রশ্ন আসে- এরআগে কখনো দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা নিয়ে দল গড়ে তোলা হয়নি? জাতীয় ক্রিকেট দলকে কি তাহলে পরিকল্পনাহীন অবস্থায় যাচ্ছেতাইভাবে ছেড়ে দেয়া হয়েছে? কোটি কোটি টাকা খরচ করে হাইপারফরম্যান্স ইউনিটগুলো তা’হলে কী করে?

ব্যর্থতার দায় নিতে কারো রাজি না হওয়া এবং সাফল্য হাইজ্যাকের দিগম্বর দৌড় বিসিবি কর্মকর্তাদের কাঠগড়ায় দাঁড় করাচ্ছে। কথার কথা জুনিয়র টাইগাররা এবারো ব্যর্থ হলে সেই দায় কি বোর্ডের কেউ নিতেন? আকবরদের খোঁজও নিতেন? তাদের সাফল্য নিয়ে বাড়াবাড়ির লাগামে টান দেয়া দরকার। সংবর্ধনার চোরাবালিতে ডুবিয়ে যেন পথহারা করা না হয় তাদের। ছুতানাতা সুযোগ পেলেই তাদের তেলে তেলময় করা, ব্যবহারের মওকা খোঁজা, তাদের নিয়ে শোডাউন, রাজনীতিতে টেনে এনে খেলোয়াড়ি ক্যারিয়ার ধুলায় মিশিয়ে দেয়ার সঙ্গে বাঙালি সুপরিচিত। প্লিজ, আর নয়। এবার ক্ষ্যান্ত দিন। দেশে রাজনীতির খেলাকে ধুলাবালিতে একাকার করার লোকের অভাব নেই। মাঠের খেলাটাকে নষ্টের হাত থেকে মুক্তি দিন। একটু রহম করুন।

লেখক : সাংবাদিক-কলামিস্ট; বার্তা সম্পাদক।

এইচআর/এমএস

‘ব্যর্থতার দায় নিতে কারো রাজি না হওয়া এবং সাফল্য হাইজ্যাকের দিগম্বর দৌড় বিসিবি কর্মকর্তাদের কাঠগড়ায় দাঁড় করাচ্ছে। কথার কথা জুনিয়র টাইগাররা এবারো ব্যর্থ হলে সেই দায় কি বোর্ডের কেউ নিতেন? আকবরদের খোঁজও নিতেন? তাদের সাফল্য নিয়ে বাড়াবাড়ির লাগামে টান দেয়া দরকার। সংবর্ধনার চোরাবালিতে ডুবিয়ে যেন পথহারা করা না হয় তাদের। ছুতানাতা সুযোগ পেলেই তাদের তেলে তেলময় করা, ব্যবহারের মওকা খোঁজা, তাদের নিয়ে শোডাউন, রাজনীতিতে টেনে এনে খেলোয়াড়ি ক্যারিয়ার ধুলায় মিশিয়ে দেয়ার সঙ্গে বাঙালি সুপরিচিত। প্লিজ, আর নয়।’