দুর্বৃত্তায়নের রাজনীতি
আতঙ্কের কালো মেঘের আস্তরণ ভেদ করে আশার আলোকচ্ছটা দেখা গেলো নারায়ণগঞ্জে। একের পর এক জঘন্য অপরাধ ঘটার জন্য যে নারায়ণগঞ্জ অপরাধের মুক্তক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল তার বদনাম কিছুটা ঘুচলো, সাত খুনের বিচার হলো।
দেশের যেসব জনপদ সমাজবিরোধীদের মুক্তাঞ্চল হিসাবে পরিচিত, সেসব ‘বিপজ্জনক’ এলাকার অন্যতম এই নারায়ণগঞ্জ। নিম্ন আদালতে রায় হয়েছে, আরো দীর্ঘ প্রক্রিয়া পাড়ি দিতে হবে। মানুষ আশা করে এই বন্দর জেলায় আগে ঘটে যাওয়া ত্বকী হত্যাসহ সব খুন আর জঘন্য অপরাধের যৌক্তিক বিচার হবে।
এই সাত খুন, তার ভয়াবহতা, তার গভীরতা ছাপিয়ে যে বিষয়টি সবাইকে ভাবিয়ে তুলেছে তাহলো এই জঘন্য অপরাধের সাথে র্যাবের মতো একটি এলিট আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর স্থানীয় ইউনিটের অধিনায়কসহ উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তাদের জড়িত থাকা। তাদেরও ফাঁসির আদেশ হয়েছে। অনুধাবনের বিষয় এই রায়ের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে কি বার্তা পৌঁছুবে? তারা কি আইনের শাসন বলবৎ করতে সচেষ্ট হবে, নাকি অপরাজনীতির গড ফাদারদের সাথে মিলে আইনবহির্ভূত তৎপরতায় নিজেদের ব্যস্ত রাখবে?
শৃঙ্খলা বাহিনী হিসেবে র্যাবের ভাবমূর্তি আজ বড় প্রশ্নের মুখে। পুলিশ, র্যাব ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হৃদয়ে পরিবর্তন আসুক, এমন বাসনা মনে রাখি আমরা। কিন্তু র্যাব যেভাবে চলছিল, সেভাবেই কি থাকবে? জনতার অর্থে প্রতিপালিত বাহিনীর সদস্যরা এমন গণবিরোধী কাজ করার পরও র্যাব এমনটাই থাকবে বলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলছেন। আচ্ছা থাকল না হয়। কিন্তু অবসান ঘটবে কি দুর্বৃত্ত রাজনীতির? যারা নূর হোসেনের মতো খুনিকে জায়গা দেয় রাজনীতিতে, তাদের রাজনীতিও চলতে থাকবে? যে রাজনীতি নূর হোসেনদের তৈরি করে, সেই রাজনীতিরতো অবসান হবে না?
নারায়ণগঞ্জে সাত খুনের ঘটনা রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ণের বড় দৃষ্টান্ত। বাসের হেলপার থেকে নূর হোসেন দুর্ধর্ষ অপরাধী ও গডফাদারে পরিণত হয়েছে। বারবার দল বদল করে ক্ষমতাসীন দলে যোগ দিয়ে দিয়ে এ জায়গায় পৌঁছেছে সে। শুধু নারায়ণগঞ্জ নয়, অবাঞ্ছিত রক্তপাত প্রায় সর্বত্র। জেলায় জেলায় রাজনৈতিক কর্মীদের মধ্যে বিভিন্ন নিগ্রহ, খুন-জখম ও গৃহদাহের ঘটনা নিয়মিত। সত্যি বলতে কি এসব ভয়াবহ ঘটনা অপ্রত্যাশিত, অহেতুক, কিংবা আকস্মিক নয় একেবারে। গত কয়েক দশক ধরে দেশের সর্বত্র রাজনীতির যে পরিকল্পিত দুর্বৃত্তায়ন ঘটানো হয়েছে, যেভাবে প্রতিটি এলাকার চিহ্নিত সমাজবিরোধী ও দুষ্কৃতীদের দলে দলে পার্টির ছায়ায় আশ্রয় দেয়া হয়েছে তা-ই এ ধরনের ঘটনার মূল।
নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের প্রত্যাশিত রায়ের পরও স্থানীয় অনেকে গড ফাদার কেন্দ্রিক অপরাজনীতির কথা বলছেন। এই দুর্বৃত্তরা সন্ত্রাস সৃষ্টি করে, শুধু বিরুদ্ধ রাজনৈতিক দল নয়, নিজ দলেরও নেতা, কর্মী ও সমর্থক আর নিরীহ জনসাধারণকে সন্ত্রস্ত রেখে দলের ও নিজের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে। প্রতিবাদ করার সুযোগ নেই, করতে গেলেও ভীতিপ্রদর্শন মারফত কণ্ঠরোধ করা হয়েছে। আরেকটু সাহসী হয়ে প্রতিরোধ করতে গেলে দৃষ্টান্তমূলক সাজা হিসেবে কত মানুষকে যে ‘ত্বকী’ হয়ে যেতে হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। এ ধরনের সব কাজেই ‘সুশিক্ষিত’, ‘সুবক্তা’ নেতা ও শাসকরা দুর্বৃত্ত, এমনকী ভাড়াটে খুনিদের পর্যন্ত ব্যবহার করছেন। এমনসব স্মার্ট সন্ত্রাসী গড ফাদার নেতারা জেলায় জেলায় যেসব শিবির গড়ে তুলেছেন, তার বেশিরভাগই ব্যবহৃত হচ্ছে দলীয় প্রতিপক্ষকে শায়েস্তা করতে। এমন এক সংস্কৃতি আমদানি করা হয়েছে যে, জেলায় জেলায় খুন, ধর্ষণ বা চাঁদাবাজিই কৃতিত্ব। এরাই দলের সম্পদ হিসেবে বিকশিত হয়ে উঠছে। এই অপরাজনীতির বড় শিকার এখন সরকারি দলের তুলনামূলক ভদ্র নেতা কর্মিরা আর তাদের সাধারণ সমর্থকরা।
প্রত্যাশা ছিল পরিবর্তনের। আশা ছিল দুষ্কৃতীরাজের অবসান হবে। এমন প্রত্যাশা অমূলকও ছিল না। কারণ মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দল ক্ষমতায়। জাতির জনকের কন্যা প্রধানমন্ত্রী। দুর্ভাগ্যবশত তা হয়নি। দলের ভেতর থেকেই নানা ঘটনা ঘটিয়ে আইনের শাসনকে উল্লঙ্ঘন করে সরকারের ভাবমূর্তি মলিন করে দেয়া হয়েছে।
দুষ্কৃতিকারীরা অনেকেই কেবল তাদের ছত্রটি পরিবর্তন করেছে, কিন্তু রাজনীতির রীতি অপরিবর্তিত রেখেছে। এমন রাজনীতি প্রায় সব দলে। এই রীতির পরিবর্তনের দায়িত্ব প্রধান দলগুলির নেতৃত্বেরই, বিশেষ করে শাসক দলের। দলীয় নেতৃত্ব যদি এই দুর্বৃত্তায়নের প্রক্রিয়ায় ছেদ টেনে যথার্থ গণতান্ত্রিক শাসনপ্রণালী কায়েম করতে চায়, তবে সর্বাগ্রে দুর্বৃত্তায়নের সংস্কৃতি হতে দলকে টেনে বের করে আনতে হবে। নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচনে তার দৃষ্টান্ত দেখেছি আমরা। সব ধরনের অপচেষ্টা ও দুর্বৃত্তায়নের ঝুঁকি মাথায় নিয়েও পরিষ্কার ভাবমূর্তির সেলিনা হায়াত আইভীকে মেয়র পদে মনোনয়ন দিয়ে জনগণের হৃদয় জয় করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী।
এমন করে বের করে আনতে হবে পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির মুখ। কাজটি দুরূহ। রাতারাতি হওয়ারও নয়। কিন্তু দুর্বৃত্তায়নের রাজনৈতিক সংস্কৃতি হতে মুক্তি চাইলে সময়ও বেশি নেই। রাজধর্মের মূল কথা হলো দলমতনির্বিশেষে নাগরিকদের সুশাসন দেয়া এবং তাদের জীবন ও সম্পত্তির নিরাপত্তা বিধান করা। শাসক দলের এমপি মন্ত্রীরা সন্ত্রাসের কাধে ভর দিয়ে দলীয় ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে সন্ত্রস্ত করে রাখবেন, তা কাম্য নয়।
প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা হতে বিচ্যুতিই রাজধর্মভ্রষ্ট হওয়ার প্রাথমিক লক্ষণ। সেখানে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনের নিরপেক্ষ ভূমিকার বদলে পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ সব ভাল কিছুকে নস্যাৎ করে। শাসক দলের স্নেহপুষ্ট দুষ্কৃতিকারীদের উদার প্রশ্রয় দানের তৎপরতা সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচার প্রাপ্তির সম্ভাবনাকে সঙ্কুচিত করে। দুর্বৃত্তদের উপর নির্ভর করে শাসনে আগ্রহী হওয়া রাজনীতি নয়।
লেখক : বার্তা পরিচালক, একাত্তর টিভি।
এইচআর/পিআর