ক্রিকেটে শত্রু শত্রু খেলা
ইসমাইল বললো, একটা উপকার করনই লাগবো। আপনি সাংবাদিক মানুষ এইডা আপনি পারবেনই। মনে মনে কৌতূহলী হলাম। ডাক্তার এবং সাংবাদিকদের জীবনে এই এক জায়গাতে মিল প্রচুর। বিয়ে খেতে গেলেও ডাক্তারকে প্রেসক্রিপশন দিতে হয়। কেউ না কেউ এসে বলবে বুকে জ্বালা, কি করি ডাক্তার সাব? অথবা এতোদিন ধরে শরীর ঝিম ঝিম করে কী করি ডাক্তার সাব? সাংবাদিককে দিতে হয় প্রেস অ্যাডভাইস।
আমার বাড়ির সামনে রাস্তায় পানি জমে থাকে, একটা রিপোর্ট কইরা দেন। কারো কারো চাওয়া একটু বেশি। ওনাকে বলে দেন আমার ছেলের একটা চাকুরি দিক। তার প্রমোশন আটকে দেন । অথবা আমার মেয়েটা প্রেজেন্টার হতে চায়, নিয়ম বলেন দেখি। অথবা আমি নিজেই প্রেজেন্টার হতে চাই। সব সংবাদ কী মুখস্ত বলতে হয় ? ইত্যাদি। ইসমাইল টেইলর মাস্টার। শার্ট প্যান্ট বানায়। সে কী চাইতে পারে? আমি ভাবলাম বলবে, গার্মেন্টস থেকে কম টাকায় কাপড় কেনার একটা লাইন-ঘাট করে দেন। সেক্ষেত্রে আমার জবাব কী হবে তা মনে মনে ঠিক করে নেই। বলেন, চেষ্টা করবো।
আমার ছেলেটারে বিকেএসপিতে ভর্তি করার ব্যবস্থা করে দেন। ওরে আমি ক্রিকেটার বানাবো। কিছুটা অবাক হলাম। কেন? এখন ক্রিকেটাররা একেকজন বীর। ভালো খেলতে পারলে একদিনে সবাই চেনে। মানুষের ভালোবাসা পায়। টাকা পয়সাও আছে। সুতরাং আমার ছেলের ভবিষ্যতের জন্য তাকে খেলোয়াড় বানাতে চাই। দেখেন মোস্তাফিজের বয়স আর কতো? ১৯। সে এখন সারাদেশের খেলাপ্রেমী মানুষের নয়নমনি। টিম ভারতের বিরুদ্ধে যে পাঁচটি উইকেট সে নিল তার মূল্য কতো! ভারতের ইস্পাত কঠিন ব্যাটিং লাইন ভেঙে দিলো ছেলেটা। আমার ছেলেকে তার মতো বানাতে চাই।
এক খেলা দেখে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়? এক খেলা নয়। এর আগে শহীদ আফ্রিদীরে আউট করছে কে, সাংবাদিক ভাই? এই মুস্তাফিজ। বললাম, মাথায় থাকলো। আমি খোঁজ নেবো। মুস্তাফিজ বিষয়ে জানতে সোর্সদের সঙ্গে কথা বলার দরকার হয় না। এখন বিভিন্ন পত্রিকাতে অনেক তথ্য ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। এমনকী ভারতকে হারানোর পর পশ্চিমবঙ্গের বাংলা পত্রিকাগুলো টাইগারদের প্রশংসা করেছে। বলতে দ্বিধা নেই আনন্দবাজারের রাজর্ষি গঙ্গোপাধ্যায়ের প্রতিবেদন ঢাকার যত পাঠকের কাছাকাছি গেছে, একই দিনের প্রতিবেদন নিয়ে ঢাকার অনেক তারকাখচিত পত্রিকাও ততটা পাঠকের কাছে গেছে কী না প্রশ্ন রয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিরাটকে আউট করে তাসকিন আহমেদ যে চিৎকার করলেন, তাতে বোঝা যায় ভারত-বাংলাদেশ ক্রিকেট-সম্পর্ক এখন কোন জায়গায় দাঁড়িয়ে। এমএসডি তিনিও যা থেকে প্রভাবমুক্ত থাকতে পারলেন না। রান নিতে যাওয়ার সময় ধোনির কাঁধ মুস্তাফিজুরকে এমন গুঁতিয়ে দিল যে, ঊনিশের পেসারকে মাঠের বাইরে চলে যেতে হল সঙ্গে সঙ্গে। প্রত্যুত্তরটাও পেলেন ভারত অধিনায়ক। মুস্তাফিজুর ফিরে এসে ভারতকেই ম্যাচ থেকে ধাক্কা মেরে বার করে দিলেন।
অপর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাতে আবার নতুন নাটক দেখা দেয়। টিম ইন্ডিয়া এতটাই হতাশ হয়ে পড়ে ম্যাচ নিয়ে যে, তারা অভুক্ত থেকেই মাঠ ছাড়ে। যদিও নৈশভোজের যাবতীয় ব্যবস্থা ছিল স্টেডিয়ামে। এবং হোটেলে ফিরেও তাঁরা অভুক্ত থেকে গিয়েছেন বলে খবর।
যাহোক, এসব কথাই টাইগার সমর্থকদের ভালো লেগেছে, স্বাভাবিক। বিশ্বকাপ ক্রিকেটে বাংলাদেশকে হারিয়ে দেওয়া হয়েছে বলেই টাইগার সমর্থকদের বিশ্বাস। শ্রীনিবাস–মোস্তফা কামাল সম্পর্ক এবং মোস্তফা কামালের চ্যম্পিয়ন ট্রফি দিতে না পারা সমর্থকদের বিশ্বাস আরো জোড়ালো করেছে। বাংলাদেশ ভারত ক্রিকেট সম্পর্কের রসায়ন সব ক্রীড়ালেখকদেরও জানা। ফলে, টিম ভারতের পরাজয়ের খবরটি শুধু সেদিনের খেলোয়াড়দের ক্রীড়াশৈলীরই বর্ণনাতে সীমাবদ্ধ থাকেনি। অতীত টানা হয়েছে, মধুর প্রতিশোধের কথা বলা হয়েছে।
খেলার মাঠে অতীত ছায়া হয়ে থাকে। কিন্তু ভারত–বাংলাদেশ সিরিজে তাসকিনের চিৎকার কিংবা ধনীর ধাক্কা সে অতীতের ছায়া এতোটাই পাখা মেলেছে মাঠ জুড়ে যে অতীত একটু বেশীই উজ্জ্বল হয়ে গেছে। সেই সঙ্গে ক্রিকেট জগতে আরেক চির প্রতিদ্বন্দ্বী জুটির নাম সামনে এসেছে। তা হলো ভারত–বাংলাদেশ।
ভারত পাকিস্তান খেলা মানে এক ধরনের উত্তেজনা বিশ্বজুড়ে। এখন থেকে সে উত্তেজনার পাশাপাশি ভারত বাংলাদেশ ম্যাচ মানেই উত্তেজনা হিসাবে চিহ্নিত হবে বলেই মনে হচ্ছে।
ভারত পাকিস্তান রাজনৈতিক-সামাজিক সম্পর্ক ঠিক স্বাভাবিক নয়। ভারতের শীর্ষ নেতাদের বক্তৃতার প্রতিবাদ উঠে পাকিস্তানের পার্লামেন্টে। আরো উদাহরণ টানা যাবে যা থেকে একটা শক্রু শক্রু ভাব বোঝা যায়। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক এখন সবচেয়ে মধুর। সরকার পর্যায়ে নানা চুক্তি সম্পর্কের আস্থার দিকটিই আমাদের সামনে তুলে ধরে । ভারত বাংলাদেশ সম্পর্কে ঠিক শত্রু শত্রু ভাবটি নেই। এক সময়ের ভারত বিরোধী রাজনীতিতেও এখন ভাটা চলছে। তাহলে পাকিস্তান-ভারত ক্রিকেট রসায়ন থেকে বাংলাদেশ-ভারত ক্রিকেট রসায়নে বিস্তর ফারাক আছে। আবার জয়ের আনন্দে মাতোয়ারা হওয়ার একটা মিল আছে তিন দেশের ভক্তদের মাঝে। বাংলাদেশের দর্শকরা, যতটুকু বুঝতে পারি খেলার আনন্দ বা জয়ের আনন্দটাকে লুটেপুটে নেয়। ক্রিকেট শত্রুতা বলে যদি কিছু থাকে তবে তার উৎপত্তি মাঠেই। তার সমাপ্তিও মাঠে ।
যাহোক, বাংলাদেশ ক্রিকেটের কোচ শ্রীলংকান। শ্রীলংকা এক সময় ঘরের মাঠে ভালো করেছে খুব। ধীরে ধীরে বাইরের মাঠে। শ্রী লংকার মডেলে যদি এখন আমরা ঘরের মাঠে অসাধারণ হয়ে উঠি, তাহলে বাইরের মাঠে অসাধারণ হতে খুব বেশি দিন আমাদের লাগার কথা নয়।
খেলার প্রতি শুধু ভালোবাসা নয়, আমাদের মধ্যবিত্ত ব্যবসায়ীরাও এখন চাইছে তার ছেলে ক্রিকেট খেলুক। ইসমাইলের অনুরোধ এই সত্যকেই সামনে আনে। এ থেকে ইঙ্গিত পরিষ্কার। আমাদের দেশে খেলোয়াড় বানানোর মতো মানুষের অভাব হবে না। অভাব যদি হয় কখনো তা হবে উদ্যোগের। সরকার এ বিষয়ে মনোযোগ দিতে পারে।
ইসমাইলকে নিরাশ করিনি। যথাযথ খোঁজ নিয়ে জেনেছি, বিকেএসপিতে ভর্তি হতে হলে পারফর্ম্যান্স দেখাতে হয় ভালো। তদবির কাজে আসে না। বিশেষ করে ক্রিকেটে। ফলে, পরামর্শ দিলাম কোচিং এ ভর্তি করাতে। ইসমাইল জানালো, এরইমধ্যে ছেলেকে কোচিং এ দিয়েছে সে। ঢাকায় কোচিং আছে। গ্রামের ছেলেদের কী সে সুবিধা আছে? আমি চাই গ্রামের কৃষকের ছেলের প্রতিভা থাকলে সেও হয়ে উঠুক আমাদের স্বপ্নের নায়ক। আগামী দিনে অভিষেকে নিক নয় উইকেট।
এইচআর/এমএস