গণতন্ত্রের উত্তরণে নির্বাচনই শেষ ভরসা

সালাহ উদ্দিন জসিম
সালাহ উদ্দিন জসিম সালাহ উদ্দিন জসিম , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৪:৪৪ পিএম, ১০ জানুয়ারি ২০২৬
অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, অধ্যাপক ড. আল মাসুদ হাসানুজ্জামান, সাংবাদিক ও কলামিস্ট মোস্তফা কামাল, অ্যাডভোকেট আহসানুল করিম ও সিপিবির সাবেক সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, ছবি: সংগৃহীত

‘এদেশের মানুষ নির্বাচন চায়। ভালো নির্বাচন হয়নি বলেই শেখ হাসিনা সরকারের পতন হয়েছে। ভালো নির্বাচন হলে শেখ হাসিনা সরকারের এভাবে নির্মম পতন হতো না।’

সম্প্রতি এভাবেই গণতান্ত্রিক উত্তরণে আশা প্রকাশ করেন বঙ্গবীর আবদুল কাদের সিদ্দিকী।

একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধের এই অকুতোভয় সৈনিকই নন শুধু, নতুন বছরে পুরো বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক পথে ধাবিত হওয়ার স্বপ্ন দেখছে। একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ওই যাত্রা শুরু হবে বলে আশা সবার। তবে, দুরাশা বা শঙ্কাও আছে অনেকের।

নতুন বছরে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, লেখক ও সাংবাদিক, আইনজীবী এবং রাজনীতিবিদদের বক্তব্য জানতে চেয়েছে জাগো নিউজ। এতে উঠে এসেছে, ২০২৬ সালে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক উত্তরণ সম্ভব হলেও তা শর্তসাপেক্ষ। সবার অভিমত প্রায় এক জায়গায়—একটি অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও সর্বজনগ্রহণযোগ্য নির্বাচন ছাড়া গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনের কোনো বাস্তব পথ নেই।

ছাব্বিশে গণতান্ত্রিক উত্তরণ শর্তসাপেক্ষ

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড. আল মাসুদ হাসানুজ্জামান বলেন, নতুন বছরে গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও সুশাসন কতটা বাস্তবায়িত হবে, তা নির্ভর করছে কয়েকটি মৌলিক শর্ত পূরণের ওপর। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন এবং সেখানে সক্রিয় ভোটারদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।

তিনি বলেন, শুধু নির্বাচনই নয়, গণতান্ত্রিক উত্তরণের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো জুলাই সনদে অন্তর্ভুক্ত বিষয়গুলো জনগণের সম্মতির মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা। যদি এসব বিষয় জনগণের অংশগ্রহণে রেফারেন্ডাম বা গণভোটের মাধ্যমে অনুমোদিত হয় এবং সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়িত করা যায়, তাহলে গণতান্ত্রিক প্রবর্তন ও প্রতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

অধ্যাপক আল মাসুদ হাসানুজ্জামান মনে করেন, বিষয়গুলো সহজ নয়; বরং বেশ চ্যালেঞ্জিং। তবে এসব চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করে যদি শর্তগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে জবাবদিহিমূলক প্রশাসন, জনগণের অংশগ্রহণ এবং সুশাসনের ভিত্তিতে গণতন্ত্রের সুষ্ঠু চর্চা সম্ভব হবে।

আরও পড়ুন
জামায়াতের সঙ্গে জোট, একে একে সরে যাচ্ছেন এনসিপি নেত্রীরা
তারেক-নাহিদের হাতেই কি ভবিষ্যৎ?
বিচার বিভাগে ঐতিহাসিক ঘটনা ও আলোচিত রায়ের বছর

তিনি আরও বলেন, ২০২৫ সালের শেষ থেকে ২০২৬ সালে যে নির্বাচনি প্রক্রিয়া অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, তা দিয়েই দেশে গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনের জনগণের আশা–আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে সেটি পুরোপুরি নির্ভর করবে উল্লেখিত শর্তগুলো কতটা আন্তরিকতা ও স্বচ্ছতার সঙ্গে বাস্তবায়ন করা হয়, তার ওপর।

‘নির্বাচনটাই হবে গণতান্ত্রিক উত্তরণে একমাত্র উপায়’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমি আশা করি- আমরা ২০২৬ সালে গণতান্ত্রিক যাত্রায় অগ্রসর হতে পারবো। একটা নির্বাচন হবে। সেই নির্বাচনটাই হবে গণতান্ত্রিক উত্তরণে একমাত্র উপায়। আবার এই নির্বাচন না হলে আমরা ভীষণ বিপদে পড়বো। কেমন বিপদে পড়বো, সেটা ঠিক ধারণা করতে পারছি না এখন। কিন্তু আশা করবো, সেটা ঘটবে না। আশা ছাড়া তো কোনো ভরসা নেই। আশাই একমাত্র ভরসা। অন্যরাও এটা বুঝবে। বিশেষ করে নির্বাচন ব্যবস্থাপনায় জড়িত এবং নির্বাচনি প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী উভয়পক্ষ বুঝবে যে, নির্বাচন ছাড়া গণতন্ত্রে উত্তরণ তো অসম্ভব হবে এবং যে পরিস্থিতি হবে কারও জন্যই ভালো হবে না। কাজেই শুভবুদ্ধির উদয় হবে এটাই আমরা আশা করবো।’

‘গণতন্ত্র কোন ফেরে পড়ে সেই অপেক্ষাও ভর করেছে’

জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও কলামিস্ট মোস্তফা কামাল জাগো নিউজকে বলেন, ‘এখানে হোম মেইড গণতন্ত্র। এ গণতন্ত্র ধরা যায় না, ছোঁয়াও যায় না। গণতন্ত্র একদমই উপলব্ধির বিষয়। এখানে বরাবরই চলেছে যার যার সুবিধা মতো গণতন্ত্র। নিজের, পরিবারের এবং দলের আরোপিত তন্ত্রকে গণতন্ত্র বলে চালানো হয়েছে। যে কারণে গণতন্ত্র যে কাকে বলে তা মানুষের আজও জানা হয়নি, দেখাও হয়নি। যার অনিবার্য পরিণতিতে মানুষ আক্ষেপের সঙ্গে বলতে বাধ্য হয়- গণতন্ত্র খায়, না মাথায় দেয়? তারপরও প্রথাগত সিস্টেম ভাঙার প্রতিশ্রুতি দিয়ে নতুনত্বের স্বপ্ন সাধ জাগানো হয়েছে বারবার। দেখানো হয়েছে গণতন্ত্রের লোভ। বাস্তবটা বড় নির্দয়-নির্মম। প্রতারণায় ভরা। ক্ষমতায় গিয়ে নিজেরাই ঝোলে-ঝালে অম্বলে-কম্বলে লাভে লোভে ভাগবাটোয়ারায় মত্ত হন।’

তিনি বলেন, ‘ছাব্বিশ আবার আশা জাগিয়েছে। দীর্ঘ ১৭ বছর পর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান শুনিয়েছেন তার প্ল্যানের কথা। বলেছেন, আই হ্যাভ আ প্ল্যান। তাই গণতন্ত্রের জন্য আবার একটু অপেক্ষা তো করতেই হয়। তার বিপরীতে বা বিরোধী শক্তিরও তো প্ল্যান না থেকে পারে না। তারাও তাদের প্ল্যান বাস্তবায়ন করতে চাইবে। তখন গণতন্ত্র কোন ফেরে পড়ে সেই অপেক্ষাও ভর করেছে।’
‘গণতান্ত্রিক উত্তরণ নির্ভর করছে সুষ্ঠু নির্বাচনের ওপর’

সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট আহসানুল করিম জাগো নিউজকে বলেন, ‘দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রগতি হবে কি না, তা পুরোপুরি নির্ভর করছে নির্বাচনের ওপর। নির্বাচন সঠিকভাবে অনুষ্ঠিত হলে বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক যাত্রায় অগ্রসর হতে পারবে।’

তিনি বলেন, ‘নির্বাচন হওয়া অত্যন্ত জরুরি। তবে তা হতে হবে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও সর্বজনস্বীকৃত। জনগণকে স্বাধীনভাবে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ দিতে হবে।’

অ্যাডভোকেট আহসানুল করিম আরও বলেন, ‘মানুষ যেন নিজের ভোট নিজেই দিতে পারে—কোনো ধরনের প্রভাব, জোরজবরদস্তি কিংবা অর্থের প্রভাব ছাড়া। যার যার ভোট, যাকে ইচ্ছা, তাকে দেওয়ার পূর্ণ সুযোগ নিশ্চিত হলেই একটি ভালো ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্ভব হবে।’

‘২০২৬ সালে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা নিয়ে সংশয়’

২০২৬ সালে দেশে পরিপূর্ণ গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা হবে কি না—এ প্রশ্নে নির্দিষ্ট কোনো দিন-তারিখ দিয়ে আশাবাদী মন্তব্য করতে রাজি নন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম।

আরও পড়ুন
মার্টিন লুথার কিংয়ের ‘স্বপ্ন’ থেকে তারেক রহমানের ‘পরিকল্পনা’
সম্পর্কের নতুন চ্যালেঞ্জে বাংলাদেশ-ভারত
অনিশ্চয়তাই অর্থনীতির সবচেয়ে বড় শত্রু

তিনি বলেন, ‘শ্রেণিভিত্তিক সমাজব্যবস্থায় পরিপূর্ণ গণতন্ত্র কখনোই সম্ভব নয়। সমাজতন্ত্র ও সাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠা না হলে প্রকৃত গণতন্ত্র আসতে পারে না। তবে এই বৈষম্যমূলক সমাজেও শাসন কাঠামো হিসেবে সীমিত আকারে গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।’

সেলিমের মতে, গণতন্ত্রের পরিসর কতটুকু হবে, তা নির্ভর করে রাষ্ট্রক্ষমতায় কোন শ্রেণির আধিপত্য রয়েছে তার ওপর। তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি কিংবা জামায়াতে ইসলাম—এই দলগুলোর হাতে গণতন্ত্র নিরাপদ নয়। অতীত অভিজ্ঞতা থেকেই আমরা তা দেখেছি। তারা মৌলিকভাবে সংশোধিত না হলে ভবিষ্যতেও তাদের নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থায় সবার জন্য পরিপূর্ণ গণতন্ত্র নিশ্চিত হবে না।’

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম আরও বলেন, ‘ইতিহাসের স্রষ্টা জনগণ। জনগণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণে বহুবার বিজয় এসেছে। কিন্তু সেই বিজয়ের ফসল দেশ ও জনগণের জন্য বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে জনগণের পর্যাপ্ত সচেতনতার অভাব থাকে। ফলে সুন্দর কথার ফাঁদে পড়ে যারা ক্ষমতায় যায়, তারা অচিরেই নিজেদের শ্রেণি শোষণের স্বার্থে গণতন্ত্রকে গুরুত্বহীন করে তোলে।’

রাষ্ট্র পরিচালনায় জনগণের ভূমিকা সরাসরি নিশ্চিত করা গেলে আপেক্ষিক গণতন্ত্রের পরিসর আরও বিস্তৃত করা সম্ভব বলে মনে করেন সেলিম। তার ভাষায়, ‘সেই পথ ধরেই ধাপে ধাপে পরিপূর্ণ গণতন্ত্রের দিকে এগোতে হবে। সমাজতন্ত্র অভিমুখী সমাজ গঠনে আমরা কতটা অগ্রসর হতে পারছি—গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎও তার ওপরই নির্ভর করে।’

২০২৬ সাল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘২০২৬ সাল এখনো শুরুই হয়নি। এক বছরের মধ্যে অনেক কিছু ঘটে যেতে পারে। মানুষ ছাত্রদের গণঅভ্যুত্থান দেখেছে, কিন্তু শ্রমিক নেতৃত্বাধীন গণঅভ্যুত্থান এখনো দেখেনি। কী হবে, তা এখনই দিন-তারিখ দিয়ে বলা সম্ভব নয়।’

সার্বিকভাবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, গণতন্ত্রে উত্তরণ নির্ভর করছে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, সুষ্ঠু নির্বাচন, জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং কাঠামোগত সংস্কারের ওপর। এসব শর্ত পূরণ না হলে ২০২৬ সালও অনিশ্চয়তার মধ্যেই রয়ে যেতে পারে।

এসইউজে/এমএমএআর/এমএফএ/এএসএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।