দল চাঙ্গা করতে মাঠে মালয়েশিয়া বিএনপি


প্রকাশিত: ১২:৩২ পিএম, ১৩ জুন ২০১৫

দলকে চাঙ্গা করতে মাঠে নেমেছে মালয়েশিয়া বিএনপি। বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক হাওয়া সমান্তরালেই বয়ে চলে মালয়েশিয়ায়। জন্মভূমির টানেই মালয়েশিয়ায় ঘরোয়া পরিবেশে সভা সেমিনার আয়োজন করে আসছে বিএনপি ও তার অঙ্গ-সংগঠন। মালয়েশিয়ায় ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী, শিক্ষার্থী ও শ্রমিকদের অংশগ্রহণ রয়েছে রাজনীতিতে। কাগজে কলমেই দেশটিতে প্রায় সাড়ে সাত লাখ বাংলাদেশির বাস।

প্রবাসে দলীয় রাজনীতিকে চাঙ্গা করতে দেশের সংগঠনগুলোর কেন্দ্রীয় কমিটিও বেশ গুরুত্ব দেয়ায় নয়া কৌশলে এগুচ্ছে মালয়েশিয়া বিএনপি। দল গোছানোর পাশাপাশি নতুন করে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদারের উদ্যোগ নিচ্ছে মালয়েশিয়া বিএনপি। এক্ষেত্রে প্রতিবেশি রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।

দলের নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, প্রতিবেশি রাষ্ট্রগুলোকে বাইরে রেখে কোনো ধরনের কূটনীতিই সফলতার মুখ দেখবে না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মালয়েশিয়া বিএনপির এক নেতা বলেন, প্রবাসের রাজনীতি দেশে প্রভাব ফেলে, এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। আমরা প্রবাসে থেকেও দেশের রাজনীতিতে ভূমিকা রাখছি।

তিনি বলেন, তারেক রহমানকে সরকার ভয় পায়। আর সে কারণেই তাকে দেশে ফিরতে দিচ্ছে না। পূর্ব এশিয়ার রাজধানী মালয়েশিয়ায় বাঙালি কমিউনিটিতে বিএনপিই সংখ্যাগরিষ্ঠ বলে দাবি করেন তিনি। মালয়েশিয়ায় বিএনপির নেতাকর্মীরা নিজ নিজ অবস্থান থেকে দলকে এগিয়ে নিতে কাজ করছেন।

মালয়েশিয়া বিএনপির সদস্য সচিব মো. মোশাররাফ হোসেন বলেন, ‘বিএনপির রাজনীতি শুধু দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, আন্তর্জাতিকভাবে সব দেশের সঙ্গেই বিএনপির কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। শুধু একটি দেশ ছাড়া সব দেশের কূটনীতিকরা বারবারই বলছেন, আলোচনার মাধ্যমে সব দলের অংশগ্রহণে বাংলাদেশে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হওয়া জরুরি।

তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের ওপর জনগণের আর কোনো আস্থা নেই। তারপরও গায়ের জোরে সরকার ক্ষমতা আঁকড়ে রয়েছে। সাত বছর ধরে বিভিন্ন মামলা মাথায় নিয়ে সপরিবারে যুক্তরাজ্যে অবস্থান করছেন খালেদা জিয়ার বড় ছেলে ও বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান। দীর্ঘদিন যুক্তরাজ্যে অবস্থানের কারণে সেখানে নিজের প্রভাববলয় গড়ে তুলেছেন বিএনপির এ ভবিষ্যৎ কর্ণধার। গত বছর তারেক রহমানের দেয়া কিছু রাজনৈতিক বক্তব্য নিয়ে তোলপাড় শুরু হয় দেশে। তার এ রাজনৈতিক সক্রিয়তায় সরকারেরও টনক নড়ে। তারেক রহমানকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলেও তখন সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়। গত বছর সরকার পতনে বিএনপির ডাকা আন্দোলনের আগেই মালয়েশিয়া সফরে যান তারেক রহমান। ওই সফরের পর উজ্জীবিত হয়ে ওঠেন দেশটিতে অবস্থানরত বিএনপি সমর্থকরা।

মালয়েশিয়া বিএনপির আহ্বায়ক মাহাবুব আলম শাহ বলেন, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ছিলেন আধুনিক বাংলাদেশের রূপকার। তিনিই জাতির সংকটময় মুহূর্তে বারবার দাঁড়িয়েছেন নির্ভয়ে, মাথা উঁচু করে। বিপর্যস্ত জাতিকে রক্ষা করেছেন সর্বোচ্চ ঝুঁকি নিয়ে। ১৯৭১ সালে দেশমাতৃকার মুক্তির জন্য হানাদারদের বিরুদ্ধে সেক্টর কমান্ডার ও জেড ফোর্সের অধিনায়ক হিসেবে নেতৃত্ব দেন তিনি। স্বাধীনতা যুদ্ধে তার এ অতুলনীয় ভূমিকা ইতিহাসে উজ্জ্বল হয়ে আছে।

তিনি বলেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর অস্থিতিশীল ও অনিশ্চিত এক পরিস্থিতি থেকে দেশ মুক্তি পায় ৭ নভেম্বরের ঐতিহাসিক সিপাহী-জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে। আর এ বিপ্লবের প্রাণ-পুরুষ ছিলেন জিয়াউর রহমান। তিনি একদলীয় বাকশালের রাহুমুক্ত করে দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন। নিশ্চিত করেন বাক-ব্যক্তি ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা।

বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের কালজয়ী দর্শনের প্রবক্তা জিয়াউর রহমান জাতির নিজস্ব পরিচয় তুলে ধরেন। তার অন্যতম উপহার বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের পতাকাবাহী রাজনৈতিক দল ‘বিএনপি’। তার শাহাদাতের পর তার সহধর্মিনী বেগম খালেদা জিয়া দলের হাল ধরেন। তার প্রতিষ্ঠিত দল তিনবার জনগণের ভোটে সরকার পরিচালনার দায়িত্ব পায়। আমরা যারা প্রবাসে বিএনপির নেতৃত্ব দিচ্ছি, তাদের সঙ্গে সারাদেশের বিএনপি নেতাকর্মীর যোগাযোগ সুদৃঢ় রয়েছে। দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বেই আমরা কাজ করছি।

তিনি আরো বলেন, মালয়েশিয়ার প্রবাসী বাঙালিদের মধ্যে বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ রয়েছে। বাংলাদেশের গণতন্ত্র কীভাবে পুনরুদ্ধার করা যায়, তা নিয়ে সবাই চিন্তিত।

এদিকে মালয়েশিয়া বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ের নেতারা বলছেন, কমিটির জন্য লবিং না করে ঐক্যবদ্ধ হয়ে দলকে শক্তিশালী করতে সঠিক পন্থায় কাজ করুন। রাজনীতির নামে দলের আদর্শকে ভূ-লুণ্ঠিত করবেন না। বিদেশের মাটিতে বিএনপিকে বিতর্কিত না করে শহীদ জিয়ার স্বপ্ন ও আদর্শকে লালন করে সকলকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে। বিভক্তি মিটিয়ে ঐক্যবদ্ধ হতে পারলে বিএনপির নতুন কমিটি ঘোষণা হতে পারে। এ জন্য দলকে আরো শক্তিশালী করতে সকলকে এগিয়ে আসতে হবে।

সম্প্রতি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেদ্র মোদির সঙ্গে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বৈঠকে সম্পর্ক উন্নয়নে নতুন করে আশাবাদী হয়ে উঠেছে দেশের ন্যায় মালয়েশিয়া বিএনপি। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাতিসংঘসহ পশ্চিমা বিশ্ব এবং মালয়েশিয়ায় কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ানোর জোর চেষ্টা চলছে। সর্বশেষ গত ৫ জানুয়ারি সরকারের বর্ষপূর্তিকে কেন্দ্র করে তিন মাসের টানা আন্দোলনে বিএনপির কূটনৈতিক উইং ভেঙে পড়ে। কূটনৈতিক মহলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শমসের মবিন চৌধুরীকে গ্রেফতার করা হয়। চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা রিয়াজ রহমানকে গুলি করে তার গাড়ি জ্বালিয়ে দেয়া হয়। আরেক উপদেষ্টা সাবিহ উদ্দিন আহমেদের গাড়িও পোড়ানো হয়।

এ ছাড়া সাংবাদিক শফিক রেহমানের বাসায় ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায় দুর্বৃত্তরা। এরা সবাই বিএনপির পক্ষে কূটনৈতিক মহলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। এ সময় গুলশান কার্যালয়ে অবস্থান করছিলেন খালেদা জিয়া। বিভিন্ন দেশের কূটনীতিবিদরা বেগম জিয়ার সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎও করেন। গুলশান কার্যালয়ে কূটনীতি সংশ্লিষ্ট ওইসব নেতা যাতায়াত কমিয়ে দেন। অবশ্য সম্প্রতি শমসের মবিন চৌধুরী মুক্তি পেয়েছেন। এখন তারা আবারো বিএনপির কূটনীতি দেখভাল করছেন।

সূত্র জানায়, চলতি বছর কঠোর কোনো আন্দোলন কর্মসূচিতে না গিয়ে বিএনপি দল গোছানোর পাশাপাশি কূটনৈতিক তৎপরতায় মনোযোগ দেয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ঈদের পরই দল পুনর্গঠন প্রক্রিয়া পুরোদমে শুরু হবে। এর আগেই নতুনভাবে ‘ফরেন ডিপ্লোমেসি’ বাড়িয়ে দিয়েছে বিএনপি। বিশেষ করে ভারতের সঙ্গে নতুনভাবে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে জোর তৎপরতা চালানো হচ্ছে।

এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ড. এম ওসমান ফারুক জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বের দেশের প্রতিনিধির সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করছেন। সেখানে তিনি বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির পাশাপাশি বিএনপির অবস্থান তুলে ধরছেন বলে জানা গেছে।

দলীয় সূত্রে জানা যায়, ঢাকার পাশাপাশি লন্ডন থেকে দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানও প্রভাবশালী বিভিন্ন দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। ভারতের সর্বশেষ নির্বাচনের আগে থেকেই বিজেপির সঙ্গে তার একটি ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলার উদ্যোগ নেয়া হয় বলে জানা যায়। সম্প্রতি ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার দেখা-সাক্ষাতে তারই ভূমিকা বেশি ছিল বলে বিএনপির সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

এদিকে মালয়েশিয়া বিএনপির একাংশের সাংগঠনিক সম্পাদক কাজী সালাহ উদ্দিন বলেন, ‘একটি বড় রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপির সব দেশের সঙ্গেই সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা উচিত। বিএনপিও সে চেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছে। সব দেশের সরকারের পাশাপাশি জনগণের সঙ্গেও আমাদের একটি সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। অনেকেই প্রত্যক্ষভাবে বিএনপির আন্তর্জাতিক কূটনীতি দেখভাল করছেন। আবার কেউ কেউ আড়ালে থেকেও কাজ করে যাচ্ছেন। তবে দক্ষ ও মেধাবীদের কূটনীতিতে সম্পৃক্ত হওয়া উচিত।’

বিএ/আরআই

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।