রগ হারিয়ে কেঁদে বেড়ায় তাকিমরা, ছাত্রলীগে পদ পায় অযোগ্যরা

সায়েম সাবু
সায়েম সাবু সায়েম সাবু , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৭:৫৯ পিএম, ১৬ মে ২০১৯

ফের সমালোচনায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ। নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে বহুবার সমালোচনায় পড়লেও এবার নিজ সংগঠনের পূর্ণাঙ্গ কমিটি দিয়ে চরম বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী।

অথচ সংগঠনের জন্য নিবেদিত, ত্যাগী ও যোগ্য নেতাদের অনেকেই ঠাঁই পাননি এবারের কমিটিতে। নতুন কমিটি নিয়ে বিতর্কের যেন শেষ নেই। পদবঞ্চিতরা প্রতিবাদ করতে এসে হামলার শিকার হলেন, রক্তাক্ত হলেন ছাত্রলীগের নারী নেত্রীরাও। খোদ প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা কেন্দ্রীয় দুই নেতাকে ডেকে নিয়ে ভর্ৎসনা করলেন। অযোগ্যদের বাদ দিয়ে যোগ্যদের সংগঠনে জায়গা দিতে তাগিদও দিয়েছেন শেখ হাসিনা।

পদবঞ্চিতদের অভিযোগ, বিশেষ সুবিধা নিয়ে সভাপতি শোভন এবং সাধারণ সম্পাদক রাব্বানী হত্যা মামলার আসামিকেও কমিটিতে পদ দিয়েছেন। হত্যাচেষ্টা মামলার আসামি, মাদকসেবী, বিএনপি-জামায়াত ও রাজাকার পরিবারের সন্তান, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কৃত, সন্ত্রাস-চাঁদাবাজিতে যুক্ত, বিবাহিত, সংগঠনে নিষ্ক্রিয় এবং অছাত্ররা এবার পদ পেয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। বয়সের ব্যাপারে কঠোর নির্দেশনা থাকলেও অনেকের বয়স ৩০ এর কোটা ছাড়িয়ে গেছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

খোদ সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে। কমিটিতে আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক পদ পাওয়া মো. রাকিনুল হক চৌধুরী কেন্দ্রীয় সভাপতি শোভনের আপন ছোট ভাই। ছাত্রলীগে তিনি একেবারেই নিষ্ক্রিয় বলে অনেকেই জানিয়েছেন। অন্যদিকে ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানীর নিজ জেলা মাদারীপুর থেকেই ২২ জন কমিটিতে স্থান পেয়েছেন। কমিটিতে পদ পেতে অবিবাহিত থাকার শর্ত থাকলেও কারও কারও বিরুদ্ধে বিয়ের প্রমাণপত্র মিলছে। পদবঞ্চিত অনেক নারীকর্মী আপত্তিকর অভিযোগ তুলছেন সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে।

ছাত্রলীগের এমন অনিয়মের বিরুদ্ধে সরব হচ্ছেন পদবঞ্চিত ত্যাগী কর্মীরা। আবার অনেকেই নীরবে নিভৃতে কেঁদে ফিরছেন। এমন নিভৃতে থাকা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রলীগ নেতা আখেরুজ্জামান তাকিম। শিবিরের বর্বর হামলার শিকার এ শিক্ষার্থী এখন একপ্রকার পঙ্গু জীবন যাপন করছেন। বারবার যোগাযোগ করেও ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে জায়গা পাননি তাকিম।

ঘটনা ২০১২ সালের ২১ নভেম্বর। অভিযোগ ওঠে, শিবির ক্যাডাররা ওইদিন রাতের বেলায় অতির্কিত হামলা চালিয়ে গুরুতর জখম করে তাকিমকে। হামলার আগে সন্ত্রাসীরা সেদিন ক্যাম্পাসে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। এরপর হাত-পায়ের রগগুলো ধারালো অস্ত্র দিয়ে কেটে ফেলে। রগকাটার পাশাপাশি তাকিমের মাথার খুলিও উপড়ে ফেলা হয়। আঘাত করা হয় শরীরের নানা জায়গায়। মৃত্যু নিশ্চিত জেনে শিবির সন্ত্রাসীরা তাকিমকে অন্ধকারে ফেলে রেখে যায়।

জীবন-মরণের সন্ধিক্ষণে থাকা তাকিমকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় এক মাস আইসিইউ-তে রাখা হয়। এ সময় তাকিমের জন্য ৬২ ব্যাগ রক্তের প্রয়োজন হয়। শরীরের অন্যত্র থেকে রগ এবং মাংসপেশী কেটে নিয়ে পায়ে সংযুক্ত করা হয়। প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ নজরে চিকিৎসা সহায়তা পেয়ে প্রাণ ফিরে পান তাকিম। যদিও আজীবনের জন্য পঙ্গু হয়ে থাকতে হবে তাকে। তার পায়ের রগগুলো এখনও জোড়া লাগানো বাকি রয়েছে।

আহত এ ছাত্রলীগ নেতা জাগো নিউজকে বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ধারণ করি বলেই ছাত্রশিবিরের সঙ্গে কখনও আপস করিনি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবিরকে বিতাড়িত করতে গিয়েই ওই পৈশাচিক হামলার শিকার হয়েছিলাম। আমি এখনও খুঁড়িয়ে হাঁটি। সারাজীবনেও আর স্বাভবিক জীবনে ফিরতে পারব না।’

তাকিম বলেন, ‘কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগে পদ পাওয়ার সব যোগ্যতাই আমার আছে। আমাকে কেন্দ্রীয় নেতাদের পক্ষ থেকে আশ্বাসও দেয়া হয়েছিল। অথচ পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে আমার ঠাঁই হলো না।’

ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘ঢাকার বাইরের ছাত্রলীগের যথাযথ মূল্যায়ন না করার কারণেই আমরা আজ অবহেলিত। অথচ সাম্প্রদায়িক শক্তি শিবিরের সঙ্গে যুদ্ধটা আমাদেরকেই বেশি করতে হয়। কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যে আধিপত্য, তা দূর করতে না পারলে ছাত্রলীগ আরও সঙ্কটে পড়বে।’

গত ১৩ মে ছাত্রলীগের ৩০১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটির আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করা হয়। পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে সহ-সভাপতি ৬১ জন, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ১১ জন, সাংগঠনিক সম্পাদকের পদ পেয়েছেন ১১ জন। এ ছাড়া বিষয়ভিত্তিক সব সম্পাদক এবং সহ সম্পাদক ও উপসম্পাদকের নামও ঘোষণা করা হয়।

এ কমিটি ঘোষণার পর থেকে পদবঞ্চিত নেতাকর্মীরা আন্দোলন করছেন।

এএসএস/এনডিএস/পিআর

আপনার মতামত লিখুন :