হবিগঞ্জ-৪

জয়-পরাজয়ের ‘ফ্যাক্টর’ চা শ্রমিক ভোটার

সালাহ উদ্দিন জসিম
সালাহ উদ্দিন জসিম সালাহ উদ্দিন জসিম , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক হবিগঞ্জ থেকে ফিরে
প্রকাশিত: ১০:২৪ এএম, ১৩ অক্টোবর ২০২২
বাগানে কাজ করছেন চা শ্রমিকরা

চা বাগান অধ্যুষিত জেলা হবিগঞ্জ। সংসদীয় আসন হবিগঞ্জ-৪ এ রয়েছে ২০টির বেশি চা বাগান। এসব বাগানে কাজ করেন কয়েক হাজার চা শ্রমিক। ভোটের মাঠে যারা বড় ফ্যাক্টর বলে মনে করছেন স্থানীয় সাধারণ মানুষ ও রাজনীতিবিদরা। ১৯৯১ থেকেই এ আসনে নৌকা জয়ী হয়ে আসছে। আওয়ামী লীগের প্রার্থী পরিবর্তন হলেও পরাজয়ের গ্লানি কাউকে বইতে হয়নি।

চুনারুঘাট ও মাধবপুর উপজেলা নিয়ে এ আসন। সরেজমিনে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এই আসনের দুই উপজেলার মধ্যে চুনারুঘাটে নৌকার ভোট বেশি। মাধবপুরে বিএনপির কিছু ভোট আছে, কিন্তু দুই উপজেলার ভোটের সমন্বয়ে সব সময় এগিয়ে থাকে নৌকা।

তারা বলছেন, এটি বরাবরই নৌকার ঘাঁটি। যেই নৌকা পাক, জিতবে। কারণ, এ এলাকা চা বাগান অধ্যুষিত। চুনারুঘাটে ১৮টি ও মাধবপুরে চার-পাঁচটি বাগান আছে। এসব বাগানের চা শ্রমিকরা একচেটিয়া নৌকায় ভোট দেন।

কারণ হিসেবে স্থানীয়রা বলছেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান চা শ্রমিকদের নাগরিকত্ব দিয়েছেন। যে যাই বলুক, ভোট দেওয়ার সময় তারা জাতির পিতার নৌকায় ভোট দেন।

‘এবার চা শ্রমিকদের আন্দোলনেও বাজিমাত করেছেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি তাদের আন্দোলন যেমন থামিয়েছেন, তেমনি বেতন বাড়ানোয় ভূমিকা রেখেছেন। বলেছেন, তাদের ঘর করে দেবেন। অনেককে দিয়েছেনও। এসব কারণে চা শ্রমিকরা বরাবরই নৌকার পক্ষে।’ দাবি স্থানীয়দের।

ভোটের হিসাব-নিকাশ নিয়ে চায়ের আড্ডায় কথা হয় চুনারুঘাটের পানছড়ির কাছে ঢেউয়াতলী বাজারে একদল নবীন ও প্রবীণ ভোটারের সঙ্গে। ফার্নিচার ব্যবসায়ী সুভাষ দেবনাথ, কৃষক আবদুর রহমান, ফার্নিচারের মিস্ত্রি ওসমান গণি, ড্রাইভার মানিক মিয়া, গাছি (লাকড়ি কুড়ায়) আব্দুস সোবহান ও বাবুর্চি মো. রুবেল মিয়া খোলামেলা আলাপ করেন এ নিয়ে।

সুলতানপুরের কৃষক আবদুর রহমান বলেন, পুরো চুনারুঘাটে ১৮টি চা বাগান। এখানে (পানছড়ি) ৫শ পরিবারকে আশ্রয়ণ প্রকল্পের মাধ্যমে ঘর করে দিয়েছেন শেখ হাসিনা। এখন ২০২২-এ তাদের তো অন্তত চারজন করে ভোটার হলেও দুই হাজার ভোট। এরপর এবার আরও ২শ পরিবারকে ঘর দিয়েছে এই পানছড়িতে। এরা তো নৌকার ভোটার।

একই সুরে কথা বলেন পাশে বসে থাকা অন্যরাও।

তবে তারা মনে করেন, এখানে নৌকার বাইরে একজনই পাস করতে পারেন, তিনি ব্যারিস্টার সায়েদুল হক সুমন। এলাকায় নানা কাজ করে তিনি জনপ্রিয় হয়ে গেছেন। মানুষ তাকে পছন্দ করে।

হবিগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও চুনারুঘাট উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুল কাদির লস্কর জাগো নিউজকে বলেন, এলাকায় আওয়ামী লীগের অবস্থান ভালো। মান-অভিমান বা দ্বন্দ্ব কিছুটা থাকলেও নেত্রী নৌকা দিয়ে দিলে আর কিচ্ছু থাকে না। সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে যায়। আরও সুবিধা হলো- আমাদের এখানে চা শ্রমিক ভোটার আছে বেশ ভালো সংখ্যক।

চায়ের দোকানে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ

চুনারুঘাট উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান (স্বতন্ত্র) লুৎফুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, আমার উপজেলাটা আওয়ামী অধ্যুষিত। এখানে হিন্দু ও বাগান শ্রমিক বেশি। তারা জন্মগতভাবে নৌকার সমর্থক ও ভোটার। এদের ভোট যে পাবে, তার জয় নিশ্চিত। আওয়ামী লীগ তাদের কী দিলো না দিলো সেটা বড় ব্যাপার নয়, তারা নৌকায় ভোট দেবেই। আমি স্বতন্ত্র বা অরাজনৈতিক লোক হয়েও বিপুল ভোটে পাস করেছি তাদের ভোট পেয়েছি বলেই।

মাধবপুর উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান ও উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি মজিব উদ্দিন তালুকদার জাগো নিউজকে বলেন, আমাদের এই আসনে নৌকার অবস্থা ভালো। বর্তমান এমপি ভালো করছেন। পাশাপাশি এখানে চা শ্রমিকদের একটা বড় ভোটব্যাংক আছে, যারা সব সময়ই নৌকায় ভোট দেয়।

চুনারুঘাট ও মাধবপুর উপজেলা নিয়ে গঠিত জাতীয় সংসদের ২৪২ নম্বর আসন হবিগঞ্জ-৪। এতে মোট ভোটার ৪ লাখ ২৭ হাজার ৫২৫। পুরুষ ভোটার ২ লাখ ১৩ হাজার ২৯৪, নারী ভোটার ২ লাখ ১৪ হাজার ২৩১।

এ আসনটি স্বাধীনতার পর দুবার ছিল জাতীয় পার্টির। পরে আওয়ামী লীগের হাতে এলে আর হাতছাড়া হয়নি। ’৯১ থেকে চারবারের এমপি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ও প্রয়াত সমাজকল্যাণমন্ত্রী এনামুল হক মোস্তফা শহীদ। তার মৃত্যুর পর বেসামরিক বিমান ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী মাহবুব আলী গত দুবারের এমপি। ভোটের হিসাবে এখানে সব সময় আওয়ামী লীগ এগিয়ে, বিএনপি ৪০ শতাংশ ভোট পেলে আওয়ামী লীগ পায় ৫০ শতাংশ।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে (২০১৮) আওয়ামী লীগের মাহবুব আলী পান ৩ লাখ ৮ হাজার ৭২৭ ভোট। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট শরিক খেলাফত মজলিশ মহাসচিব আহমেদ আব্দুল কাদের ৪৬ হাজার ১৮৩ ভোট পান।

১০ম সংসদ নির্বাচনে (২০১৪) আওয়ামী লীগের মাহবুব আলী নৌকা প্রতীকে ১ লাখ ২২ হাজার ৪৩৩ ভোট পান। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী স্বতন্ত্র প্রার্থী সৈয়দ তানভীর আহমেদ তালা প্রতীকে পান ১৪ হাজার ৭৬০ ভোট।

৯ম সংসদ নির্বাচনে (২০০৮) আওয়ামী লীগের এনামুল হক (মোস্তফা শহীদ) নৌকা প্রতীকে পান ১ লাখ ৫৫ হাজার ৮৯৬ ভোট। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির সৈয়দ মোহাম্মদ ফয়সাল ধানের শীষ প্রতীকে পান ১ লাখ ২৪ হাজার ৭৮৮ ভোট।

৮ম সংসদ নির্বাচনে (২০০১) আওয়ামী লীগের এনামুল হক (মোস্তফা শহীদ) নৌকা প্রতীকে পান ১ লাখ ৭ হাজার ৩৭৬ ভোট। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির সৈয়দ মোহাম্মদ ফয়সাল ধানের শীষ প্রতীকে পান ৯৩ হাজার ৩১ ভোট।

৭ম সংসদ নির্বাচনে (১৯৯৬) আওয়ামী লীগের এনামুল হক (মোস্তফা শহীদ) নৌকা প্রতীকে ৭০ হাজার ২৪০ ভোট পান। বিএনপির সৈয়দ মোহাম্মদ ফয়সাল ধানের শীষ প্রতীকে পান ৫৯ হাজার ৬৬৬ ভোট।

৫ম সংসদ নির্বাচনে (১৯৯১) আওয়ামী লীগের প্রার্থী এনামুল হক (মোস্তফা শহীদ) নৌকা প্রতীকে পান ৬৭ হাজার ৮৪৭ ভোট। তার নিকটতম বিএনপির সৈয়দ মোহাম্মদ ফয়সাল পান ৫১ হাজার ৬৯৪ ভোট।

এসইউজে/এএসএ/এএসএম

টাইমলাইন  

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।