সিলেট-২

ইলিয়াস আলীর আসনে দ্বিধা-বিভক্ত আওয়ামী লীগ, জোটে বিনষ্ট ভোট

সালাহ উদ্দিন জসিম
সালাহ উদ্দিন জসিম সালাহ উদ্দিন জসিম , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক সিলেট থেকে ফিরে
প্রকাশিত: ১১:০১ এএম, ২৭ অক্টোবর ২০২২

গত তিন দশকে সিলেট-২ আসনে পরপর দুবার ক্ষমতায় আসতে পারেনি কোনো দল। আসন ভাগাভাগি হয়েছে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টির মধ্যে। এসব দলের জোটের প্রার্থী পাস করেছেন তিনবার। এই আসনে বর্তমান সংসদ সদস্য বিএনপি জোটের প্রার্থী জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের মোকাব্বির খান। বিএনপির নিখোঁজ নেতা, সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস আলীও ছিলেন এ আসনের। এখনো তার ব্যাপক প্রভাব নির্বাচনী এলাকায়। আওয়ামী লীগ সবশেষ দুই নির্বাচনে জোটের প্রার্থী হিসেবে জাতীয় পার্টিকে আসন ছাড়ায় সাংগঠনিকভাবে এখানে ব্যাপক দুর্বল। নেতা-কর্মীরাও দ্বিধা-বিভক্ত। আগামী নির্বাচনে তাই প্রার্থী বাছাই যথার্থ না হলে আসন পুনরুদ্ধার কঠিন বলে মনে করেন নেতারা।

বিশ্বনাথ ও ওসমানীনগর উপজেলা নিয়ে গঠিত এ আসনে সম্প্রতি সরেজমিনে ঘুরে এ চিত্র পাওয়া যায়। চায়ের আড্ডায়ও উঠে আসে সাধারণ মানুষের নির্বাচনী ভাবনা।

এই আসনে কে জনপ্রিয়, আগামীতে কে এমপি হতে পারেন? এমন প্রশ্নে কামরুল নামে এক তরুণ বলেন, ‘আগে বলেন নির্বাচন কার অধীনে হবে? সুষ্ঠু হবে কি না? সুষ্ঠু নির্বাচন হলে এখানে ধানের শীষ নিয়ে যে নির্বাচন করবে, সেই পাস করবে। কারণ এখানে ইলিয়াস আলী যত উন্নয়ন করেছেন, অন্য কোথাও কেউ করতে পারেনি।’

তার কথায় সুর মেলান ওয়েল্ডিং মিস্ত্রি জাহেদ আহমদও। তিনি বলেন, ‘এখানে ধান নিয়ে যে আসবে সেই পাস করবে। শুধু জানলেই হলো সে ইলিয়াস আলীর লোক।’

শিপন নামে এক ট্রাকচালক বলে ওঠেন, ‘এমপি কী কাজে লাগে? এমপি দিয়ে আমাদের লাভ কী?’

‘কোনো কাজে তার কাছে যান না?’ প্রশ্ন করতেই পাল্টা প্রশ্ন করে বলেন, পাওয়া গেলেই তো যাবো?

ইলিয়াস আলীর বাইরে এখানে কোনো জনপ্রিয় নেতা নেই? কেউ কি মানুষের সুখে-দুঃখে পাশে দাঁড়ায় না? জবাবে খলিলুর রহমান নামে এক ফ্লেক্সি ব্যবসায়ী বলেন, জগলু চৌধুরী (দপ্তর সম্পাদক, সিলেট জেলা আওয়ামী লীগ) এখানে ব্যক্তি হিসেবে জনপ্রিয়। তিনি এলাকায় মানুষের খোঁজ-খবর নেন। তবে দল হিসেবে বিএনপি বেশি জনপ্রিয়। এই এলাকায় ইলিয়াস আলীর পরিবার বা বিএনপির কেউ এলেই পাস।

তবে আড্ডায় এসব মানুষ জানান, সিলেট-২ (বিশ্বনাথ-ওসমানীনগর) আসনে আওয়ামী লীগ-বিএনপির কোনো রেষারেষি নেই। এলাকা শান্তিপূর্ণ।

এখানে আওয়ামী লীগের এই ভঙ্গুর অবস্থা কেন? জবাবে রাজনৈতিক নেতারা বলছেন, এই আসনটিতে এক সময়ে আওয়ামী লীগের শক্ত অবস্থান থাকলেও জোটকে ছেড়ে দেওয়ায় সেটা এখন আর নেই। নেতাকর্মীদের মধ্যে এক ধরনের হতাশা কাজ করে, তারা অনেকে নিষ্ক্রিয়। ভোটাররাও নানান ভাগে বিভক্ত। কেউ কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তে জাতীয় পার্টিকে সমর্থন করে তাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়েছেন। যে কারণে দলের অনেকের কাছে নেতিবাচক হয়ে গেছেন। আবার কেউ দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করে পেয়েছেন বিদ্রোহী তকমা। কেউ গেছেন চুপসে।

অথচ, বিএনপি তার অবস্থান ধরে রেখেছে। বরং, তাদের সমর্থক বেড়েছে। পাশাপাশি এই আসনের সাবেক এমপি ও কেন্দ্রীয় বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী গুম হওয়ার কারণে তার পরিবারের প্রতি এলাকার মানুষের সহানুভূতি কাজ করে। তারা একচেটিয়া ইলিয়াস পরিবারকেই ভোট দিতে মুখিয়ে। এমনকি ওই পরিবারের সমর্থন নিয়ে এলেও যে কেউ এখানে পাস করবে বলে দাবি করছেন ভোটাররা।

এ বিষয়ে জেলা আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক আখতারুজ্জামান জগলু চৌধুরী জাগো নিউজকে বলেন, আমাদের এখানে সাংগঠনিক অবস্থা ভালো নেই। কারণ গত দুবার জোটকে দেওয়া হচ্ছে। ২০১৪ সালে জাতীয় পার্টি ছিল। ২০১৮-তেও তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। কিন্তু পাস করেছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের শরিক গণফোরামের প্রার্থী মোকাব্বির খান। দল (আওয়ামী লীগ) একবারেই শেষ। মান-অভিমান ও প্রচণ্ড রকম ক্ষোভ আছে। তাছাড়া এখানে আগে বিএনপির ইলিয়াস আলী ছিলেন এমপি। তাদের অবস্থান এখনো খারাপ নয়। এখানে আমাদের দলের ২০০৮ সালে ছিলেন জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শফিক সাহেব। তিনি প্রবাসী। তিনিও মনোনয়ন চান। আল্টিমেটলি অন্তর্দ্বন্দ্ব ও কোন্দলের কারণে কারোরই মাঠে অবস্থান নেই। আমরা যারা সংগঠন করছি, এখনো আছি। কিন্তু সাংগঠনিক অবস্থা সুবিধাজনক নয়। গোছানো যাচ্ছে না।

দুবার জাতীয় পার্টিকে দেওয়ায় আওয়ামী লীগ দ্বিধা-বিভক্ত জানিয়ে ওসমানীনগর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আতাউর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, জাতীয় পার্টিকে ছেড়ে দেওয়ায় আওয়ামী লীগের নির্দেশে আমি ছিলাম তাদের পক্ষে, আর আমার সাধারণ সম্পাদক ছিলেন স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষে, ঐক্যবদ্ধ আওয়ামী লীগ কাজ করেনি। ঐক্যবদ্ধ আওয়ামী লীগ কাজ না করলে তো মাঠ থেকে উঠে আসা কঠিন ব্যাপার।

তিনি বলেন, ২০১৪ সালের নির্বাচনে এই আসনটি জাতীয় পার্টিকে দিয়ে বদনাম হয়ে গেছে। কারণ তারা এলাকায় কোনো কাজ করেনি। পরে আবারও ২০১৮ সালে জাতীয় পার্টিকে দেওয়া হয়। প্রার্থীর কার্যকলাপে নাখোশ ছিল ভোটাররা, বিএনপির সমর্থন নিয়ে গণফোরাম পাস করেছে। আগামীতে যদি জাতীয় পার্টি বা গণফোরামকে দেওয়া হয়, তাহলে আওয়ামী লীগ আরও নিষ্ক্রিয় হয়ে যাবে। দীর্ঘদিন ধরে (৯ বছর) আওয়ামী লীগের প্রার্থী না থাকায় উন্নয়ন সীমিত হয়েছে। যেটা তারা পায়, সেটা তাদের দলীয় কার্যক্রম চালিয়ে দলীয় নেতাকর্মীদের জন্য কিছু করার চেষ্টা করে। সাধারণ মানুষের দিকে তাকায় না।

এই নেতার ধারণা, জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও সাবেক এমপি শফিকুর রহমানকে নৌকা দিলে পাস করবেন। উনি সব সময় মাঠে আছেন। অন্য কাউকে দিলে পাস করার সম্ভাবনা কম।

বিশ্বনাথ উপজেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শাহ আসাদুজ্জামান আসাদ জাগো নিউজকে বলেন, ২০১৪ ও ২০১৮- এই দুবারের জাতীয় নির্বাচনে আমাদের দলীয় প্রার্থী না থাকায় ভোটাররা নাখোশ। আমরা হতাশ। তৃণমূল পর্যায়ে আমাদের দল সুসংগঠিত, আমাদের অবস্থান ভালো। এ নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই। আমাদের দলীয় এমপি না থাকায় এলাকা উন্নয়ন বঞ্চিত হচ্ছে। আমাদের সবার দাবি, কেন্দ্র থেকে দলীয়/নৌকার প্রার্থী দিতে হবে। না হয় আমাদের দলের অবস্থা খারাপ হয়ে যাবে।

তিনি বলেন, নৌকা না থাকলে নেতাকর্মীরা কে কোনদিকে যাবে বলা যায় না। গত দুবারও নৌকা না দেওয়ায় কর্মীরা বিভ্রান্ত হয়ে গেছে, দ্বিধা-বিভক্ত হয়েছে। এবার মহাজোটের পক্ষে কোনো কর্মী থাকবে না। আওয়ামী লীগের সমর্থন না থাকলে জোটের প্রার্থী তথা জাতীয় পার্টির লোক এখানে জিতবেও না। কারণ, এখানে তাদের কোনো অবস্থান নেই। জাতীয় পার্টির প্রার্থী ও তার একান্ত কয়েকজন লোক ছাড়া কোনো জনসমর্থন নেই।

জানা যায়, সিলেট-২ আসন থেকে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চাইবেন জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও এই আসনের সাবেক এমপি শফিকুর রহমান চৌধুরী, যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী, জেলা আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক আখতারুজ্জামান জগলু চৌধুরী ও বিশ্বনাথ উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান এবং দুবার স্বতন্ত্র নির্বাচন করে পরাজিত মুহিবুর রহমান।

এছাড়াও বিএনপি থেকে মনোনয়ন চাইবেন ইলিয়াস আলীর পত্নী তাহসিনা রুশদীর (লুনা) এবং তার ছেলে আবরার ইলিয়াস। জোটের প্রার্থী হিসেবে এখানে সাবেক এমপি জাতীয় পার্টির মোহাম্মদ ইয়াহইয়া এবং বর্তমান এমপি বিএনপির নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের মোকাব্বির খান তো আছেনই।

বিশ্বনাথ ও ওসমানীনগর উপজেলা নিয়ে জাতীয় সংসদের ২৩০ নম্বর আসন সিলেট-২। এখানে মোট ভোটার ২ লাখ ৮৬ হাজার ৩৮০। পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৪৪ হাজার ৮৩৫ এবং নারী ভোটার ১ লাখ ৪১ হাজার ৫৪৫।

ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায়, এই আসনটি বিভিন্ন সময়ে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টির দখলে ছিল। আওয়ামী জোট ও বিএনপি জোটের হাতেও ছিল একবার করে। যে কারণে ভোটের হিসাব জটিল। বিভক্ত সমর্থক ও ভোটারদের এক করে জয় নিশ্চিত করা বেশ কঠিন।

নির্বাচন কমিশন সূত্র বলছে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে (২০১৮) জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের মোকাব্বির খান ৬৯ হাজার ৪২০ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী স্বতন্ত্র প্রার্থী মুহিবুর রহমান পান ৩০ হাজার ৪৪৯ ভোট। সেসময় এই আসনে বিএনপির তাহসিনা রুশদীর মনোনয়ন বাতিল হয়।

১০ম সংসদ নির্বাচনে (২০১৪) জাতীয় পার্টির মোহাম্মদ ইয়াহইয়া লাঙল প্রতীকে ৪৮ হাজার ১৫৭ ভোট পান। স্বতন্ত্র থেকে মুহিবুর রহমান আনারস প্রতীকে পান ১৭ হাজার ৩৮৯ ভোট।

৯ম সংসদ নির্বাচনে (২০০৮) আওয়ামী লীগের শফিকুর রহমান চৌধুরী ১ লাখ ৯ হাজার ৩৫৬ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। বিএনপির ইলিয়াস আলী পান ১ লাখ ৬ হাজার ৪০ ভোট।

৮ম সংসদ নির্বাচনে (২০০১) বিএনপির ইলিয়াস আলী ১ লাখ ৩ হাজার ৪৬০ ভোট পান। আওয়ামী লীগের শাহ আজিজুর রহমান পান ৫৫ হাজার ২৯১ ভোট।

৭ম সংসদ নির্বাচনে (১৯৯৬) আওয়ামী লীগের শাহ আজিজুর রহমান ৪২ হাজার ২৬৬ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। জাতীয় পার্টির মকসুদ ইবনে আজিজ লামা পান ৩৯ হাজার ৪৪ ভোট।

৫ম সংসদ নির্বাচনে (১৯৯১) জাতীয় পার্টির মকসুদ ইবনে আজিজ লামা পান ৩৯ হাজার ১৫ ভোট। লুৎফর রহমান খান পান ২২ হাজার ৮৭ ভোট।

এসইউজে/এএসএ/এএসএম

টাইমলাইন  

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।