জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পে ধীরগতি

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৮:২৪ পিএম, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯

প্রতি বছরই জলাবদ্ধতায় চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয় রাজধানীবাসীকে। বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টি হলেই নগরীর অলিগলি ও ছোট পরিসরের রাস্তাগুলোতেও জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। একটু ভারী বর্ষণে প্রতি বছরই ছন্দপতন হয় রাজধানীবাসীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। বর্ষা মানে জলাবদ্ধতার তিক্ত এক অভিজ্ঞতার নাম।

জলাবদ্ধতার তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে মুক্তি পেতে নেয়া হয় নানা প্রকল্প। বেশ কয়েকটি প্রকল্প এখনও চলমান। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আগামী বছরও কি একই চিত্র দেখবে রাজধানীবাসী?

যদিও স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম গত ২১ জুলাই এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, রাজধানীর জলাবদ্ধতা নিরসনে অনেক অগ্রগতি হয়েছে। তবে এ দুর্ভোগ থেকে রাতারাতি মুক্তি সম্ভব নয়। কারণ গত ৪০ থেকে ৫০ বছর ধরে ঢাকা শহরকে দূষিত করা হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ‘এ বিষয়ে উত্তরোত্তর উন্নতি হচ্ছে। তবে একেবারেই শেষ হয়ে যায়নি… সচিবালয়েও আমাদের হাঁটু পরিমাণ পানি হতো। শান্তিনগরে রিকশা বা গাড়ি সবগুলোই ডুবে যেত। এ অবস্থা থেকে উত্তরণ ঘটেছে।’

এত উন্নয়ন-প্রকল্প গ্রহণের পরও রাজধানীর জলাবদ্ধতার কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পানি নিষ্কাশনের পথগুলো আবর্জনায় ভরাট হয়ে থাকা, ড্রেনেজ লাইন নিয়মিত পরিষ্কারের উদ্যোগ না নেয়ায় সামান্য বৃষ্টিতেই তলিয়ে যায় রাজধানীর বিভিন্ন রাস্তা। ভারী বৃষ্টি হলে তাৎক্ষণিকভাবে পানি ধারণের জন্য শহরে উপযুক্ত জলাধার নেই। এছাড়া ভারী বৃষ্টির পানি টেনে নেয়ার পাম্পগুলোর ক্ষমতাও সীমিত।

waterlogging

এসব প্রতিবন্ধকতার কথা মাথায় রেখে গত বছর দুটি প্রকল্পের অনুমোদন দেয় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। ঢাকা ওয়াসার বাস্তবায়নাধীন প্রকল্প দুটি হচ্ছে- ঢাকা মহানগরের ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ ও খাল উন্নয়ন এবং হাজারীবাগ, কুর্মিটোলা, মান্ডা, বেগুনবাড়ি ও বাইশটেকি খালে ভূমি অধিগ্রহণ ও খনন-পুনঃখনন প্রকল্প।

রাজধানীর জলজট নিরসনের অন্যতম দায়িত্ব সেবা সংস্থা ঢাকা ওয়াশার। ঢাকা ওয়াশাও প্রতিবার আশ্বস্ত করে বলে যে, ‘জলাবদ্ধতা নিরসনে আমরা আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।’ কিন্তু গত ২০ জুন দুপুরে এক ঘণ্টারও কম সময়ের বৃষ্টিতে রাজধানীর বেশকিছু এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। এর মধ্যে রাজধানীর ব্যাংকপাড়া হিসেবে খ্যাত মতিঝিল ও দিলকুশায় হাঁটপানি জমে যায়। জলজট দেখা দেয় বঙ্গভবনের পাশের সড়কেও। এ বিষয়ে সেসময় ঢাকা ওয়াসার পরিচালক (কারিগরি) এ কে এম সহিদ উদ্দিন জাগো নিউজকে বলেন, ‘রাজধানীতে যেন জলাবদ্ধতা সৃষ্টি না হয় সে জন্য আমরা কাজ করছি। ওয়াসার ৩৭০ কিলোমিটার পাইপ ড্রেন, ১০ কিলোমিটার বক্স কালভার্ট, চারটি স্থায়ী পাম্পিং স্টেশন এবং ১৬টি অস্থায়ী পাম্পিং স্টেশন আছে। আমাদের কাজ করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি আমরা।’

ওয়াসা সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্প দুটির আওতায় ৩০০ কিলোমিটার স্ট্রর্ম ওয়াটার পাইপ ড্রেন পরিষ্কারের কাজ চলছে। ২৪৯ কিলোমিটার ড্রেনের পরিষ্কারের কাজ কিছুটা অগ্রগতি হয়েছে। সেই সঙ্গে ভারী বৃষ্টিপাত হলে চারটি স্থায়ী ও ১৫টি অস্থায়ী পাম্পের মাধ্যমে পানি অপসারণ করা হবে। আগামী বর্ষা মৌসুমে রাজধানীতে যেন জলাবদ্ধতা না হয়, সেজন্য গত বছর থেকে ১৭টি খালের ৩০ কিলোমিটার খাল পুনঃখনন করছে তারা। পানি যেন দ্রুত ড্রেন দিয়ে চলে যেতে পারে এজন্য ৩০০ কিলোমিটার স্ট্রর্ম ওয়াটার পাইপ পরিষ্কারের কাজ চলছে। রাস্তার পানি যেন দ্রুত পাইপ ড্রেনে প্রবেশ করতে পারে সেজন্য ৭০০টি ক্যাচপিট (নালার ওপরের ছিদ্রযুক্ত ঢাকনা) পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে।

waterlogging

তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত এক বছরে প্রথম প্রকল্পের অগ্রগতি মাত্র ৮ দশমিক ২৫ শতাংশ। আর ১৪ মাসে অন্য প্রকল্পের অগ্রগতি মাত্র দেড় শতাংশ। খাল উন্নয়ন প্রকল্পটির অনুমোদন দেয়া হয় গত বছরের জুলাই মাসে। ৫৫০ কোটি ৫০ লাখ টাকার এ প্রকল্প আগামী বছরের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা।

অপরদিকে খাল খনন-পুনঃখনন প্রকল্পটি চলতি বছরের ডিসেম্বরে মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা। এ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ৬০৭ কোটি ১৬ লাখ টাকা। ২০ মাস মেয়াদের এ প্রকল্পের ১৪ মাসে অগ্রগতি হয়েছে মাত্র দেড় শতাংশ।

কাজের এমন ধীরগতির কারণে জলাবদ্ধতা নিরসনে এত উদ্যোগ যেন বিফলে যাচ্ছে। আগামীতেও জলাবদ্ধতার তিক্ত অভিজ্ঞতা ভোগ করতে হবে- এমন আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।

সম্প্রতি ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএনসিসি) এলাকায় বর্ষায় সৃষ্ট জলাবদ্ধস্থানসমূহ চিহ্নিতকরণ, কারণ অনুসন্ধান, প্রতিকারের উপায় ও সমাধানের কর্মপদ্ধতি নিরূপণের লক্ষ্যে এক আন্তঃসংস্থা সমন্বয় সভা করে ডিএনসিসি। সভায় অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী শরীফ উদ্দিন জলাবদ্ধতায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা, জলাবদ্ধতার কারণ ও সমাধানের উপায় নিয়ে একটি বিস্তারিত পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশন উপস্থাপন করেন। এতে আগামী বছর বর্ষার আগে নগরবাসীকে জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি দিতে ডিএনসিসি মেয়র সকল সংস্থা ও বিভাগকে ডিএনসিসির সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ শেষ করার জন্য অনুরোধ করেন।

আগামী বছর জানুয়ারি মাসের মধ্যে ড্রেনেজ ব্যবস্থা উন্নতকরণ, খাল পুনরুদ্ধার ও পয়ঃনিষ্কাশনের ব্যবস্থা নিশ্চিতের জন্য সংশ্লিষ্ট সকলকেও সে সময় নির্দেশ দেয়া হয়।

waterlogging

ঢাকা ওয়াসা সূত্রে জানা গেছে, মহানগরীর ড্রেনেজ নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ এবং ১৬টি খাল উন্নয়নের মাধ্যমে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মোহাম্মদপুর, শ্যামলী, শেরেবাংলা নগর, দারুসসালাম, মিরপুর, পল্লবী, ক্যান্টনমেন্ট, উত্তরা, বিমানবন্দর এলাকা এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ধানমন্ডি, হাজারীবাগ, শঙ্কর, জিগাতলা, রায়েরবাজার এলাকার জলাবদ্ধতা দূর করাই এ প্রকল্পের প্রধান কাজ। এছাড়া প্রকল্প এলাকায় অবস্থিত বিদ্যমান খালগুলো খনন ও প্রশস্ত করে তীর উন্নয়ন এবং ওয়াকওয়ে নির্মাণের মাধ্যমে খালের দুই তীরের পরিবেশ উন্নত করা এ কাজের অংশ।

কাজের অগ্রগতি প্রসঙ্গে সম্প্রতি ঢাকা ওয়াসার পরিচালক (কারিগরি) এ কে এম সহিদ উদ্দিন বলেন, রাজধানীতে যেন জলাবদ্ধতা সৃষ্টি না হয় সেজন্য আমরা কাজ করে যাচ্ছি। সকলের সহযোগিতায় জলাবদ্ধতা নিরসনে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। কাজগুলো শেষ হলে জলাবদ্ধতা অনেকাংশেই কমে আসবে।

ওয়াসার প্রকল্প দুটির ধীরগতি সম্পর্কে ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাকসিম এ খানের কাছে জানতে চাওয়া হয়। তিনি জানান, সংবাদ সম্মেলন করে প্রকল্প দুটির সর্বশেষ অগ্রগতির বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হবে।

সম্প্রতি জলাবদ্ধতা নিরসনে কালশী থেকে বাউনিয়া খাল পর্যন্ত বাইপাস পাইপ ড্রেন সংযোগের কাজ করছে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন। কালশী এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসনে কালশী থেকে বাউনিয়া খাল পর্যন্ত প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি টাকা ব্যয়ে ১১৮৮ মিটার দীর্ঘ বাইপাস পাইপ ড্রেন সংযোগের উদ্বোধন করা হয়েছে।

অপরদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন তাদের এলাকার পানি নিষ্কাশনে পানি উন্নয়ন বোর্ডের ৫১টি স্লুইস গেট পরিষ্কারের পাশাপাশি জলাবদ্ধতাপ্রবণ এলাকাগুলোয় অস্থায়ী পাম্প বসাতে ঢাকা ওয়াসাকে সুপারিশ করা হয়েছে।

এএস/এমএআর/পিআর