কোকোকে স্মরণ করলেন তামিম
‘কোকো ভাইকে প্রকাশ্যে সম্মান জানানো উচিত ছিল, না পারায় দুঃখিত’
আরাফাত রহমান কোকো। প্রথম পরিচয় তিনি সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কনিষ্ঠ পুত্র। বড় ভাই বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের মতো তিনি রাজনীতি করেননি। ক্রিকেটের সঙ্গে ছিল তার নিবিড় সম্পর্ক। নিজেকে জড়িয়ে রেখেছিলেন ক্রিকেটীয় কর্মকান্ড নিয়ে। ছিলেন ক্রিকেটারও। সমবয়সী ও বড় ভাইয়ের বন্ধুদের সঙ্গে মিলে ক্রিকেট ক্লাব (ওল্ডডিওএইচএস) গঠন করেছেন। সেই ক্লাব ১৯৮৮-১৯৮৯ সাল থেকে কোয়ালিফাই লিগ খেলে ৯০ দশকের প্রথম দিকে দ্বিতীয় বিভাগে ওঠে। আরাফাত রহমান কোকো ছিলেন ছিলেন সেই দলের উইকেটকিপার। এরপর ধীরে ধীরে সেই ওল্ডডিওএইচএস সাফল্যর সিঁড়ি টপকে প্রথম বিভাগ থেকে উঠে যায় ঢাকাই ক্রিকেটের শীর্ষ আসর ‘প্রিমিয়ার লিগে।’
২০০৩ সালে ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে প্রথমবার খেলতে নেমেই বাজিমত করে বসে আরাফাত রহমান ও তার বন্ধু এবং সুহৃদদের নিয়ে গড়া ওল্ডডিওএইচএস। ফুটবল, হকির মতো ঢাকাই ক্রিকেটেও তখন মোহামেডান আর আবাহনীর জয়-জয়াকার। সঙ্গে বিমান, কলাবাগান, ব্রাদার্স, সূর্যতরুণসহ অন্য আর কয়েকটি ক্লাবকে ধরা হতো প্রতিষ্ঠিত শক্তি। প্রথমবার প্রিমিয়ার লিগ খেলতে নেমেই ওল্ডডিওএইচএস লিগ ট্রফি ঘরে তোলে। তারপরও সে সাফল্য বজায় ছিল বেশ কয়েক বছর। ২০০৫-২০০৬ মৌসুমে সেই ওল্ডডিওএইচএসে নাম লেখান আজকের অন্যতম শীর্ষ ক্রিকেট তারকা তামিম ইকবাল।
আজ রোববার ঢাকার লা মেরিডিয়ান হোটেলে সেই আরাফাত রহমান কোকোর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তাই খানিক আবেগাপ্লুত হন তামিম। ক্রিকেটার, ক্লাব সংগঠক থেকে জাতীয় পর্যায়ের ক্রিকেট সংগঠক (বিসিবি পরিচালক ও গেম ডেভোলপমেন্ট চেয়ারম্যান) হিসেবে দারুণ সাফল্য দেখানো আরাফাত রহমান কোকো মেমোরিয়াল ট্রাষ্টের পক্ষ থেকে আজ দেশের ৯ বিশিষ্ট ক্রীড়াবীদকে সন্মাননা জানানোর পাশাপাশি নগদ ১ লাখ টাকা করে পুরষ্কার দেয়া হয়েছে।
জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক হাবিবুল বাশার সুমন, ফুটবল দলের সাবেক অধিনায়ক আলফাজ আহমেদ, নারী ফুটবলার ঋতুপর্ণা চাকমা, জাতীয় নারী দলের পেসার মারুফা আক্তার, হকির নতুন তারকা আমিরুল ইসলাম, ব্যাডমিন্টনের আল আমিন জুমার, আর্চারির অলিম্পিক কোয়ালিফাই মার্কস পাওয়া সাগর ইসলাম, টেবিল টেনিসের খৈ খৈ মারমা আর প্যারা অলিম্পিকে সোনালী সাফল্য পাওয়া চৈতি রানী দে এই পুরষ্কার ও সন্মাননা পান।
সেই অনুষ্ঠানের বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে তামিম ইকবাল অনেক কথার ভীড়ে প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকোর পরিবারের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। তামিম বলেন, ‘এত বছরে তাকে ( আরাফাত রহমান কোকো) নিয়ে যেভাবে প্রকাশ্যে সম্মান জানানো উচিত ছিল, আমি তা করতে পারিনি। সে জন্য আমি তার পরিবারের কাছে ক্ষমাপ্রার্থী।’
তামিম মনে করেন আরাফাত রহমান কোকোর যে স্বীকৃতি ও সন্মান পাওয়া উচিত ছিল, তিনি না পাননি। তাই তামিমের মুখে এই কথা, ‘এখানে অনেকেই আছেন যারা তার (কোকো ভাইকে) সঙ্গে খুব কাছ থেকে কাজ করেছেন। তারা বিষয়গুলো ভালো করেই জানেন। তবে কোনো কিছু বলার আগে আমি কিছুদিন আগে একটি ভিডিও দিয়েছিলাম, সেখানে তার সম্পর্কে কিছু কথা বলেছিলাম। আমি বলেছিলাম, আমি অত্যন্ত দুঃখিত এত বছর তিনি দেশের ক্রিকেটে এত অবদান রাখার পরও আমরা তার প্রাপ্য সম্মান ও স্বীকৃতি দিতে পারিনি। অন্তত আমি তো পারিনি। আমার ভিডিওর মূল বার্তাই ছিল সেটি।’
আরাফাত রহমান কোকোকে দুরদর্শী ক্রিকেট সংগঠক আখ্যা দিয়ে তামিম বলেন,‘অনেকেই অনেক কথা বলবেন। কিন্তু আমি সবসময় তাকে একজন দূরদর্শী মানুষ হিসেবে দেখেছি। বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের জন্য কোন ছোট জিনিসটি প্রয়োজন, কোনটি প্রয়োজন নয়—এসব বিষয় তিনি গভীরভাবে খেয়াল করতেন। আমার এখনো মনে আছে, ২০০২-২০০৩ সালে এখনকার মতো স্পোর্টস ড্রিংক এত সহজলভ্য ছিল না। সেই সময়ই তিনি চিন্তা করতেন কীভাবে এসব আধুনিক স্পোর্টস ড্রিংক দেশে আনা যায়, খেলোয়াড়রা কীভাবে সেগুলো ব্যবহার করবে, এসব নিয়ে তার আলাদা ভাবনা ছিল। বাংলাদেশ ক্রিকেটে তার অবদান অপরিসীম। মিরপুর স্টেডিয়াম থেকে শুরু করে আরও অনেক ক্ষেত্রে তিনি কাজ করেছেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এত বছর তিনি যে সম্মান ও স্বীকৃতি প্রাপ্য ছিলেন, আমরা কেউ তা দিতে পারিনি। এটি সত্যিই খুবই দুঃখজনক।’
তামিম স্বীকার করেন স্বয়ং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াও আরাফাত রহমান কোকোকে নিয়ে আফসোস করতেন।
নিজের বিয়ের কার্ড দিতে গিয়ে বেগম জিয়াকে একান্তে পাবার অভিজ্ঞতা টেনে জাতীয় দলের সাবেক ওপেনার বলেন, আমার এখনো মনে আছে, আমি যখন আমার বিয়ের নিমন্ত্রণপত্র নিয়ে মরহুম বেগম খালেদা জিয়ার কাছে গিয়েছিলাম, তখন বিভিন্ন কথার মধ্যে কোকো ভাইয়ের প্রসঙ্গও উঠেছিল। তিনি খুব আবেগাপ্লুত হয়ে বলেছিলেন, তার সম্পর্কে কেউ তেমন কথা বলে না। সেদিন আমি বলেছিলাম, আমি বলব। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমিও ব্যর্থ হয়েছি। এত বছরে তাকে নিয়ে যেভাবে প্রকাশ্যে সম্মান জানানো উচিত ছিল, আমি তা করতে পারিনি। সে জন্য আমি তার পরিবারের কাছে ক্ষমাপ্রার্থী।
এআরবি/আইএন