তবে কি তামিম ইকবালের কথা মাথায় রেখেই তানজিদ তামিমকে টেস্টে নেওয়া?
তবে কি তামিম ইকবালের কথা মাথায় রেখে কিংবা অবচেতন মনে সিনিয়র তামিমকে কল্পনায় এনেই কি তানজিদ হাসান তামিমকে টেস্ট দলে বেছে নেওয়া? জাগো নিউজের সঙ্গে একান্ত আলাপে সে প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে প্রধান নির্বাচক হাবিবুল বাশার সুমন যা বলেছেন, তার সারমর্ম কিন্তু ঠিক তাই দাঁড়ায়। প্রধান নির্বাচক বললেন, ‘আসলে আমি এমন ধরনের (অ্যাটাকিং) ক্রিকেটারই পছন্দ করি।’
তামিম ইকবালের ব্যাটিং স্টাইল ও ধরন প্রসঙ্গ এনে জাতীয় দলের প্রধান নির্বাচক বলেন, ‘নিশ্চয়ই মনে আছে, তামিম ইকবালও কিন্তু প্রথম বলেই ডাউন দ্য উইকেটে যেতে পারতো এবং অনায়াসে মিডল করে চার কিংবা ছক্কা হাঁকাতে পারতো। অথচ দেখেন, সেই তামিমই আবার তার টেস্টে কী ব্রিলিয়ান্ট পারফরমার। তার টেস্ট ক্যারিয়ার কত সফল। তামিম ইকবালের টেকনিক খুব ভালো ছিল। তাই তো সে ইংল্যান্ডে লর্ডসের পর ম্যানচেস্টারে পরপর দুই টেস্টে সেঞ্চুরি করে।’
তানজিদ তামিমকে নিয়েও অনেক আশা নতুন প্রধান নির্বাচকের। তানজিদ তামিমও টেস্টে ভালো করবেন, সফল হবেন এবং তার ব্যাটিংয়ের উন্নতি ঘটবে; ছোটখাটো ভুল-ত্রুটি কেটে যাবে—এমন প্রত্যাশা সুমনের কণ্ঠে।
তানজিদ তামিম সম্পর্কে জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়কের মূল্যায়ন, ‘তানজিদ তামিমের টেকনিকও ভালো। আমার মনে হয় পজিটিভলি নিলে তানজিদ তামিম ক্যান বি আওয়ার অ্যাসেট।’
তানজিদ তামিমকে এবার পাকিস্তানের বিপক্ষে টেস্ট দলে নেওয়া হয়েছে। অনেকেরই প্রশ্ন—তামিম জুনিয়র কি টেস্টে সিনিয়র তামিম ইকবালের মতো হতে পারবেন? ছোট তামিম সফল হবেন কি হবেন না—তার উত্তর দেবে সময়।
সাদা বলে এরই মধ্যে নিজের মেধা ও প্রজ্ঞার ছাপ রেখে জাতীয় দলে জায়গা মজবুত করে ফেলা তানজিদ তামিম আগামীতে লাল বল মানে টেস্টেও কি ভালো খেলে তিন ফরম্যাটেই নিজেকে জাতীয় দলে অপরিহার্য সদস্য করে তুলতে পারবেন কিনা, তা জানতে খানিক অপেক্ষায় থাকতেই হবে।
তবে সাদা বলে এরই মধ্যে হাত খুলে খেলে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ রেখেছেন তানজিদ তামিম। একদিনের সীমিত ওভারের ক্রিকেটের সাথে এ বাঁহাতি ওপেনারের আগ্রাসী মানসিকতা ও আক্রমণাত্মক, ঝড়ো উইলোবাজি অনেকটাই লাগসই।
ফ্রি শট খেলতে পছন্দ করেন। স্বচ্ছন্দে বিগ হিট ও স্ট্রোক প্লে করতেও পারেন। হোক তা পেস কিংবা স্পিনে—নিজের জোনে পেলে যে কোনো বোলারকেই উইকেটের সামনে ও দুই দিকে উড়িয়ে সীমানার ওপারে পাঠাতে বেশ পারদর্শী তানজিদ তামিম।
এমন এক আগ্রাসী মানসিকতার ওপেনার তামিম ইকবালের মতো শুরুতে ফ্রি খেলে প্রতিপক্ষ বোলারদের চেপে বসতে না দিয়ে রানচাকা সচল রাখতে পারবেন, তাতে বাংলাদেশ প্রথম ঘণ্টা ও সেশনে একদম ব্যাকফুটে না গিয়ে ফ্রন্টফুটে থাকবে। এসব ভেবেই কি তানজিদ তামিমকে টেস্ট দলে নেওয়া?
জাগো নিউজের সাথে একান্ত আলাপে সে প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে প্রধান নির্বাচক হাবিবুল বাশার সুমন অনেক লম্বা-চওড়া ব্যাখ্যা দেওয়ার আগে একটি কথা পরিষ্কার বোঝানোর চেষ্টা করেন। সেটা হলো—তামিম ইকবালও শুধু সাদা বলের প্লেয়ার ছিলেন না; টেকনিক্যালি খুব সাউন্ড ব্যাটসম্যান ছিলেন। একইভাবে তানজিদ তামিমও শুধু সাদা বলের প্লেয়ার নন। তারও ব্যাটিং টেকনিক ভালো। তিনিও পারেন সব শট খেলতে।
তাই বাশারের দৃঢ় কণ্ঠে উচ্চারণ, ‘তানজিদ তামিমকে শুধু সাদা বলের পারফরমার মনে করি না। আমি গত কয়েক বছর ধরেই তাকে ফলো করছি। তার বেশ কিছু ফার্স্ট ক্লাস ম্যাচ আমি দেখেছি। তা দেখে আমার কোনোভাবেই তাকে শুধু লিমিটেড ভার্সনের প্লেয়ার মনে হয়নি। লংগার ভার্সানেও আমি তাকে সমান আস্থা ও স্বচ্ছন্দে খেলতে দেখেছি। ফার্স্ট ক্লাসেও সে দারুণ ব্যাটিং করে, রানও করেছে প্রচুর। আর আমি দেখেছি, তানজিদ তামিম লংগার ভার্সানে রান করলে বড় বড় ইনিংস খেলে—বড় রান করে।’
বাশারের অনুভব ও স্থির বিশ্বাস—কেউ খুব বেশি মেরে খেললেই সে শুধু সাদা বলে সফল হবে, এমন ভাবা ঠিক নয়। তার ধারণা, পৃথিবীতে এমন অনেক ক্রিকেটার আছেন, ছিলেন যারা প্রচুর মেরে ও হাত খুলে খেলতেন, কিন্তু তাদের টেস্ট পরিসংখ্যানও খুব ভালো।
তাই প্রধান নির্বাচকের যুক্তি, ‘আমার ক্রিকেট বোধ, জ্ঞান ও উপলব্ধি থেকে বলতে পারি—যারা অ্যাটাকিং প্লেয়ার, তারা যে শুধুই সাদা বলে সফল তা নয়। অনেক অ্যাটাকিং প্লেয়ার আছে যারা সাদা বলের চেয়ে লাল বলে বেশি সফল। আর তানজিদ তামিম কিন্তু টেকনিক্যালি সলিড প্লেয়ার। এমন নয় যে এলোমেলো ব্যাটিং করে, ব্যাকরণ মেনে খেলে না। তা নয়—টেকনিক্যালি সে ভালো প্লেয়ার। শুধু স্লগ করে বা ইম্প্রোভাইজ করে রান করে এমন নয়। তার হাতে প্রচুর ক্রিকেটিং শট আছে। বেশির ভাগ রান করে ক্রিকেটিং শট খেলেই। তার ক্রিকেটীয় শট খেলার সামর্থ্য ও সক্ষমতা আছে।’
‘এই টাইপের প্লেয়ার লাল বলেও ভালো করার রেকর্ড আছে প্রচুর—বেশি ভালো খেলে। ডেভিড ওয়ার্নার এসেছিল সাদা বলের প্লেয়ার হিসেবে, পরে লাল বলে বেশি সফল হয়েছে। আমি তানজিদ তামিমের কাছ থেকে তেমনটাই আশা করছি। তাই আমার কথা—তাকে এখনই সাদা বলের প্লেয়ারের তকমা গায়ে এঁটে দেওয়া ঠিক না। হি ক্যান বি মোর সাকসেসফুল ইন রেড বল অলসো।’
‘আমরা টেস্ট খেলি অনেক দিন ধরেই। এখন যদি আমরা নিজেদের টেস্ট খেলার ধরন পাল্টাতে চাই, তাহলে আমার মনে হয় তানজিদ তামিমই হতে পারে আইডিয়াল চয়েস—ভেরি গুড অপশন। অ্যাটাকিং ক্রিকেট খেলতে গেলে আপনার অ্যাটাকিং প্লেয়ার লাগবে। তানজিদ তামিম ওই টাইপেরই প্লেয়ার।’
বাশার যোগ করেন, ‘আমরা টেস্ট ম্যাচে তাকে এনেছি অ্যাটাকিং ব্যাটার হিসেবেই। আমরা যদি টেস্টে অ্যাটাকিং ক্রিকেট খেলতে চাই, হি উইল বি দ্য রাইট অপশন। এখনই খেলবে তা না—তাকে লাল বলে থিতু হতে দেওয়ার জন্য কিছু সময় দেওয়া দরকার। আমাদের যদি টেস্ট স্ট্র্যাটেজি চেঞ্জ হয়, তাহলে তানজিদ তামিমের ব্যাটিং সামর্থ্যটা ব্যবহার করতে পারব।’
‘আমরা বাজবল খেলার কথা বলছি না। আপনি যদি অ্যাটাকিং ক্রিকেট খেলতে চান, তাহলে তানজিদ তামিমের মতো অ্যাটাকিং প্লেয়ারই লাগবে। আপনি চাইলেন অ্যাটাকিং ক্রিকেট খেলতে, কিন্তু আপনার সেই ধরনের ক্রিকেটার না থাকলে কোনো লাভ হবে না—আপনি পারবেন না অ্যাটাকিং ক্রিকেট খেলতে।’
‘আমি কনফিডেন্ট—লাল বলে খেললে তানজিদ তামিম আরও সফল হবে। আর এখন সাদা বলে সে মাঝে মাঝে একটু তড়িঘড়ি করে মারতে গিয়ে দৃষ্টিকটুভাবে আউট হয়। দেখবেন, লাল বলে বেশি খেললে সে আরও সতর্ক ও সাবধানী হবে। তার টেকনিকটা আরও সমৃদ্ধ হবে এবং সেটা তার ব্যাটিং ক্যারিয়ারে অনেক বেশি সাহায্য করবে বলে আমার মনে হয়।’
এআরবি/এমএমআর