সাফল্যের বীজ অঙ্কুরিত হয়েছে তামিম-সাকিবের ব্যাটেই

আরিফুর রহমান বাবু
আরিফুর রহমান বাবু আরিফুর রহমান বাবু , বিশেষ সংবাদদাতা
প্রকাশিত: ০৫:৪১ পিএম, ২৩ জুলাই ২০১৮

‘ইশ! তামিম আর সাকিব এত স্লো খেলছেন কেন? তারা কি দলের কথা ভাবছেন না? হাতে উইকেট আছে পর্যাপ্ত, তারপরও কেন নিজেদের গুটিয়ে রাখছেন? হাত খুলে খেলছেন না। কখন মারবেন, ওভার যে সব শেষ হয়ে যাচ্ছে! নাকি তারা নিজের জন্য খেলছেন। ব্যর্থতা ঢাকতে দলের কথা না ভেবে নিজে বড় ইনিংস সাজানোর চেষ্টায় লিপ্ত’- রোববার রাতে খেলা চলাকালীন এমন কথার তুবড়ি ছুটেছে বার বার।

আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কথা বোধ হয় না বলাই ভালো। ফেসবুকে তামিম ও সাকিবকে রীতিমতো আসামির কাঠ গড়ায় দাঁড় করানোর চেষ্টায় ছিলেন কেউ কেউ।

আর শেষদিকে মুশফিকুর রহীমের ফ্রি স্ট্রোক প্লে’ দেখে ওই তামিম ও সাকিব বিরোধীরা আরও নড়ে চড়ে বসেন। বলতে থাকেন, কিসের উইকেট স্লো? কে বললো, বল থেমে বা দেরি করে ব্যাটে আসে? হাত খুলে শটস খেলা যায় না? ফ্রি স্ট্রোক প্লে সম্ভব না? এই যে মুশফিক নেমেই যাকে তাকে যেখান দিয়ে খুশি সেখান দিয়ে সীমানার ওপারে পাঠাচ্ছেন! কই এখন তো মনে হয় না উইকেট স্লো। তাহলে এতক্ষণ তামিম-সাকিব কেন এত রয়ে-সয়ে খেললেন? ক্যারিবীয় বোলারদের ওপর চড়াও হলেন না কেন? নিশ্চয়ই সেটা শুধুই নিজেদের মুখ রক্ষার জন্য!

বাংলাদেশ ইনিংস শুরুর মিনিট তিরিশ পর থেকে শুরু হওয়া ওই কথোপকথন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে স্ট্যাটাস, কমেন্ট চলেছে প্রায় মধ্যরাত পর্যন্ত। কিছু কথা, কানে লাগে। কাটার মতো বিঁধে; কিন্তু কাল তামিম-সাকিব বিরোধী সংলাপগুলো ছিল খুবই মুখরোচক! তামিম ১৬০ বলে করেছেন ১৩০। স্ট্রাইকরেট ৮১.২৫। সব ফরম্যাটেই যার ব্যাট খোলা তরবারি, যিনি উইকেটের চারিদিকে বেপরোয়া, উচ্চাভিলাসী আর ঝুঁকিপূর্ণ শটস খেলতে বেশি পছন্দ করেন, সেই সাকিবও অস্বাভাবিক মন্থর! (১২১ বলে ৯৭, স্ট্রাইকরেট ৮০.১৬)। সেখানে মুশফিক যেন ‘হ্যারিকেন’, ৩০০.০০ স্ট্রাইকরেটে ১০ বলে ৩০ রান।

সুতরাং, কারো কারো কাছে মনে হয়েছে, নাহ উইকেট স্লো ছিল না। ঠিকই ছিল। শটস খেলা আর ফ্রি স্ট্রোক প্লে, চার-ছক্কার ফুলছঝুড়ি ছোটানোও মোটেই কঠিন কাজ ছিল না। শুধু সাহস আর ইচ্ছে থাকলেই চলতো। তাদের ভাষায়, কালকে গায়নার প্রোভিডেন্সে সেই সাহস আর ইচ্ছেটাই ছিল না তামিম ও সাকিবের।

আসলে কি তাই? সত্যিই উইকেট সহজ ছিল? প্রোভিডেন্সে যে পিচে খেলা হয়েছে, সেটা কি আসলেই আদর্শ ওয়ানডে উইকেট? তামিম-সাকিব ভয়ে-ডরে, নিজেকে খোলসে আটকে রেখেছিলেন? আর সেট হবার পরও দলের কথা না ভেবে নিজেরা রান করতে গিয়ে গতিতে ব্যাট চালিয়েছেন?

নাহ, মোটেই তেমন নয়। উইকেট কোনোভাবেই সহজ ছিল না। আদর্শ ওয়ানডে বলতে যা বোঝায়, তাও ছিল না। বল পিচ পড়ে থেমে ব্যাটে এসেছে। কখনো একটু আধটু সুইং করেছে। কিছু ডেলিভারি স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি টার্নও করেছে।

বাংলাদেশ সময় রোববার দিবাগত রাত পেরিয়ে সোমবার ভোরে সাংবাদিকের সাথে আলাপে তামিম ইকবাল বলেই ফেলেছেন, ‘যখন ব্যাটিং করতে আসি, এটা মোটেই সহজ উইকেট ছিল না। আমাদের শক্তিশালী অবস্থানে যেতে কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছে। আমার মনে হয়, প্রথম ২৫ ওভার সত্যিই অনেক কঠিন ছিল। বল টার্ন করছিল এবং ফাস্ট বোলাররাও সাহায্য পাচ্ছিল। তাই আমাদের প্রাথমিক পরিকল্পনা ছিল, যতটা সম্ভব সময় ক্রিজে টিকে থাকা এবং যত বেশি সময় সম্ভব খেলে যাওয়া। এবং সেটা স্কোরবোর্ডের দিকে না তাকিয়ে। আমাদের মনে মনে একটা লক্ষ্য ছিল। মনে হয়, শেষ দিকে মুশফিকের ব্যাটিংয়ে আমরা আসল লক্ষ্যটা পার করে ২০ রান বেশি করতে পেরেছি।’

তামিমের শেষ কথাটি লক্ষ্য করুন! মুশফিকের ব্যাটিংয়ে আমরা আসল লক্ষ্য পার হয়ে ২০ রান বেশি করতে পেরেছি। যেহেতু শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের স্কোর গিয়ে ঠেকেছে ২৭৯-তে। আর তামিম বলেছেন, আমরা প্রত্যাশার চেয়ে ২০ রান বেশি করেছি। তার মানে তাদের লক্ষ্য ছিল ২৫০ থেকে ২৬০ রান। অর্থাৎ মুশফিক যদি শেষ দিকে ৩০০’র বদলে ১০০.০০ স্ট্রাইকরেটে ১০ বলে ১০ রানও করতেন তাহলে বাংলাদেশের রান দাঁড়াতো ২৫৯।

সেটা অন্য উইকেট, কন্ডিশন বা পরিবেশ-প্রেক্ষাপটে স্লথ-মন্থর মনে হলেও গায়ানার প্রোভিডেন্সের ইতিহাস ও পরিসংখ্যানের আলোকে স্লথ তো নয়ই, বরং একদম ঠিক ও সময়োচিত। প্রোভিডেন্সের মাঠে ওয়ানডেতে প্রথম ইনিংসের গড় রান ২৩১। গড়পড়তা দ্বিতীয় ইনিংসের স্কোর ১৯৫।

এই মাঠে ২০ ওয়ানডেতে ১২ বার আগে ব্যাটিং করা দল জিতেছে। আর রান তাড়া করে জেতার রেকর্ড আটবার। যদিও তিনটি দল তিনবার ৩০০ প্লাস রান করার রেকর্ড আছে। তারপরও এ মাঠে হওয়া ২০ ওয়ানডের গড়পড়তা রান ২৩০ থেকে ২৬০ প্লাস। ব্যাটিংয়ের ধরণ দেখে পরিষ্কার মনে হয়েছে, তামিম ও সাকিব তা খুব ভালো জানতেন। তারা উইকেটের চরিত্র এবং এই মাঠের পরিসংখ্যান জেনে বুঝেই হিসেব কষে খেলেছেন।

কাজেই তামিম ও সাকিবের ব্যাটিংকে যারা স্লথ ভেবে ভর্ৎসনা করেছেন, ব্যঙ্গোক্তির তুবড়ি ছুটিয়েছেন, তারা ভুল করেছেন। এতে করে তামিম ও সাকিবের সত্যিকার অবদান ঢাকা পড়ার উপক্রম হয়েছিল। দেশ সেরা ওপেনার তামিম আর টিম বাংলাদেশের প্রাণ ভোমরা সাকিব যে দলের কথা ভেবে নিজেদের স্বভাবসূলভ ব্যাটিং বাদ দিয়ে উইকেটের চরিত্র বুঝে, গতি-প্রকৃতি ঠাউরে স্বভাববিরোধী ব্যাটিং করেছেন- তা শুধু প্রশংসারই দাবিদার নয়। তাদের যে ব্যাটিংকে খালি চোখে স্লথ ও স্বার্থপরতা বলে মনে হয়েছে সেটা পরিবেশ-প্রেক্ষাপট তথা রোববারের ম্যাচের কন্ডিশন অনুযায়ী শতভাগ সঠিক। সময়োচিত ও কার্যকর। যার পরতে পরতে ছিল দায়িত্ব সচেতনতা।

তামিম ও সাকিব জানতেন, ‘উইকেট স্লো। বল আসছে থেমে থেমে। যতটা সম্ভব দেরিতে খেলাই হবে যুক্তিযুক্ত। এ উইকেটে দলকে অযথা তাড়াহুড়ো করা হবে আত্মহত্যার সামিল। তেড়েফুঁড়ে শটস খেলতে যাওয়ায় থাকবে রাজ্যের ঝুঁকি। বল দেরিতে এসে বিভ্রান্তির কারণ হবে। উইকেটগুলো অকাতরে হারিয়ে যাবে। তারচেয়ে আমরা যতটা সময় পারি উইকেটে টিকে থাকি।’ তামিম-সাকিবের এই চিন্তার ফসল ২০৭ রানের বড় পার্টনারশিপ।

তাতে করে দ্বিতীয় ওভারে ১ রানে প্রথম উইকেট হারানো বাংলাদেশের ৪৫ ওভার পার হবার পরও আট উইকেট ছিল অক্ষত। ক্রিকেটের অলিখিত কিন্তু দারুণ কার্যকর ফর্মুলা- হাতে বেশি উইকেট থাকা আর একদিকে একজন ওয়েল সেট ব্যাটসম্যান ক্রিজে থাকা মানেই শেষ দিকে রানের গতি দ্রুত হওয়া। হয়েছেও তাই। শেষ দিকে আট উইকেট অক্ষত থাকা বাংলাদেশ ৩৩ বলে ২০০ প্লাস স্ট্রাইকরেটে তুলেছে ৭১ রান। শেষ দিকে মুশফিকুর রহীম একাই ১০ বলে করেছেন ৩০ রান।

মুশফিকের কৃতিত্ব এতটুকু ছোট না করে বলতে হয়, ৪৫ ওভার শেষে অপরপ্রান্তে একজন সেঞ্চুরিয়ান পার্টনার থাকলে আর ৮ উইকেট হাতে থাকলে এমন সাহসী উইলোবাজি করাই যায়! বরং সেটাই যুক্তিযুক্ত। এমন ঝড়ো ব্যাটিংয়ের আদর্শ ও অনুকূলতম ক্ষেত্র। আর তামিম ও সাকিব সেই আদর্শ প্লাটফর্মই রচনা করেছেন। কাজেই সমালোচনা, ভৎসনা নয়- তাদের পাওনা সর্বোচ্চ প্রশংসা।

ধরা যাক, তামিম আর সাকিব ১০০ থেকে ১২৫.০০ স্ট্রাইকরেটে হাত খুলে ৩০ থেকে ৫০’এর ঘরে আউট হয়ে যেতেন। তাহলে কি হতো? তামিম ৮১.২৫ স্ট্রাইকরেটে ১৬০ বলে ১৩০-এর বদলে ৫০ কিংবা ৫৫ বলে হাফ সেঞ্চুরি করেই আউট হয়ে যেতেন। আর সাকিব ৩০ থেকে ৩৫ বলে ৪০ প্লাস রানের একজোড়া ইনিংস উপহার দিয়ে সাজঘরে। তাহলে কি হতো? এনামুল (০), সাব্বিরের (৪ বলে ৩) যে অনুজ্জ্বল অবস্থা, তখন কি অবস্থা দাঁড়াতো? মুশফিক আর মাহমুদউল্লাহ রিয়াদকে তখন সব দায় দায়িত্ব নিয়ে খেলত হতো। তখন দেখা যেত অনেক কঠিন সংগ্রামের পরও রান দাঁড়াতো ২২০ থেকে ২৩০।

এ উইকেটে হয়তো তারপরও জেতার সম্ভাবনা থাকতো। মাশরাফির বোলিংয়ে ছিল সে আলোকবর্তিকা; কিন্তু কাল যেভাবে প্রায় নির্ভার জয় ধরা দিয়েছে, তা কি আর দিতো? লক্ষ্য ছোট থাকলে, প্রতিপক্ষ তো এমনিতেই উজ্জীবিত থাকতো এবং তাদের খেলার ধরণটাও হতো ভিন্ন। ২০১৪ সালে গ্রানাডার সেন্ট জর্জে ২২০ রানের লক্ষ্য নিয়ে খেলতে নেমে যেভাবে জিতে গিয়েছিল ক্যারিবীয়রা, তেমন ঘটনাই ঘটতে পারতো রোববার গায়ানার প্রোভিডেন্স স্টেডিয়ামে।

সুতরাং, ক্রিকেট না বুঝে ভক্ত-সমর্থকদের একাংশ যত সমালোচনাই করুন না কেন, দিন শেষে তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজের প্রথম ম্যাচে বাংলাদেশের জয়ের যৌথ রূপকার তামিম ইকবাল এবং সাকিব আল হাসানই। তাদের অসাধারণ দৃঢ়তা আর ইস্পাত কঠিন সংগ্রামের ফলেই এলো অসাধারণ এই জয়।

এআরবি/আইএইচএস/আরআইপি

আপনার মতামত লিখুন :