বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে দ্রুত গতির বোলার মাশরাফি না অন্য কেউ?

আরিফুর রহমান বাবু
আরিফুর রহমান বাবু আরিফুর রহমান বাবু , বিশেষ সংবাদদাতা
প্রকাশিত: ০৫:০৪ পিএম, ০৪ মে ২০২০

বাংলাদেশের পেসারদের মধ্যে কার বলের গতি বেশি? এদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে সব সময়ের সবচেয়ে দ্রুত গতির বোলার কে?

প্রশ্নটা করলে বর্তমান প্রজন্মের কাছে এখন যারা দেশের হয়ে টেস্ট, ওয়ানডে আর টি-টোয়েন্টি খেলেন, তাদের বলে গতি কম বেশি সবারই জানা আছে। এখন বাংলাদেশের ‘কুইক’ বোলারদের তালিকায় তিনটি নাম আসবে সবার আগে; তাসকিন আহমেদ, রুবেল হোসেন আর ইবাদত হোসেন। তারা যে জোরে বোলিং করেন, তা এখন স্পিড মেশিনই বলে দেয়।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে কোন বোলারের কোন ডেলিভারির গতি কত ছিল, তা স্পিড মিটারই নির্ণয় করে দেয়; কিন্তু দেশের মাটিতে যখন ঘরোয়া ক্রিকেট হয়, প্রিমিয়ার লিগ, জাতীয় লিগ, বিসিএলে কোন বোলারের বলে গতি কত ওঠে? তা জানা অনেকটাই দুরহ কাজ। সোজা কথায়, জানা কঠিন।

সুতরাং, আগের প্রজন্মে তথা ৭০, ৮০ আর ৯০- এর দশকে কে কত জোরে বল করতেন তা বের করা তো আরও কঠিন। তবে ৭০ দশকে মোবারককেই ধরা হতো সবচেয়ে দ্রুত গতির বোলার। ওই সময়ে ঢাকা তথা বাংলাদেশের ঘরোয়া ক্রিকেট পাখির চোখে পরখ করা ক্রিকেট কোচ, বিশেষজ্ঞ জালাল আহমেদ চৌধুরীর চোখে মোবারকই স্বাধীনতার পর ৭০ দশকে সবচেয়ে জোরে বল করতেন। তবে তার বোলিং অ্যাকশন নিয়ে ছিল সংশয়। অনেকেরই ধারনা তার বোলিং অ্যাকশন ঠিক ছিল না। তার বিপক্ষে চাকিংয়ের অভিযোগ ছিল। এ কারণেই তাকে ডাকা হতো ‘টোক্কা মোবারক’ নামে।

Mash

ঢাকাই ক্রিকেটের প্রথম এক যুগের অনেক ঘটনার নীরব সাক্ষী সাবেক স্কোরার ও দেশ বরেণ্য সাংবাদিক কাশিনাথ বসাকও তাই মনে করেন। কাশিনাথ বসাকের চোখেও টোক্কা মোবারকই স্বাধীনতার পর সবচেয়ে দ্রুত গতির বোলার ছিলেন। তারপর গোলাম নওশের প্রিন্স, জিয়াউল ইসলাম মাসুদ, দিপু রায় চৌধুরী এবং আইয়ুবকেও ধরা হয় দ্রুত গতির বোলার হিসেবে।

শেষ পর্যন্ত এদের সবাইকে ছাপিয়ে গেছেন মাশরাফি বিন মর্তুজাই। তিনিই স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের সবচেয়ে দ্রুত গতির বোলার। ক্যারিয়ারের প্রথম দুই থেকে তিন বছর মাশরাফি নিয়মিত ১৪০ থেকে ১৪৫ কিলোমিটার গতিতে বল করতেন।

সেই ৭০-এর দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে ঢাকার ক্লাব ক্রিকেট শুরু করে যিনি দুই যুগের বেশি সময় ধরে বংলাদেশের টপ লেভেলে কোচিং করে আসছেন, টাইগারদের সেই অভিষেক টেস্টের কোচ সারোয়ার ইমরান মনে করেন, মাশরাফি বিন মর্তুজাই তার দেখা সবচেয়ে দ্রুত গতির বোলার।

আজ (সোমবার) জাগো নিউজের সাথে এ নিয়ে কথা বলেন কোচ সারোয়ার ইমরান। তিনি বলেন, মাশরাফি ক্যারিয়ার শুরুর পর অন্তত দুই-তিন বছর প্রচন্ড গতিতে বল করেছে, যা আর কেউ করতে পারেনি। আমার ধারণা ওই সময় মাশরাফি গড়-পড়তা ৯০ মাইল গতিতে বল করতো। যা প্রায় ১৪৫ (১৪৪.৮৪১) কিলোমিটার।

Mash

সারোয়ার ইমরানের ধারণা, ‘একদম শুরুতে মাশরাফির যত জোরে বল করেছে, আর কারো পক্ষে এত দ্রুত গতিতে বল করা সম্ভব হয়নি। হালের ইবাদত, রুবেল আর তাসকিনরাও জোরে বল করেন- এমনটা উল্লেখ করতেও ভুল হয়নি সারোয়ার ইমরানের। তবে তার কথা, তারা কেউই ‘সেরা সময়ের মাশরাফির মত নয়। মাশরাফি সন্দেহাতীতভাবেই অনেক জোরে বল করতো এবং গতি যে কারো চেয়ে বেশি ছিল।’

হাবিবুল বাশারও সারোয়ার ইমরানের সুরেই কথা বলেছেন। জাতীয় দলের এই সাবেক অধিনায়ক ও বর্তমান নির্বাচক হাবিবুল বাশারের চোখে মাশরাফিই সবচেয়ে দ্রুত গতির বোলার। একসময় তার বলে ভয়ঙ্কর গতি ছিল। যা এখনকার মাশরাফিকে দেখে মোটেই বোঝার উপায় নেই।’

জাতীয় লিগে এক সঙ্গে খুলনার হয়ে খেলেছেন। জাতীয় দলে মাশরাফির অভিষেকই তার চোখের সামনে। যে সফরে মাশরাফি বল হাতে আগুন ঝরিয়েছেন, সেই ২০০১ সালে নিউজিল্যান্ড সফরের মাশরাফির বোলিংয়ের প্রসঙ্গ টেনে হাবিবুল বাশার বলেন, ‘আমি স্লিপে দাঁড়িয়ে খুব কাছ থেকে দেখেছি কি অস্বাভাবিক গতিকে বল করেছে মাশরাফি। ভয়ঙ্কর পেস ছিল তখন তার বলে।’

Mash

সেই সফরের একটি প্রস্তুতি ম্যাচের প্রসঙ্গ টেনে হাবিবুল বাশার বলেন, ‘২০০১ সালে মাশরাফি নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্টের স্পেলে চার উইকেটের পতন ঘটিয়েছিল। আমি নিজে স্লিপে দাঁড়িয়ে কিউই ব্যাটসম্যানদের রীতিমত ভয় পেতে দেখেছি। ভয়ের কারণ ছিল মাশরাফির অস্বাভাবিক গতি। ওই সফরে এক প্রস্তুতি ম্যাচে মাশরাফির বলে হেলমেট থাকার পরও নিউজিল্যান্ডের এক ফাস্ট ক্লাস ক্রিকেটারের কপালে ফেটে যায়। আমরা গিয়ে দেখি বল লেগে কপালের সামনের অংশটা ভেতরে চলে গেছে। আর তীরের ফলার আঘাতের মত রক্ত ঝরছে। সত্যি বলতে কি আমার দীর্ঘ ক্রিকেট ক্যারিয়ারে ক্রিকেট পিচে আমি কখনো এত রক্ত দেখিনি। ওই ব্যাটসম্যানের অবস্থা দেখে ভয়ই পেয়েছিলাম। মনে করছিলাম ভদ্রলোক বুঝি আর বাঁচবেন না। আল্লাহর রহমতে তিনি পরে সেড়ে উঠেছেন।’

এতো গেল ম্যাচের মাশরাফির কথা; কিন্তু জানেন নেটের মাশরাফি ছিল আরও ভয়ঙ্কর! আরও জোরে বল করত! হাবিবুল বাশার বলেন, ‘সত্যি বলতে কি, ম্যাচে খেলতে গেলে তেমন ভয় লাগে না। তবে নেটে যেহেতু বোলার তার সর্বশক্তি দিয়ে বল ছোড়েন, তাই বল একটু জোরেই আসে। আমার খেলা নেটে মাশরাফিই সবচেয়ে জোরে বল করতো। সত্যি বলতে কি, আমার ভয়ই লাগতো। ম্যাচে অনেক দ্রুত গতির বোলারের বল খেলেছি, তাদের মধ্যে মাশরাফির বলেই ছিল প্রচন্ড গতি। স্বর্ণ সময়ের মাশরাফির বিপক্ষে নেটে ব্যাট করতে আমি রীতিমত ভয়ই পেতাম।’

মাশরাফিকে রিয়্যাল কুইক বোলার উপাধি দিয়ে হাবিবুল বাশার বলেন, ‘আমার দেখা ও খেলা দেশি বোলারদের মধ্যে মাশরাফিই ছিল, রিয়্যাল কুইক বোলার। যা এখনকার মাশরাফিকে দেখে কেউ স্বপ্নেও ভাবতে পারবে না; কিন্তু শুরুর দিকে এই মাশরাফির বলে কি ভয়ঙ্কর গতি ছিল, তা আমরা যারা খেলেছি, স্লিপে দাঁড়িয়ে দেখেছি তারাই জানি। বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের পুরো অংশ আমার দেখা হয়নি। তবে ২০০১ সালে মাশরাফির অভিষেকের পর থেকে তার চেয়ে জোরে কাউকে বল করতে দেখিনি। ’

এআরবি/আইএইচএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]