‘কপালটাই খারাপ, দল থেকে বাদ পড়লাম করোনাও শুরু হলো’

আরিফুর রহমান বাবু
আরিফুর রহমান বাবু আরিফুর রহমান বাবু , বিশেষ সংবাদদাতা
প্রকাশিত: ১০:০৩ পিএম, ২৮ এপ্রিল ২০২১

বাংলাদেশের ক্রিকেটে ফ্রি-স্ট্রোক খেলায় দক্ষ পারফরমার খুব কম। হাতে গোনা ফ্রি-স্ট্রোক মেকারদের অন্যতম তিনি। ক্রিকেট ব্যাকরণের প্রায় সব শটই আছে হাতে; কিন্তু এখন জাতীয় দলেই নেই। জাতীয় দলের বাইরে কাটছে যার সময়।

ঠিক ধরেছেন। তিনি আর কেউ নন, সাব্বির রহমান রুম্মন। রাজশাহীর ২৮ বছরের উচ্ছ্বল যুবার সামর্থ্য নিয়ে প্রশ্ন নেই কারোরই। তবে মাঝে শৃঙ্খলা ভঙ্গ আর মাঠের বাইরের নানা অঘটনের সাথে জড়িত হওয়ায় ক্যারিয়ার হঠাৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে গেছে।

যদিও সামর্থ্যের প্রতি শতভাগ আস্থা ও বিশ্বাসী সাব্বির রহমান তাকিয়ে আছেন ঘরোয়া ক্রিকেটের দিকে। স্থির বিশ্বাস, দেশের ক্রিকেট মাঠে গড়ালে আবার নিজেকে মেলে ধরবেন। সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়ে আবার জায়গা করে নেবেন জাতীয় দলে। করোনার প্রচণ্ডতার মধ্যেও নিজ শহর রাজশাহীতে নীরবে-নিবৃতে খুব ভালভাবে নিজেকে প্রস্তুত করছেন সাব্বির। লক্ষ্য আগামীতে জাতীয় দলে ফেরা।

আজ (বুধবার) জাগো নিউজের সাথে একান্ত আলাপে সে সব কথাই জানালেন এই ড্যাশিং ব্যাটসম্যান।

জাগো নিউজ : হ্যালো সাব্বির কেমন আছেন?

সাব্বির : আসসালামু আলাইকুম। ভাল আছি। আলহামদুল্লিল্লাহ।

জাগো নিউজ : কোথায় আছেন?

সাব্বির : আব্বা, আম্মা আর স্ত্রীকে নিয়ে রাজশাহীতে আমাদের নিজেদের বাসায় আছি।

জাগো নিউজ : আপাততঃ যেহেতু জাতীয় দলের বাইরে, করোনা ও লকডাউনে সব বন্ধ। কিভাবে সময় কাটছে আপনার?

সাব্বির : আসলে করোনার এ মহামারি তো গত দু’ বছর ধরেই চলছে। গত রোজাতেও ছিল। কবে যাবে আল্লাহই জানেন। এর মধ্যে মাঝখানে কিছু খেলার সুযোগ পেয়েছিলাম। এখন আবার করোনার প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় খেলা, প্র্যাকটিস সব বন্ধ।

এখন আসলে নানা কারণেই ঘরের বাইরে যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ। আপনার নিজের জীবন, পরিবার পরিজনের স্বাস্থ্য ঝুঁকির কথা চিন্তা করে আসলে কোথাও যাবার অবকাশও নেই। তাই ঘরে থেকেই যতটুকু সম্ভব করে যাচ্ছি।

রানিং সেশনটা করছি বাসাতেই। জিমওয়ার্ক তথা ফিজিক্যাল ট্রেনিংটাও চলছে বাসায়। ছোটখাট একটা জিম বানিয়েছি বাসার মধ্যে। ফিটনেস ধরে রাখতে হবে। নিজেকে ফিট রাখা ছাড়া উপায় নেই। তাই রানিং সেশনটা করছি। মোট কথা, ফিটনেসের কাজটা করে যাচ্ছি। আর আগে ছোটবেলায় বল ঝুলিয়ে যে প্র্যাকটিসটা করতাম সেটাও চালিয়ে যাচ্ছি। ব্যাটে বলে টাচ রাখার জন্য, তাই এটা করছি।

জাগো নিউজ : ঢাকা শহরে অভিজাত এলাকায় ফ্ল্যাটে থাকলে তো আর রানিং করার সুযোগ পেতেন না। পার্কে বা রাস্তায় ছুটতে হতো। যেহেতু রাজশাহী শহরে আপনার বাসা, সেটা কি বাড়তি সুবিধা?

সাব্বির : ঢাকাতে ফ্ল্যাট বাড়িতে তো আর আপনি রানিংয়ের জায়গা পাবেন না। এখানে রাজশাহীতে আমাদের বাসা আল্লাহর রহমতে বেশ বড় এলাকা নিয়ে। বাড়তি জায়গা আছে রানিং করার। জায়গাটা করা আছে। কিছু গাছপালা, বাগান আছে। রানিংয়ের জায়গাও সেট করাই আছে। কাজেই সমস্যা হয় না। রানিংটা বাসাতেই সারছি।

জাগো নিউজ : এই সেদিন জাতীয় দল ওয়ানডে আর টি-টোয়েন্টি খেলে আসলো নিউজিল্যান্ডে। সেখানে ছিলেন না, এখন টিম খেলছে শ্রীলঙ্কায়- সেখানেও নেই সাব্বির। কেমন লাগছে?

সাব্বির : অবশ্যই খারাপ লাগে। মনে হলে ইমোশনাল হয়ে যাই। অন্যরকম খারাপ লাগায় আচ্ছন্ন হয় মন। তবে আমি ব্যাপারটাকে একটু অন্যভাবে দেখতে চাই। এই দলের বাইরে থাকা এবং হতাশ না হয়ে ভিতরে দুঃখবোধ জাগ্রত করার চেয়ে এটাকে এক নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছি আমি।

এ চ্যালেঞ্জ আবার দলে ফেরার। সাধারণতঃ যারা ন্যাশনাল টিম থেকে বাদ পড়ে, তারা ডমিস্টিকে একটু ভাল পারফর্ম করেই আবার দলে ফেরে; কিন্তু আমার কপালটা একটু খারাপ যে, আমিও জাতীয় দল থেকে বাদ পড়লাম, করোনার প্রকোপও শুরু হলো। করোনার ভয়াবহতায় ঘরোয়া ক্রিকেট বন্ধ। এনসিএল শুরু হয়েই দুই রাউন্ড পর বন্ধ। প্রিমিয়ার লিগ হচ্ছে না। বিপিএলও হয়নি। কাজেই ফেরার সব প্লাটফর্ম বন্ধ। আশায় আছি, ঘরোয়া ক্রিকেট শুরু হলে নিজেকে মেলে ধরবো। ইনশাল্লাহ ভাল খেলে আবার কামব্যাক করবো। এটাই আমার প্ল্যান।

জাগো নিউজ : দলে ফেরার ব্যাপারে নিজের ওপর আস্থা কতটা?

সাব্বির : অবশ্যই আস্থা আছে। নিজের সামর্থ্যের ওপর আমার শতভাগ আস্থা আছে। বলতে পারেন, ১০০ তে ১০০। যদি খেলা ঠিকঠাকমত হয়, ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ, বিপিএল এবং প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট যদি ঠিকমত মাঠে গড়ায় তাহলে ইনশাল্লাহ আমি পারফর্ম করেই দলে ফিরবো।

জাগো নিউজ : সাব্বিরের ক্রিকেট ক্যারিয়ারের দুটি সুখ স্মৃতি বা সাফল্যের ঘটনা কী মনে আছে?

সাব্বির : আমার সবচেয়ে সুখের স্মৃতি হলো ২০১৬ সালের এশিয়া কাপে শ্রীলঙ্কার সাথে ম্যাচটি। সেটা আমার মনে বিশেষ জায়গা করে আছে। টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটের এশিয়া কাপের ওই ম্যাচে আমি ৮০ রান করেছিলাম (৫৪ বলে)। সে ইনিংসটি ভাল লাগার খুব। অনেক সময় ওই ম্যাচের ভিডিও দেখি আমি। এছাড়া বিপিএলে সেঞ্চুরিসহ ১২২ করেছিলাম এক ম্যাচে। সেটাও মনের আয়নায় জ্বলজ্বল করে।

জাগো নিউজ : আপনি তো শততম টেস্টেও দলে ছিলেন। এবার দল ভাল খেললো, অথচ আপনি নেই। কতটা খারাপ লেগেছে?

সাব্বির : অবশ্যই খারাপ লেগেছে। খারাপ লাগার একটি বিশেষ কারণও আছে। ২০১৭ সালে কলম্বোয় আমাদের টিম বাংলাদেশ যখন শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে শততম টেস্ট খেলেছিল, ওই ম্যাচে ছিলাম আমি। সে জয়ের সুখ স্মৃতি এখনো ভাস্বর। ওই ম্যাচের অংশীদার হয়ে আছি। প্রতিটি ম্যাচেই আসলে থাকতে চাই। শুধু সুখের সময়ে না জাতীয় দলের সুখে, দুঃখে থাকতে চাই।

তবে এখন নেই। তা নিয়ে হা-পিত্যেশ করেও লাভ নেই। কঠিন সত্য হলো এখন আমি দলে নেই। বাইরে। ইনশাল্লাহ কামব্যাক করবো। তখন আবার জাতীয় দলের সুখ-দুঃখের স্মৃতির সঙ্গী হবো।

জাগো নিউজ : করোনার কারণে ঘরোয়া ক্রিকেট প্রায় বন্ধ। ‘এ’ টিমেরও কোন খেলা নেই। আপনার কী মনে হয়, আপনার মত প্রতিষ্ঠিত পারফরমার জাতীয় দল থেকে বাদ পড়ার পর ‘এ’ দলের হয়ে খেলাটা নিজেকে ফিরে পাবার সর্বোত্তম প্লাটফর্ম?

সাব্বির : এখন তো করোনার মহামারির কারণে সব বন্ধ। অন্য সময়ের কথা বলছি, ন্যাশনাল টিম থেকে বাদ পড়ার পর যদি ঘরোয়া ক্রিকেট না হয়, তাহলে বেস্ট পসেবল প্লাটফর্ম হলো ‘এ’ টিম। কারণ বিশ্বের সব টেস্ট খেলুড়ে দেশের ‘এ’ দলের একটা সাডেন স্ট্যান্ডার্ড আছে। সেটা জাতীয় দল থেকে খুব দুরে নয়। মোটামুটি কাছেই।

কাজেই জাতীয় দলের কোন স্টাবলিস্ট পারফরমার বাদ পড়ার পর তার ফেরায় সর্বোত্তম প্লাটফর্ম হলো ‘এ’ টিম। আমার অনুরোধ ‘এ’ টিমটাকে আরও সমৃদ্ধ করা এবং দেশে ও দেশের বাইরে খেলার ব্যবস্থা করা উচিৎ। তাতে শুধু আমার মত বাদ পড়াদের জাতীয় দলে ফেরার পথ প্রসস্থ হবে, তাই নয়। একটা স্ট্যান্ডার্ডও সেট হবে। ভারত, শ্রীলঙ্কার মত দেশের ‘এ’ দলের সাথে খেলতে পারলে ভাল হতো। এখন ঘরোয়া ক্রিকেট ছাড়া উপায় নেই।

জাগো নিউজ : বাংলাদেশের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের বর্তমান মান এখন কেমন? এটা কি আগের চেয়ে ভাল।

সাব্বির : হ্যাঁ, সব কিছু মিলে বেটার অবশ্যই। তবে আমার মনে হয় খেলোয়াড়দের আর্থিক সুযোগ সুবিধা, ম্যাচ ফি আর দৈনিক ভাতা আরও বাড়াতে পারলে ভাল হয়। যদিও সেটা বেড়েছে। তারপরও আমার মনে হয় আর বাড়ালে ক্রিকেটারদের উৎসাহ, আগ্রহ এবং মনোযোগ, মনোসংযোগ দিয়ে খেলার আগ্রহ তীব্র হবে।

আগে ন্যাশনাল লিগ খেললে ৪০০-৫০০ টাকা দৈনিক ভাতা পেতাম। খেয়ে দেয়ে কিছুই থাকতো না। এখন আলহামদুল্লিল্লাহ প্লেনে যেতে পারছি। আড়াই হাজার টাকা ডিএ হচ্ছে। ম্যাচ ফি’ও বেড়েছে। তবে ম্যাচ ফি আর দৈনিক ভাতাটা আরও বাড়ালে আমার মনে হয় ক্রিকেটাররা আরও উৎসাহিত হতো। তখন মনে হতো না, বিসিএল-এনসিএল খেলেও তো একটা সার্টেন অ্যামাউন্ট পাওয়া যায়। তাই আমাকে সামর্থ্যের সবটুকু উজাড় করে দিতে হবে। সিরিয়াসনেস গ্রো করতো।

এআরবি/আইএইচএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]