ভেজা উইকেটে সাজিদের ক্যারিশমা নাকি টাইগার ব্যাটারদের ব্যর্থতা!

আরিফুর রহমান বাবু
আরিফুর রহমান বাবু আরিফুর রহমান বাবু , বিশেষ সংবাদদাতা
প্রকাশিত: ০৮:২৯ পিএম, ০৭ ডিসেম্বর ২০২১

সেই পরশু রোববার দুপুরে শুরু হয়েছে, এরপর দুই দিনের বেশি সময় টানা বৃষ্টি হয়েছে। আজও সুর্যের দেখা মেলেনি। আকাশ গুমোট হয়েই ছিল। সাথে কনকনে বাতাস।

ক্রিকেটের ‘অ, আ- বোঝেন, জানেন- তারাও সবাই একবাক্যে বলবেন, সীমিং কন্ডিশন।’ মানে ফাস্ট বোলারদের জন্য সবচেয়ে আদর্শ আবহাওয়া। অনুকুল পরিবেশ। যত মোটা, পুরু আর ভারি কভারেই ঢাকা থাকুক না কেন, প্রায় আড়াই দিনের বৃষ্টি সিক্ত পিচ, সুর্য ছাড়া কালো আকাশ- মানে ভেজা আবহাওয়া। ক্রিকেট অভিধানে আদর্শ ‘সীমিং কন্ডিশন।’

এমন ভেজা আবহাওয়ায় পিচে একটু হলেও ‘ময়েশ্চার’ জমবেই। বল স্বাভাবিকের চেয়ে একটু বেশি ম্যুভ করবে। বাতাসের পাশাপাশি ২২ গজের পিচে পড়ে এদিক ওদিক সুইং করবে। সেটাই স্বাভাবিক এবং যা হয়ে উঠবে পেস বোলিংদের জন্য আদর্শ। এমন কন্ডিশনে ফাষ্টবোলাররা সংহার মূর্তি ধারণ করবেন- এতকাল তাই জানা ছিল সবার।

কিন্তু আজ ৭ ডিসেম্বর মঙ্গলবার রাজধানী ঢাকার শেরে বাংলা স্টেডিয়ামে সে চেনা জানা ফর্মুলা গেল বদলে। ঘুরিয়ে বললে বিরল ঘটনা ঘটলো। ঘটলো? নাকি বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা নতুন ঘটনার জন্ম দিলেন বা ঘটালেন? তা নিয়ে ছোটখাট বিতর্ক হতেই পারে।

দুই দিনের বেশি সময়ে টানা বর্ষণের পর মেঘে ঢাকার আকাশে পাকিস্তানী ফাস্টবোলার প্রচন্ড গতি আর বাড়তি সুইং ও বিপজ্জনক বাউন্সে নয়, সাজিদ খান আর নৌমান আলির স্পিন আক্রমণে নাকাল সাদমান, মাহমুদুল হাসান জয়, নাজমুল হোসেন শান্ত, মুমিনুল হক, মুশফিকুর রহিম, লিটন দাস আর মেহেদি হাসান মিরাজরা।

Sajid Khan

আড়াই দিনের বৃষ্টির পর স্পিনারদের বোলিংয়ে দেড় ঘণ্টায় (২০.৪ ওভারে) কোন দলের ৭ উইকেটের পতন ঘটতে পারে- তা কে কবে দেখেছে? বোধকরি আজই প্রথম দেখলো ক্রিকেট বিশ্ব!

ভাবছেন যে দলে শাহিন শাহ আফ্রিদি আর হাসান আলির মত বিশ্বমানের ফাস্ট বোলার আছেন, যারা চট্টগ্রামেই মুমিনুল বাহিনীর নাভিঃশ্বাস তুলে ছেড়েছেন, দু’জনই একবার করে ৫ উইকেট শিকারী, সেই জুটি ছাড়া স্পিনারদের ব্যবহার করা হয়েছে যখন- তখন বুঝি পিচ শতভাগ স্পিন সহায়ক! ইয়া বড় বড় টার্ন। হ্যাঁ, চতুর্থ দিনের পিচ, স্পিনাররা একটু আধটু সাহায্য সহযোগিতা পাচ্ছেন। বল স্বাভাবিকের চেয়ে খুব না হলেও একটু বেশি ঘুরছে।

কিন্তু ভাববেন না সেটা অস্বাভাবিক কিছু। জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে যেদিন বাংলাদেশের তাইজুল ৭ উইকেটের পতন ঘটিয়েছিলেন, তার চেয়ে টার্ন কমই ছিল আজ।

কিন্তু তারপরও দিন শেষে পাকিস্তানের অফস্পিনার সাজিদ খানের পকেটে জমা পড়লো ৬ উইকেট। অযথা ছুটোছুটি করে সিঙ্গেলস নিতে গিয়ে অধিনায়ক মুমিনুল হয়েছেন রানআউট।

যে বৃষ্টি ভেজা আবহাওয়া ও পিচে পাকিস্তানীরা অবলীলায় ৯৮.৩ ওভার খেলে মাত্র ৪ উইকেট হারিয়ে ৩০৪ রান করে ইনিংস ঘোষণা করলো- সেই পিচে বাংলাদেশের স্কোর ৭ উইকেটে ৭৬ (২৬ ওভারে), ভাবা যায়!

এবং ৭ উইকেটের ৬টিই স্পিনারা পেয়েছেন, সেটাও কী স্বাভাবিক? দুই দিনের বেশি সময়ের টানা বৃষ্টিতে কভারে ঢাকা ময়েশ্চারযুক্ত পিচে শাহিন আফ্রিদি আর হাসান আলির সংহার মূর্তির সামনে এমন অসহায় আত্মসমর্পন করলে তবু একটা কথা ছিল। শাহিন শাহ আফ্রিদি ক্রমাগত ১৪০-১৪৫ কিলোমিটার গতিতে বল করেছেন। বাঁ-হাতি কৌনিক ডেলিভারির সাথে শরীর সোজা বাউন্সার ছুঁড়েছেন।

আর হাসান আলির ১৩৫ কিলোমিটার গতির বল অফ স্ট্যাম্প ও তার আশপাশে পড়ে কখনো সুইং করে বেরিয়ে গেছে আবার কোনটা ভিতরে ঢুকে ব্যাটারকে বোকা বানিয়েছে। এমন কিছু ঘটলে অবাক হবার কিছু ছিল না। তারা ওই মানের বোলার। যারা বৃষ্টি ভেজা পিচে দুরন্ত-দুর্বার হতেই পারেন। তাদের বোলিংয়ে এমন বিপর্যয় ঘটলে তবু সান্ত্বনা খুঁজে পাওয়া যেত; কিন্তু তারাতো বোলিংই করতে পারেননি।

আলো কম। ফাস্ট বোলারদের দিয়ে বোলিং করানো যাবে না। শাহিন শাহ আফ্রিদির এক ওভার করার পরই আম্পাায়াররা তা বলে দিয়েছেন। তাই বাধ্য হয়ে স্পিনারদের দিয়েই বোলিং করিয়েছেন বাবর আজম।

আর বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা সেই স্পিনারদের বোলিংয়ে একের পর এক আউট হয়েছেন। সাজিদ খানের টার্নে পরাস্ত হয়ে নয়, এ অফস্পিনারকে মারতে গিয়ে অকাতরে উইকেট দিয়ে এসেছেন সবাই।

কি অদ্ভুত তাড়াহুড়ো সবার! মনে হলো যেন টিম ম্যানেজমেন্ট থেকে বলে দেয়া হয়েছে, কে কত অল্প সময়ে বেশি রান করতে পারবে, দেখবো। বোঝাই গেল ফলোঅন মুক্ত হওয়ার চিন্তা থেকেই এমন মেরে খেলা; কিন্তু সেটা কেন? ফলোঅন এড়াতে দরকার ছিল ১০৫ রান। সেটা আজকেই করে ফেলতে হবে? তা কেন? কাল শেষ দিন। আজ বোর্ডে রান যাই থাকুক না কেন, আজকের দিনটি যত কম সম্ভব উইকেট হারিয়ে পার করে দিলেই ‘ল্যাঠা’ চুকে যেত। তখন ম্যাচ ড্র করা যেত অনায়াসে।

কিন্তু না। প্রথমে ভুল পথে হাঁটলেন তরুণ মাহমুদুল হাসান জয়। সাজিদ খানের বলে এক পা বেরিয়ে এসে কী যেন করতে চেয়েছিলেন অভিষেক হওয়া এ তরুণ। বল নাগালের একটু সামনে পড়ায় আর মাঝ ব্যাটে আনতে পারেননি। ব্যাটের বাইরের কানায় লেগে চলে গেছে প্রথম স্লিপে। তারপর অফস্পিনার সাজিদ খানের ওপর চড়াও হবার প্রদর্শনীতে মাতলেন সবাই।

সাদমান স্কোয়ার কাট করতে গিয়ে ক্যাচ দিয়েছেন পয়েন্টে। নাজমুল হোসেন শান্ত সাজিদ খানের অফস্পিনে পিছনের পায়ে পরাস্ত লেগবিফোর উইকেট। অধিনায়ক মুমিনুল হক পয়েন্টে ঠেলে সিঙ্গেলস নিতে গিয়ে আর পৌঁছাতে পারেননি।

মুশফিকুর রহিম- আগের বলে কভার পয়েন্ট দিয়ে বাউন্ডারি হাঁকিয়ে ঠিক পরের বলেই স্লগ সুইপ করতে গিয়ে মিড উইকেটে ক্যাচ দিলেন। লিটন দাস সোজা ব্যাটে উইকেট ছেড়ে মারতে গিয়ে কট অ্যান্ড বোল্ড। অফ মিডলে পিচ পড়া বলতে ক্রস ব্যাটে মারতে গিয়ে বোল্ড হলেন মিরাজ ।

এভাবেই বৃষ্টি ভেজা পিচে পাকিস্তানি স্পিনারদের উইকেট দিয়ে নতুন ইতিহাস গড়লেন বাংলাদেশের ব্যাটাররা।

এআরবি/আইএইচএস/

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]