খেলার আলোপথ ছেড়ে জুয়ার অন্ধকার গলিতে ক্লাবগুলো

রফিকুল ইসলাম
রফিকুল ইসলাম রফিকুল ইসলাম , বিশেষ সংবাদদাতা
প্রকাশিত: ১০:১১ পিএম, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯

পশ্চিমে ইয়ংমেন্স ক্লাব, পূর্বে মোহামেডান। মাঝে আজাদ বয়েজ ক্লাব, ঢাকা ওয়ান্ডারার্স ক্লাব, আরামবাগ ক্রীড়া সংঘ, দিলকুশা স্পোর্টিং ক্লাব, আজাদ স্পোর্টিং ক্লাব, ঢাকা মেরিনার ইয়াংস ক্লাব, ওয়ারি ক্লাব ও ভিক্টোরিয়া স্পোর্টিং ক্লাব। এ ছাড়াও ফকিরেরপুল, আরামবাগ ও মতিঝিলের বিশাল এই জায়গায় আছে সাবেক ফুটবলারদের সংগঠন সোনালী অতীত ক্লাব, মসজিদ, বাফুফে ভবন ও অ্যাস্ট্রোটার্ফ।

পুরো এলাকাটা পরিচিত ক্লাব পাড়া হিসেবে। দেশের খেলাধুলার অন্যতম প্রাণকেন্দ্র এই ক্লাব পাড়াকে এখন অনেকে বলেন জুয়া পাড়া। কয়েকদিন ধরে ‘জুয়া পাড়া’ নামটিকে পেছনে ঠেলে সামনে এসেছে ‘ক্যাসিনো পাড়া’। কলঙ্কের এ নামকরণের জন্য ক্লাবগুলোর দায় কম নয়। কিছু কর্মকর্তার যুগযুগ ধরে অনৈতিক কার্যকলাপেই ক্লাবগুলো আজ খেলার আলোপথ ছেড়ে জুয়ার অন্ধকার গলিতে।

এখানে সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ক্লাবগুলোকে আশির দশকের শেষ দিকে এখানে জায়গা করে দিয়েছিল জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ। যদিও ক্লাবগুলোর জন্য আরো বড় ও ভালো জায়গা দেয়ার উদ্যোগ ছিল সরকারের। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের তৎকালীন পরিচালক (প্রশাসন) মেজর (অব.) এনামুল হক খান বলেন, ‘সরকারের ইচ্ছে ছিল ১৭ টি ক্লাবকে রোকেয়া স্মরণীতে মাঠসহ জায়গা দিতে। কিন্তু কিছু ক্লাব সেখানে যাওয়ায় আপত্তি জানায়। পরে গুলিস্তানের পাশে ওসমানী উদ্যানেও ক্লাবগুলোকে জায়গা করে দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। তাতেও কিছু ক্লাব আপত্তি জানায়। পরে আরামবাগ-মতিঝিলের ওই জায়গার খাল ভরাট করে সেখানে ক্লাবগুলোকে আলাদা আলাদা করে বরাদ্দ দেয়া হয়।’

কি শর্তে ক্লাবগুলোকে জায়গা দেয়া হয়েছিল? এ বিষয়ে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদে খোঁজ নিলেও তার উত্তর পাওয়া যায়নি। পরিষদের পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) মো. শাহ আলম সরদার বলেন, ‘অনেক আগের ঘটনা। কাগজপত্র দেখে বলা যাবে। আর বরাদ্দের চিঠি বের করাও সময় সাপেক্ষ ব্যাপার।’

সাবেক পরিচালক এনামুল হক খান বলেছেন,‘বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল ৯৯ বছরের জন্য। এর মধ্যে মোহামেডানের জায়গাটা পরে দলিল করে দিয়ে দেয়া হয়েছে। ক্লাবগুলোকে যে সব শর্ত দেয়া হয়েছিল তা সব মনে নেই। তবে যা মনে আছে সেগুলো হলো-শুধুমাত্র খেলাধুলার কার্যক্রম, স্থাপনা টিনসেটের বা সর্বোচ্চ এক তলা দালান করা যাবে। তবে পরে ইয়ংমেন্স ক্লাবকে দেয়া হয়েছিল দোতলা পর্যন্ত দালান করার অনুমতি। এর শর্ত ভঙ্গ করলে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ বরাদ্দ বাতিলও করতে পারে।’

খেলাধুলার কার্যক্রম পরিচালনার জন্য যে ক্লাবগুলোকে এখানে জায়গা বরাদ্দ দিয়েছিল জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ সেগুলোর প্রায় সব কটিতেই এক সময় জমজমাট ক্রীড়া কার্যক্রম হতো। বিশেষ করে মোহামেডান ও ঢাকা ওয়ান্ডারার্স স্বাধীনতার পর থেকেই ছিলো ঘরোয়া ফুটবলের অন্যতম পরাশক্তি। অন্য ক্লাবগুলোও বিভিন্ন খেলায় অংশ নিতো।

ক্লাবের সদস্যদের অবসর সময়ে তাস খেলার রেওয়াজ নতুন নয়। সেখান থেকে আস্তে আস্তে তাসের বোর্ড তৈরি হয় ক্লাবগুলোতে। তারপর প্রতি সপ্তাহে হাউজি। ক্লাবগুলোর দাবি এসব তারা সংশ্লিষ্টদের অনুমতি নিয়েই চালাতো দৈনন্দিন খরচের জন্য। সপ্তাহে দিনগুলো ভাগ করে একেকদিন একেক ক্লাবে হতো হাউজি। সেখান থেকে কিছু টাকা আয় হতো ক্লাবগুলো।

কয়েকটি ক্লাবে তাস আর হাউজির পাশপাশি বিভিন্ন ধরনের জুয়া চলতো বলেও এখন খবর বেরিয়ে আসছে। আর নতুন সংযোজন এই ক্যাসিনো। ক্লাব পাড়ায়ই ৬ টি ক্যাসিনোর সন্ধান পেয়ে সেগুলো সিলগালা করেছে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। খেলাধুলা বাদ দিয়ে ক্লাবগুলো এখন আলোচায় জুয়া আর ক্লাব নিয়ে।

মতিঝিল পাড়ার ক্লাবগুলোর মধ্যে একমাত্র মোহামেডানই নিয়মিত অংশ নেয় দেশের তিন বড় খেলা ফুটবল, ক্রিকেট ও হকিতে। তিন খেলার ঘরোয়া শীর্ষ লিগেই খেলে সাদাকালোরা। এ ছাড়াও ক্লাবটি অনিয়মিত অংশ নেয়, দাবা, হ্যান্ডবল, রাগবি। এক সময় ক্লাবটি ব্যাডমিন্টন, বাস্কেটবল, ভলিবলও নিয়মিত খেলতো। এখন সেই কার্যক্রম ছোট হয়ে সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে গোটা তিনেক খেলায়।

তিন প্রধান খেলার মধ্যে হকির প্রিমিয়ার লিগ খেলে ঢাকা মেরিনার ইয়াংস ক্লাব, ওয়ারি ক্লাব, আজাদ স্পোর্টিং ক্লাব, ঢাকা ওয়ান্ডারার্স ক্লাব ও ভিক্টোরিয়া স্পোর্টিং ক্লাব। মোহামেডান ছাড়াও এই পাড়ার ক্লাবগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার ফুটবল লিগ খেলে আরামবাগ ক্রীড়া সংঘ। প্রিমিয়ার ক্রিকেট লিগ খেলা একমাত্র ক্লাব মোহামেডান।

ভিক্টোরিয়া স্পোর্টিং ক্লাব প্রিমিয়ার হকি ছাড়া খেলে পেশাদার ফুটবলের দ্বিতীয় স্তর চ্যাম্পিয়নশিপ লিগ ও দ্বিতীয় বিভাগ ক্রিকেট লিগ। ঢাকা ওয়ান্ডারার্স ক্লাব ও দিলকুশা স্পোর্টিং ক্লাব প্রিমিয়ার হকি লিগের পাশাপাশি খেলে প্রথম বিভাগ ফুটবল লিগ। আরামবাগ ক্রীড়া সংঘ ফুটবলের সর্বোচ্চ পর্যায়েই খেলে। তবে ইয়ংমেন্স ক্লাব প্রিমিয়ার লিগে ওঠলেও স্বেচ্ছায় থেকে গেছে দ্বিতীয় স্তর বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়নশিপ লিগে। আজাদ স্পোর্টিং ক্লাব প্রিমিয়ার হকি লিগের পাশাপাশি খেলে প্রথম বিভাগ ক্রিকেট লিগে, ওয়ারি ক্লাব প্রিমিয়ার হকি ও ফুটবলের চ্যাম্পিয়নশিপ লিগ, মেরিনার্স প্রিমিয়ার হকি ও দ্বিতীয় বিভাগ ক্রিকেট লিগ। আজাদ বয়েজ ক্লাব এখন আর এই তিন প্রধান খেলায় নেই।

ক্লাবগুলো বেশি খেলায় অংশ নেয়ার কারণে এক সময় ক্লাব পাড়ায় হাঁটলে কেবল ক্রীড়াবিদদেরই দেখা যেতো। আর ক্যাসিনো উচ্ছেদ অভিযানের আগে দেখা যেতো শুধু জুয়ারিদের। আবাল বৃদ্ধ বনিতা দিনরাত মতিঝিলের ক্লাব পাড়ায় খেলতো নানা রকম জুয়া। ক্যাসিনোগুলোর দায় নিচ্ছে না ক্লাবগুলো। প্রত্যেক ক্লাব থেকেই দাবি করা হচ্ছে জোর করেই ক্লাবে ক্যাসিনো রাজত্ব কায়েম করেছিলেন প্রভাবশালী কিছু মানুষ। তবে দুর্নামের বেশিরভাগই চাপছে ক্লাবের ঘারে।

আরআই/এমএমআর/পিআর