ডিজিটাল যুগে সংযোগের অন্তরালে বিচ্ছিন্নতার নীরব কান্না
জিয়াউদ্দিন লিটন
মানুষের ইতিহাসে প্রতিটি যুগই তার নিজস্ব যোগাযোগের ভাষা নির্মাণ করেছে কখনো পাথরের দেয়ালে খোদাই করা প্রতীকে, কখনো কাগজে লেখা অক্ষরে, কখনো বা কণ্ঠের উষ্ণতায়। বর্তমান যুগে সেই ভাষা স্থানান্তরিত হয়েছে আলোকোজ্জ্বল পর্দার নিঃশব্দ সংকেতে। এখানে শব্দ আছে, বাক্য আছে, আবেগের প্রতীকও আছে তবুও কোথাও যেন অনুপস্থিত থেকে যায় অনুভবের উষ্ণ মানবিক স্পর্শ।
ডিজিটাল প্রযুক্তি আমাদের যোগাযোগকে যে অভূতপূর্ব গতিতে রূপান্তরিত করেছে, তা ইতিহাসে বিরল। ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে প্রায় ৫০০ কোটিরও বেশি মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করে, যার একটি বৃহৎ অংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয়।
বাংলাদেশেও এই সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে দেশে ১৩ কোটির অধিক ইন্টারনেট ব্যবহারকারী রয়েছে এবং তরুণ প্রজন্মের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ প্রতিদিন গড়ে ৩ থেকে ৫ ঘণ্টা সময় ব্যয় করছে বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে। এই পরিসংখ্যান আমাদের একটি স্পষ্ট সত্যের সামনে দাঁড় করায়, মানুষ আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় বহুগুণ বেশি সংযুক্ত।
কিন্তু এই সংযোগের ভেতরেই লুকিয়ে আছে এক গভীর বৈপরীত্য। ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্যবীমা সংস্থা সিগনা-এর এক জরিপে দেখা যায়, প্রায় ৪৬ শতাংশ মানুষ নিজেদের ‘একাকী’ বা ‘বিচ্ছিন্ন’ বলে অনুভব করে। একইভাবে, ২০২১ সালে জার্নাল অব সোশ্যাল অ্যান্ড ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিতে প্রকাশিত একটি গবেষণায় বলা হয়, যারা দিনে দুই ঘণ্টার বেশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে, তাদের মধ্যে নিঃসঙ্গতা ও বিষণ্নতার লক্ষণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
এই বাস্তবতা আমাদের একটি মৌলিক প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায় সংযোগ কি সত্যিই সংযোগ, নাকি এটি কেবল এক পরিশীলিত বিভ্রম?
সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে প্রতীয়মান হয়, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো মানুষের আত্ম-উপস্থাপনকে একটি নিয়ন্ত্রিত কাঠামোর মধ্যে আবদ্ধ করেছে। এখানে ব্যক্তি তার জীবনের একটি ‘সম্পাদিত সংস্করণ’ তুলে ধরে যেখানে ব্যর্থতা আড়ালে থাকে, আর সাফল্য দৃশ্যমান হয়। এর ফলে অন্যের জীবনের সঙ্গে নিজের জীবনের তুলনা করতে গিয়ে মানুষ এক ধরনের অদৃশ্য মানসিক চাপে নিমজ্জিত হয়, যা ধীরে ধীরে ‘অস্তিত্বগত শূন্যতা’ সৃষ্টি করে।
মনোবিজ্ঞানের পরিভাষায়, এই প্রবণতাকে সোশ্যাল কম্পারিজন এফেক্ট বলা হয়। গবেষণা নির্দেশ করে, এই প্রবণতা আত্মসম্মান হ্রাস করে এবং একাকিত্বের অনুভূতিকে তীব্রতর করে। কারণ মানুষ তখন বাস্তবতার সঙ্গে নয়, বরং কৃত্রিমভাবে নির্মিত এক বাস্তবতার সঙ্গে নিজের জীবনকে তুলনা করে।
এই পরিবর্তনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সম্পর্কের গঠনপ্রণালি। অতীতে সম্পর্ক গড়ে উঠত সময়, সহনশীলতা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে; বর্তমানে তা হয়ে উঠেছে দ্রুত, প্রতিক্রিয়াশীল এবং অনেকাংশে ভোগবাদী। ‘ব্লক’ বা ‘আনফলো’ করার সহজলভ্যতা মানুষকে সম্পর্ক থেকে সহজেই সরে যাওয়ার প্রবণতায় অভ্যস্ত করে তুলছে। ফলে সম্পর্কের গভীরতা হ্রাস পাচ্ছে, স্থায়িত্ব কমছে এবং সহমর্মিতার পরিসর সংকুচিত হয়ে পড়ছে।
বিশেষত তরুণ প্রজন্ম এই পরিবর্তনের সবচেয়ে গভীর প্রভাবের মুখোমুখি। ২০২৩ সালের একটি বৈশ্বিক জরিপ অনুযায়ী, ১৬–২৪ বছর বয়সী তরুণদের প্রায় ৬০ শতাংশ মনে করে যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তাদের আত্মপরিচয় ক্রমশ নির্ভরশীল হয়ে উঠছে ‘লাইক’, ‘শেয়ার’ এবং ‘ফলোয়ার’-এর মতো ডিজিটাল সূচকের ওপর। ফলে আত্মপরিচয় হয়ে উঠছে ভঙ্গুর, বহির্মুখী এবং অস্থির।
তবে এই সংকটের দায় একমাত্র প্রযুক্তির ওপর আরোপ করা সমীচীন নয়। প্রযুক্তি একটি মাধ্যম এটি মানুষের অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও সামাজিক বাস্তবতার প্রতিফলন ঘটায়। আধুনিক মানুষ ক্রমেই ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে উঠছে; পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন শিথিল হচ্ছে; এবং সেই শূন্যতা পূরণের প্রয়াসে সে আশ্রয় নিচ্ছে ভার্চুয়াল জগতের। কিন্তু এই আশ্রয় অনেক সময় হয়ে ওঠে এক প্রকার নিঃসঙ্গতার অভিনয় যেখানে মানুষ একা থেকেও একা না থাকার ভান করে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটও এই বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। নগরায়ণ, কর্মব্যস্ততা এবং পারিবারিক কাঠামোর পরিবর্তনের ফলে বাস্তব সম্পর্কের ক্ষেত্র সংকুচিত হচ্ছে। ফলে মানুষ ডিজিটাল মাধ্যমকে একটি বিকল্প সামাজিক পরিসর হিসেবে গ্রহণ করছে যা আংশিকভাবে কার্যকর হলেও মানবিক চাহিদার পূর্ণতা দিতে সক্ষম নয়।
তবুও এই অন্ধকারের মধ্যেও সম্ভাবনার আলোকরেখা বিদ্যমান। প্রযুক্তি যেমন বিচ্ছিন্নতার মাধ্যম হতে পারে, তেমনি তা সংযোগেরও শক্তিশালী উপায়। প্রয়োজন কেবল সচেতন ও মানবিক ব্যবহার। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে সংযমী এবং বাস্তব সম্পর্ককে অগ্রাধিকার দেয়, তাদের মানসিক সুস্থতা তুলনামূলকভাবে উন্নত।
অতএব, আমাদের শিখতে হবে কখন একটি নোটিফিকেশন উপেক্ষা করে একজন মানুষের পাশে বসা জরুরি, কখন একটি ইমোজি এর পরিবর্তে একটি বাস্তব হাসি অধিক অর্থবহ। শেষাবধি, এই প্রশ্নটি প্রযুক্তির নয় এটি গভীরভাবে মানবিক ও দার্শনিক। সংযোগ কি কেবল তথ্যের আদান-প্রদান, নাকি তা অনুভবের এক গভীর অভিজ্ঞতা? যদি সেই অনুভব অনুপস্থিত থাকে, তবে হাজারো সংযোগও মানুষের নিঃসঙ্গতাকে দূর করতে পারবে না।
সম্ভবত আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ প্রযুক্তিকে অতিক্রম করা নয় বরং প্রযুক্তির ভেতরেই মানবিকতাকে পুনরাবিষ্কার করা। কারণ, শেষ পর্যন্ত মানুষ চায় না শুধু দেখা যেতে সে চায় বোঝা যেতে।
লেখক: সাবেক অধ্যক্ষ, কাব্যালোচক এবং কলামিস্ট
কেএসকে