আইলার ৭ বছর : ক্ষত শুকায়নি আজও


প্রকাশিত: ০৮:৪৭ এএম, ২৫ মে ২০১৬

আইলার সাত বছর পরও উপকূলীয় এলাকায় তাণ্ডবের চিহ্ন আজও স্পষ্ট। ২০০৯ সালের ২৫ মে সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস ও ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে সৃষ্ট সর্বনাশা “আইলা” আঘাত হানে দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় জনপদে। মুহুর্তের মধ্যে উপকূলবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকা লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়।

৭ বছর পরও উপকূলবাসীকে খাবার পানির জন্য ছুটতে হচ্ছে মাইলের পর মাইল। নেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। নেই চিকিৎসার সুব্যবস্থা ও চলাচল উপযোগী রাস্তাঘাট। এলাকায় কাজ না থাকায় কাজের সন্ধানে এলাকা ছাড়ছে মানুষ। সুপেয় খাবার পানির জন্য রীতিমত যুদ্ধ করতে হচ্ছে নারীদের। ৭-৮ কিলোমিটার দূর থেকে খাবার পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে তাদের।

satkhira

২০০৯ সালের ২৫ মে এই দিনে ভয়ঙ্কর জলোচ্ছ্বাস আইলার আঘাতে লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় উপকূলীয় এলাকা। ১৫ ফুট উচ্চতা বেগের জলোচ্ছ্বাস আঘাত হানে সুন্দরবন উপকূলীয় সাতক্ষীরার শ্যামনগর ও আশাশুনি উপজেলায়। এসময় শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ও পদ্মপুকুর ইউনিয়ন এবং আশাশুনি উপজেলার প্রতাপনগর ইউনিয়নে ৭৩ জন নারী, পুরুষ ও শিশু নিহত হয়।

বর্তমানে এসব এলাকায় খাবার পানির সঙ্কট তীব্র আকার ধারণ করেছে। নেই চিকিৎসা সেবা ও রাস্তা ঘাট। এছাড়াও নদী ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করায় আতঙ্ক বেড়েছে উপকূলীয় এলাকার মানুষের মধ্যে।

উচ্চবিত্ত থেকে শুরু করে নিম্মবিত্ত সবাই বেঁচে থাকার সংগ্রাম করে যাচ্ছে অবিরাম। বেকারত্বের কারণে কাজের সন্ধানে মানুষ নিজ বাসভূমি ছেড়ে চলে যাচ্ছে অন্যত্র। সুন্দরবন, কপোতাক্ষ ও খোলপেটুয়া নদীর উপর নির্ভরশীল ওই এলাকার মানুষের জীবন যাপন এখন দুর্বিসহ হয়ে পড়েছে।

satkhira-ayla

আইলার পরপরই সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে কিছু কাজের বিনিময়ে খাদ্য প্রকল্প শুরু হলেও এখন আর কোনো কাজ হচ্ছে না। ক্রমে বাড়ছে দরিদ্র ও অতি দরিদ্রের সংখ্যা। আইলার পর ৭ বছর অতিবাহিত হলেও পানি উন্নয়ন বোর্ডের বেড়িবাঁধগুলো পুরোপুরি সংস্কার না হওয়ায় এখনও ঝুঁকিতে রয়েছে এ জনপদের মানুষ।

আইলা দুর্গত গাবুরা এলাকার মুনমুন আহম্মেদ সেদিনের স্মৃতিচারণ করে জাগো নিউজকে বলেন, দুপুরের খাবার খেয়ে আমি বারান্দায় বসে ছিলাম। টিপ টিপ করে বৃষ্টি হচ্ছিল। মুহূর্তের মধ্যে ৮/১০ হাত পানিতে সব তলিয়ে গেলো। ভাসিয়ে নিয়ে গেলো গরু, ছাগল, হাঁস-মুরগি। আমি ভাসতে ভাসতে এক টিনের চালে আটকে ছিলাম।
 
একই এলাকার সাইফুল ইসলাম জানান, এলাকায় কোনো হাসপাতাল নেই। কেউ অসুস্থ হলে ৩৫-৪০ কিলোমিটার দূরে শ্যামনগর বা প্রায় একশ কিলোমিটার দূরে সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে নিয়ে যেতে হয়। ৫-৬ ঘণ্টা সময় লাগে। সেখানে পৌঁছানোর আগেই বিনা চিকিৎসায় অনেকে মারা যায়। নেই পর্যাপ্ত সাইক্লোন শেল্টার। তিনি ইউনিয়নে একটি হাসপাতাল ও পর্যাপ্ত সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণের দাবি জানান।

satkhira-ayla

বাড়ি থেকে ৭-৮ কিলোমিটার দূরে খাবার পানি নিতে আসা গাবুরা এলাকার রাফিয়া বেগম জাগো নিউজকে বলেন, অনেক দূর থেকে এসে দুই বেলা পানি আনতে অয়। বাকি কাজ করতি পারিনে। পারলে একটু খাওয়ার পানির ব্যাবস্থা করি দেন।

শ্যামনগর উপজেলার আইলা দুর্গত এলাকার গাবুরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জিএম আলী আজম টিটো জাগো নিউজকে জানান, আইলায় বিধ্বস্ত হওয়ার পর থেকে ওয়াবদা, ব্রিজ-কালভার্টগুলো সংস্কার করা হয়নি। স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসাগুলো সংস্কার না হওয়ায় ভেঙে পড়েছে শিক্ষা ব্যাবস্থা। নেই চিকিৎসার সুব্যাবস্থা। বেড়িবাঁধে ফাঁটল দেখা দিয়েছে। সংস্কার করা না হলে আবারও যে কোনো মুহূর্তে বড় ধরনের বিপর্যয় আসতে পারে।

আইলা ও সিডর বিধ্বস্ত শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী অফিসার আবু সায়েদ মো. মঞ্জুরুল আলম জানান, দুর্গত এসব এলাকার মানুষের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে সরকার, এনজিও, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সবাই মিলে একযোগে কাজ করে যাচ্ছি। গাবুরাতে কমিউনিটি ক্লিনিকের কার্যক্রম থাকলেও লোকবল সঙ্কটের কারণে সঠিকভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না।

তিনি আরো বলেন, এই রিমোট এলাকায় যাকেই পদায়ন করা হয় সেই বদলি হয়ে চলে যায়। এটি আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তারপরও আমরা কাজ করে যাচ্ছি।

এফএ/এবিএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।