মূল পরিকল্পনাকারী ডেমরা থেকে আটক
মাদারীপুর সরকারি নাজিমউদ্দিন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের গণিত বিভাগের শিক্ষক রিপন চক্রবর্তীকে হত্যাচেষ্টার মূল পরিকল্পনাকারী খালেদ সাইফুল্লাহ জামিলকে (২২) ডেমরা এলাকা থেকে আটক করা হয়েছে। এমন খবর শুক্রবার গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে শহরজুড়ে আলোচনার ঝড় শুরু হয়।
এদিকে আটক খালিদ সাইফুল্লাহ জামিলের মাদারীপুর শহরের গোলাবাড়ি কাজী ভবনে শুক্রবার দুপুর ১টার দিকে মাদারীপুর সদর থানা পুলিশ তল্লাশি চালায়।
পরিবারের দাবি, সোমবার রাতে গোপালপুর বড় মসজিদ থেকে পুলিশ পরিচয়ে সাদা পোশাকে একদল লোক খালিদ সাইফুল্লাহকে আটক করে। এসময় খালিদের মামা গোপালপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক গোলাম রসুলকেও আটক করা হয়। তাদের সঙ্গে কালকিনি উপজেলা বাঁশতলা মসজিদের ইমাম মোহাম্মদ পারভেজ ও তারাবির নামাজের ইমাম সাজ্জাদ হোসেনকে আটক করা হয়।
রাতে মাদারীপুর শহরের গোলাবাড়ি এলাকায় খালিদ সাইফুল্লাহদের বাসায় তল্লাশি চালানো হয়। তখন তার পরিবারের সদস্যদের কাছে শিক্ষক রিপন চক্রবর্তীর সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়।
একটি সূত্রে জানা গেছে, আলোচিত কলেজ শিক্ষক রিপন চক্রবর্তীর উপর হামলার ঘটনায় আটক গোলাম ফাইজুল্লাহ ফাহিম বন্দুকযুদ্ধে নিহত হলে ফাহিমের দেওয়া তথ্যমতে শুরু হয় পুলিশের বিশেষ অভিযান। এ অভিযানের অংশ হিসেবে মূল পরিকল্পনাকারী খালেদ সাইফুল্লাহ জামিল আটক হয়।
জামিল নিখোঁজ হওয়ার চারদিন পর পুলিশ তাকে ঢাকার ডেমরা থেকে গ্রেফতার করেছে বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছে। তবে এখনো নিখোঁজ রয়েছেন সাইফুল্লাহর বাবা কাজী বেলায়েত হোসেন এমন অভিযোগ তার স্ত্রী নাজমা আক্তারের। বার বার যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও পুলিশের কোনো কর্মকর্তা এ ব্যাপারে কোনো কথা বলতে চাননি।
আটক খালেদ সাইফুল্লাহ জামিল মাদারীপুর সরকারি নাজিমউদ্দিন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের গণিত বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান কাজী বেলায়েত হোসেনের বড় ছেলে। তাদের বাড়ি সদর উপজেলার দুধখালী ইউনিয়নের বলসা গ্রামে। বর্তমান ঠিকানা কাজী ভবন, গোলাবাড়ি, মাদারীপুর।
জামিলের বাবা কাজী বেলায়েত হোসেন বিএনপি-জামায়াতের শাসন আমলে ১৯৯৩ সালের ১৫ নভেম্বর মাদারীপুর সরকারি নাজিমউদ্দিন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের গণিত বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন। খালেদ সাইফুল্লাহ জামিল এক সময় শিবচর উপজেলার পাচ্চর ‘জামিয়াতুস সুন্নাহর’ নামে একটি মাদ্রাসার ছাত্র ছিল।
ওই মাদ্রাসা থেকে ২০০৯ সালের ১২ জুলাই পাকিস্তান ভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন লস্কর-ই-তাইয়্যবার সদস্য, আলোচিত জঙ্গি শেখ ওবায়দুল্লাহ ওরফে আবু জাফরকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। খালেদ সাইফুল্লাহ জামিল ২০১৫ সালে ফরিদপুর মার্কাজ মাদ্রাসায় ভর্তি হয়। এবার রমজান মাস শুরু হলে তিনি কালকিনির গোপালপুর বড় মসজিদে তারাবির নামাজ পড়ানোর জন্য ইমামতির দায়িত্ব পান।
জামিলের খালাত ভাই আরিফ হোসেন বলেন, সোমবার রাত ১টার দিকে আমার খালাত ভাই খালেদ সাইফুল্লাহ জামিলকে পুলিশ পরিচয়ে ৭/৮ জন লোক আটক করে। রাত ৩টার দিকে খালেদ সাইফুল্লাহ জামিলের গোলাবাড়ির বাসায় পুলিশ ব্যাপক তল্লাশি চালায় বলেও দাবি করেন তিনি। এসময় আমার মামা স্কুল শিক্ষক রিটনকেও আটক করে পরে তাকে ছেড়ে দিয়েছে পুলিশ। তবে আমার খালাত ভাই জামিলকে একটি পুলিশের গাড়িতে ফরিদপুরের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়।
কাজী বেলায়েত হোসেনের প্রতিবেশিরা জানান, তাদের কাজী পরিবারের লোকজন এলাকার কারো সঙ্গে মিশে না এবং তেমন একটা কথাবার্তাও বলে না।
খালিদ সাইফুল্লাহ জামিলের মা নাজমা আক্তার বলেন, সোমবার রাতে পুলিশ পরিচয়ে পাঁচ ব্যক্তি অস্ত্র নিয়ে আমাদের ঘরে প্রবেশ করে। তারা তখন আমার ভাই গোলাম রসুলকে বেঁধে নিয়ে আসে। ঘরের বিভিন্ন জিনিসপত্র তল্লাশি করে। তারা বলে, আমরা রিপন চক্রবর্তীকে চিনি কিনা সে আমাদের বাসায় এসেছিল কিনা এ বিষয়ে জানতে চায়। তখনও আমরা জানতাম না জামিলকে নিয়ে গেছে। কিছু সময় পরে ভাইকে ছেড়ে দিলে সে জানায় পুলিশ জামিলকে ধরে নিয়ে গেছে। এখন আমার স্বামীও নিখোঁজ।
কাজী বেলায়েত হোসেনের সঙ্গে মোবাইলে বার বার রিং করা হলে তার মোবাইল বন্ধ পাওয়া যায়।
উল্লেখ্য, মাদারীপুর সরকারি নাজিমউদ্দিন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের গণিত বিভাগের শিক্ষক রিপন চক্রবর্তী (৪০) গত ১৫ জুন (বুধবার) কলেজের পরীক্ষার কাজ শেষে কলেজ ক্যাম্পাস সংলগ্ন ভাড়া করা বাসায় চলে যান। ওই বাসায় তিনি একাই থাকেন এবং বাসায় ফিরে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। বিকেল ৫টার দিকে তার বাসার দরজায় নক করে তিন যুবক। দরজায় নক করার শব্দ শুনে শিক্ষক রিপন চক্রবর্তী দরজা খোলা মাত্রই তিন সন্ত্রাসী কিছু বুঝে ওঠার আগেই তাকে এলোপাতাড়ি কোপাতে থাকে। এসময় তার চিৎকারে স্থানীয় লোকজন এগিয়ে এলে সন্ত্রাসীরা দৌড়ে প্রধান সড়কে গিয়ে একটি ইজিবাইকে পালিয়ে যায়। সন্ত্রাসীরা পালিয়ে যাওয়ার সময় স্থানীয়দের সহায়তায় কলেজের স্টাফ মিরাজ ফায়েজুল্লাহ ফাহিম (১৯) নামের এক সন্ত্রাসীকে ধরে পুলিশে সোপর্দ করে।
এ ঘটনায় পরদিন ১৬ জুন (বৃহস্পতিবার) রাতে পুলিশের পক্ষ থেকে এসআই আইয়ুব আলী বাদী হয়ে সদর থানায় ৬ জনের নাম উল্লেখ করে একটি মামলা দায়ের করেন।
১৭ জুন (শুক্রবার) দুপুর সাড়ে ৩টার দিকে ফায়েজুল্লাহ ফাহিমকে মাদারীপুর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করে ১৫ দিনের রিমান্ডের আবেদন করে সদর থানার পুলিশ। আদালতের বিচারক মো. সাইদুর রহমান ১০ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। ১৮ জুন (শনিবার) সকালে বন্দুকযুদ্ধে ফাহিম মারা যায়।
এ কে এম নাসিরুল হক/এমএএস/এবিএস