ক্ষতি জেনেও তামাক চাষে ঝুঁকছেন চাষিরা
উত্তরের সীমান্তঘেঁষা জেলা লালমনিরহাটে অর্থকরী ফসলের আড়ালে জেঁকে বসেছে বিষবৃক্ষ তামাক। চলতি মৌসুমে জেলার পাঁচটি উপজেলার সমতল ভূমি ও তিস্তার চরাঞ্চলে তামাক চাষে ভয়াবহ উল্লম্ফন দেখা দিয়েছে। অধিক লাভের আশায় ও টোব্যাকো কোম্পানিগুলোর প্রলোভনে কৃষকরা খাদ্যশস্য বাদ দিয়ে তামাকের দিকে ঝুঁকছেন। এতে শিশুদের চরম স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে সঙ্গে নষ্ট হচ্ছে আবাদি জমির উর্বরতা। সেইসঙ্গে ঝুঁকি বাড়ছে দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশ বিপর্যয়ের।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, গত বছরের তুলনায় এ বছর লালমনিরহাটে তামাক চাষের এলাকা প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে। গত মৌসুমে যেখানে ৯ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে তামাক চাষ হয়েছিল, চলতি ২০২৫-২৬ মৌসুমে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫ হাজার ৫৭৫ হেক্টর। বর্তমানে তা আরও বৃদ্ধি পেয়ে ১৮ হাজার ৮২৫ হেক্টর জমিতে গিয়ে ঠেকেছে। বিশেষ করে জেলার আদিতমারী, কালীগঞ্জ ও হাতীবান্ধা উপজেলার চরাঞ্চলগুলোর মাইলের পর মাইল এলাকা এখন তামাকের একচেটিয়া দখলে।
স্থানীয়দের মতে, তামাক কোম্পানিগুলোর দেওয়া অগ্রিম ঋণ, সার, বীজ ও নিশ্চিত বাজারজাতকরণের প্রলোভনে পড়ে কৃষকরা ধান, ভুট্টা বা ডালের মতো প্রয়োজনীয় খাদ্যশস্যের মায়া ত্যাগ করছেন।
সরেজমিনে জেলার আদিতমারী উপজেলার সাপ্টিবাড়ী, সারপুকুর, ভেলাবাড়ী ও সদর উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, বিষবৃক্ষ তামাক চাষাবাদের কাজে নারী-পুরুষের পাশাপাশি শিশুরাও সমানতালে কাজ করছে। বিভিন্ন তামাক কোম্পানি কৃষকদের সরাসরি প্রলুব্ধ করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তারা চাষের শুরুতেই নগদ অর্থ ও উপকরণের নিশ্চয়তা দিচ্ছে।

সাপ্টিবাড়ী ইউনিয়নের কৃষক ফয়সাল রাজু বলেন, ‘কোম্পানি সব দেয়, আমাদের শুধু খাটনি। ধান আবাদ করে লস হওয়ার ভয় থাকে, কিন্তু তামাকের বাজার কোম্পানিই ঠিক করে দেয়।’
একই এলাকার আরেক তামাক চাষি হারেজ আলী জানান, বৃহত্তর রংপুরে এখন প্রধান আবাদ হয়ে দাঁড়িয়েছে তামাক। তিনি বলেন, ‘সার, বীজ, টাকা, সবই টোব্যাকো কোম্পানিগুলো দেয়। তামাক তুলে আমরা আবার ওই জমিতে ধান লাগাই। হয়ত সাধারণ কৃষকদের চেয়ে আমাদের ধানের ফলন কিছুটা কম হয়, কিন্তু তামাক থেকে যে নগদ টাকা পাই, সেটাই আমাদের মূল লাভ।’
ক্ষতিকর জেনেও কেন তামাক চাষ করছেন, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সিগারেটের গায়েও তো লেখা থাকে তামাক ক্ষতিকর, তারপরও তো মানুষ খায়। আমরাও জানি এটি ক্ষতিকর, তারপরও লাভের জন্যই চাষাবাদ করি। কৃষি অফিস যদি আমাদের সরকারি কোনো প্রণোদনা, বীজ ও সার দিয়ে অন্য কোনো লাভজনক ফসল চাষ করতে বলে, তাহলে আমরা সেটাই করবো ও তামাক চাষ ছেড়ে দেব।’
আদিতমারীর গিলাবাড়ী এলাকার কৃষক রবিউল ইসলাম বলেন, ‘বিভিন্ন টোবাকো কোম্পানির প্রতিনিধিরা আমাদের লোন ও কার্ড দেয়। সেই কার্ডের মাধ্যমেই আমরা তাদের বীজ নিয়ে আবাদ করি ও তামাক বুঝিয়ে দিয়ে টাকা নিই। কৃষি অফিস থেকে অন্য ফসলের জন্য অনেক বীজ-সার দেওয়ার কথা থাকলেও আমরা এখন পর্যন্ত কিছুই পাইনি। তাই বাধ্য হয়ে তামাকই চাষ করছি।’

স্কুলগামী অনেক শিশু পড়াশোনা বাদ দিয়ে পরিবারের সঙ্গে তামাক প্রক্রিয়াজাতকরণে অংশ নিচ্ছে। তামাক পাতা ভাঙা, শুকানো ও প্রক্রিয়াজাত করার এই বিষাক্ত পরিবেশে কাজ করছে কোমলমতি শিশুরা।
আদিতমারী উপজেলার সাপ্টিবাড়ির গিলাবাড়ী গ্রামের ১২ বছর বয়সি শিশু মমিনুল ইসলামের ভাষ্য, ‘সকাল থেকে তামাক পাতার গন্ধে মাথা ব্যথা করে। সকালে ঠিকমতো ভাতও খেতে পারিনি। কিছুদিন হলো নানাবাড়ি থেকে নিজ বাড়িতে এসেছি। হয়ত ধীরে ধীরে অভ্যাস হয়ে যাবে।’
পাশেই তামাকের কাজ করছিল ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী রানী আক্তার (লাবনী)। সে জানায়, এখন তামাকের মৌসুম চলছে, তাই কাজের চাপ অনেক। স্কুল থেকে ফিরে বাড়ির এই কাজে সাহায্য করাই এখন মূল কাজ। তবে তামাকের এই কাজ করতে অনেক কষ্ট হয়।
জানা যায়, একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ শ্রমিকের দৈনিক মজুরি যেখানে ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা, সেখানে শিশুদের দিয়ে নামমাত্র মূল্যে বা পরিবারের সদস্য হিসেবে বিনা পারিশ্রমিকেই কাজ করানো যাচ্ছে। এতে কৃষকদের খরচ বাঁচলেও শিশুদের ভবিষ্যৎ ও স্বাস্থ্য চরম হুমকির মুখে পড়ছে।
আদিতমারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. মো. আজমল হক এই পরিস্থিতিকে ভয়াবহ উল্লেখ করে বলেন, ‘তামাক গাছের কাঁচা পাতার রস ও প্রক্রিয়াজাতকরণের সময় নির্গত নিকোটিন শিশুদের ত্বকের মাধ্যমে সরাসরি রক্তে মিশে যায়। এর ফলে শিশুদের ফুসফুসে স্থায়ী ক্ষতি, দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসকষ্ট (অ্যাজমা), চর্মরোগ ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা মারাত্মকভাবে কমে যায়। দীর্ঘমেয়াদে এরা ক্যানসার ও কিডনি জটিলতায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘শুধু শিশুদের জন্যই নয়, সব বয়সি মানুষের জন্যই এটি ক্ষতিকর। সাময়িক লাভের আশায় আমরা আসলে একটি প্রজন্মকে পঙ্গু করে দিচ্ছি। সরকারকে এ বিষয়ে আরও কঠোর ও দায়িত্বশীল হতে হবে।’
সার্বিক বিষয়ে লালমনিরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক (কৃষিবিদ) মো. মতিউর আলম বলেন, ‘আমরা কৃষকদের তামাকের কুফল সম্পর্কে সচেতন করছি ও বিকল্প ফসল চাষে উৎসাহিত করছি। তামাক চাষ জমির উর্বরতা দীর্ঘ মেয়াদে নষ্ট করে দেয়। এটি নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।’
তিনি আরও বলেন, ‘কৃষি বিভাগের মাঠ পর্যায়ের টিমের মাধ্যমে বিভিন্ন এলাকায় উঠান বৈঠক ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। কৃষকদের তামাক চাষ থেকে নিরুৎসাহিত করতে কৃষি বিভাগ থেকে নানা ধরনের প্রণোদনাও দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো (বিএটিবি), আবুল খায়ের টোব্যাকো কোম্পানি (একেটিসি), জাপান টোব্যাকোর (জেটিআই) মতো কোম্পানিগুলো চাষিদের বীজ ও টাকা দিয়ে চুক্তিভিত্তিক তামাক চাষ করাচ্ছে। এতে আবাদি জমির পাশাপাশি মানবদেহেরও চরম ক্ষতি হচ্ছে।
মহসীন ইসলাম শাওন/এমএন/এমএস