বাঁশের খুঁটিতে ভর করে চলে স্কুল, ক্লাস হয় মন্দিরে
একটি প্রাথমিক স্কুলে ক্লাস নিচ্ছেন শিক্ষক। বাইরে বসে আছেন অভিভাবক। কখন কি জানি হয়ে যায়। এমন দুশ্চিন্তা যেন তাদের পিছু ছাড়ছে না। সন্তানদের স্কুলে রেখে বাড়ি চলে যাওয়াটাকে তারা নিরাপদ মনে করছেন না। কারণ যে স্কুলে শিশুদের পড়াশোনা করতে দিয়েছেন সে স্কুলের ভবনটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। আর তাই যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে বলে আশঙ্কা অভিভাবকদের।
নারায়ণগঞ্জ শহরের দেওভোগ আখড়ার মোড় এলাকার ২৬ নম্বর লক্ষ্মীনারায়ণ বালক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং ২৭ নম্বর লক্ষ্মী নারায়ণ বালিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এমনই পরিস্থিতি। স্কুলের যে ভবনটিতে পাঠদান করা হচ্ছে তা বর্তমানে খুবই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এ নিয়ে বিভিন্ন দপ্তরে দৌড়াদৌড়ি করলেও শেষ পর্যন্ত সমাধান হয়নি।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ১৯৩৯ সালে ৪ শতাংশ জমির ওপর ২৬ নম্বর লক্ষ্মীনারায়ণ বালক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং ২৭ নম্বর লক্ষ্মীনারায়ণ বালিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় একসঙ্গে স্থাপিত হয়। ভবনের নিচতলা ও দ্বিতীয় তলা মিলে কক্ষের সংখ্যা ছয়টি। দ্বিতীয় তলার বাঁপাশের কক্ষের ছাদের বিমের ঢালাই ও পলেস্তারা খসে পড়েছে। ছাদটি যেন ধসে না পড়ে, এ কারণে চারটি বাঁশ লাগিয়ে ঠেস দিয়ে রাখা হয়েছে।

আরও পড়ুন
জীর্ণ ভবনে পাঠদান, ঝুঁকিতে ২৫ হাজার শিক্ষার্থী
জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ক্লাস করছে শিশুরা
দুই বছরেই ঝুঁকিপূর্ণ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অধিকাংশ ভবন
সেই সঙ্গে ভবনের অন্য দুটি কক্ষের ছাদ ও দেওয়ালে ফাটল ধরেছে। এ কারণে ভবনের দোতলার তিনটি কক্ষ ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হয়েছে। নিচ তলার তিনটি কক্ষ কোনোমতে কাজে লাগানো হচ্ছে। এর মধ্যে দুটি কক্ষে পাঠদান করা হয়। আর একটি কক্ষে শিক্ষকরা বসেন।
শিক্ষকদের রুমে সবসময় পানি জমে থাকে। দোতলায় বাথরুম, কিন্তু সিঁড়ি ভেঙে পড়ায় ব্যবহার করা যাচ্ছে না। শিক্ষকদের কক্ষে একটি বাথরুম আছে। বাধ্য হয়ে শিক্ষার্থীদের সেটি ব্যবহার করতে হয়।
একই সঙ্গে দুই শিফটে সাতজন করে শিক্ষক দায়িত্বরত থাকেন। দুইজন প্রধান শিক্ষক। প্রথম শিফটে সকাল ৭টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত চলে বালিকা বিদ্যালয়ের ক্লাস। দ্বিতীয় শিফটে দুপুর ১২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত চলে বালক বিদ্যালয়ের ক্লাস।
বিদ্যালয়ের মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৬০০। তবে ভবন বেহালের কারণে শিক্ষার্থীর সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে। এমতাবস্থায় পাশের মন্দির ভবনের দুটি কক্ষে পঞ্চম, দ্বিতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ক্লাস নেওয়া হচ্ছে।

মিতা সরকার নামে একজন অভিভাবক বলেন, বাচ্চা স্কুলে দিয়ে আমরা বাইরে দাঁড়িয়ে থাকি। কখন জানি কী হয়ে যায়। অনেক ঝুঁকির মধ্যে বাচ্চাদের পড়াশোনা করানো হয়।
আরও পড়ুন
যশোরের দেড়শ প্রাথমিক বিদ্যালয় ঝুঁকিতে
কখন যেন মাথার ওপর ভেঙে পড়ে বিদ্যালয়ের ছাদ
সুনামগঞ্জের ১৬৪ প্রাথমিক বিদ্যালয় ঝুঁকিপূর্ণ
উমা রানী দাস নামে আরেক অভিভাবক বলেন, আমাদের মতো মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য এই স্কুলই ভরসা। প্রাইভেট স্কুলে পড়ানোর মতো সাধ্য আমাদের নেই। যার কারণে বাধ্য হয়েই এই স্কুলে বাচ্চাদের পড়াশোনা করাচ্ছি। বাচ্চাদের স্কুলে দিয়ে পুরো সময়টাতেই বাইরে দাঁড়িয়ে থাকি। স্কুলের এই ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে বাচ্চাদের রেখে বাসায় গিয়ে স্বস্তি পাই না। সবসময় ভয়ের মধ্যে থাকি।
বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা ঝিমি সাহা বলেন, আমি ২০১৮ সালে সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগদান করি। আসার পর থেকেই এই অবস্থা দেখছি। গত তিনবছর আগে আরও বেশি ভেঙে যায়। ভাগ্য ভালো ছিল ওইদিন শ্রেণিকক্ষে কোনো শিক্ষার্থী ছিল না। বাঁশ দিয়ে ঠেকা দিয়ে রাখা হয়েছে। পরে ক্লাস বন্ধ করে দেওয়া হয়। বর্তমানে মন্দিরে ক্লাস নেওয়া হচ্ছে; কিন্তু মন্দিরে জায়গার সংকুলান না হওয়ায় বাধ্য হয়ে নিচতলায় ক্লাস নিচ্ছি।
তিনি বলেন, দুটি শিফটের প্রায় ৬ শতাধিক শিক্ষার্থী নিয়ে খুব দুশ্চিন্তার মধ্যে থাকি। যদি কোনো সময় বিপদ ঘটে যায় তাহলে ৬ শতাধিক বাচ্চার পরিবারের বিপদ। এতগুলো পরিবারের স্বার্থে যেন দৃষ্টি দেওয়া হয়।
সহকারী শিক্ষক দ্বিপ্তী রায় বলেন, আমাদের বিদ্যালয়টি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ২০১৫ সালে যখন ভূমিকম্প হয় তখন বিদ্যালয়ের তৃতীয় তলার চিলেকোঠা এবং দ্বিতীয় তলার দুটি রুম বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপর নিচের কয়েকটি রুমে গাদাগাদি করে বাচ্চাদের ক্লাস নেওয়া হয়। এরপর তিন বছর আগে মন্দির থেকে দুটি রুম দেওয়া হয়; সেখানে ক্লাস নেওয়া হয়। বৃষ্টির সময়ে নিচতলার রুমে পানি চলে আসে। তখন ক্লাস নেওয়া অনেক কঠিন হয়ে যায়। যত সময় যাচ্ছে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে যাচ্ছে। অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের এখানে ভর্তি করাতে চায় না। তারা অনিশ্চয়তাই ভোগে। ভালো পরিবারের ছেলে মেয়েদের পাওয়া যায় না।

আরও পড়ুন
আতঙ্ক নিয়েই পাঠদান চলছে ৫৩ বিদ্যালয়ে
মাথায় ছাদ ভেঙে পড়ার আতঙ্ক নিয়ে চলছে লেখাপড়া
স্কুলের ছাদের পলেস্তারা ধসে দুই শিক্ষার্থী আহত
লক্ষ্মীনারায়ণ বালক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মাহবুবা খানম বলেন, অনেকদিন ধরেই আমাদের স্কুলের এই সমস্যা। ওপরের ক্লাসগুলো পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। আমরা অধিদপ্তরে গিয়েছিলাম তারা বলেছিলেন ব্যবস্থা করে দেবেন। একই সঙ্গে শিক্ষা অফিস, জেলা প্রশাসনসহ বিভিন্ন দপ্তরে গিয়েছি কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা হয়নি।
তিনি আরও বলেন, আমাদের অফিস রুমে সবসময় পানি থাকে। শিক্ষকরা ভালোভাবে বসতে পারে না। পরিত্যক্ত হওয়ার কারণে দুইটি ক্লাস পাশের মন্দিরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। কিন্তু মন্দির একবারে কাছে নয়। আসা যাওয়ায় অনেক সময় নষ্ট হয়। অভিভাবকরা নিরাপদ মনে করে না। যেকোনো সময় ভবন ভেঙে যেতে পারে। আমাদের ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও ভালোভাবে পাঠদান করতে পারছি না। মাল্টিমিডিয়ার ক্লাস শুরু করা যাচ্ছে না।
নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার ফেরদৌসী বেগম বলেন, আমরা একটি নতুন ভবনের আবেদন করেছিলাম; কিন্তু এখনও নতুন ভবনের অনুমোদন হয়নি। প্রক্রিয়া চলমান। সেই সঙ্গে বিদ্যালয়টির বর্তমান অবস্থা ভালো না, তাই আমরা বিকল্প অনুসন্ধান করছি। অন্য কোনো জায়গায় স্থানান্তর করা যায় কি না সেই অনুসন্ধান চলমান।
এমআরএম/এফএ/এএসএম