নদীগর্ভে যেতে বসেছে ভাষাশহীদ সালাম স্মৃতি জাদুঘর

আব্দুল্লাহ আল-মামুন
আব্দুল্লাহ আল-মামুন আব্দুল্লাহ আল-মামুন , জেলা প্রতিনিধি, ফেনী
প্রকাশিত: ০৯:০৩ পিএম, ১৮ মে ২০২৬
ভাষাশহীদ আবদুস সালাম গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর/ছবি: সংগৃহীত

প্রতিষ্ঠার ১৮ বছর পেরিয়ে গেলেও কোনো স্মৃতিস্মারক ছাড়াই খুঁড়িয়ে চলছে ফেনীর দাগনভূঞার ভাষাশহীদ আবদুস সালাম গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর। ছোট ফেনী নদীর তীব্র ভাঙন ও জরাজীর্ণ অবকাঠামোর কারণে দর্শনার্থী হারিয়ে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে স্থাপনাটি। দীর্ঘ সাত দশকেও মহাসড়কে তোরণ নির্মাণ কিংবা সালামনগরে শিশুপার্ক স্থাপনের মতো সরকারি প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়ন না হওয়ায় ক্ষোভ বাড়ছে স্থানীয় বাসিন্দা ও শহীদ পরিবারের সদস্যদের মাঝে।

গ্রন্থাগার ও জাদুঘরটির অবস্থান ফেনী জেলার দাগনভূঞা উপজেলায়। এই উপজেলায় আবদুস সালামের বাড়ি। তার নামে ১৮ বছর আগে গ্রামের নাম সালামনগর করা হয়। তখনই নির্মাণ করা হয় গ্রন্থাগার ও জাদুঘরটি। এর পাশেই রয়েছে শহীদ মিনার ও ভাষাশহীদ আবদুস সালাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ভাষাশহীদ সালাম সম্পর্কে নতুন প্রজন্মকে জানাতে ঢাকা-চট্টগ্রাম জাতীয় মহাসড়ক ও ফেনী-নোয়াখালী আঞ্চলিক মহাসড়কে তোরণ নির্মাণ, গ্রামের বাড়ির সামনে উচ্চবিদ্যালয় স্থাপন, জাদুঘরে স্মৃতি সংরক্ষণ ও গ্রন্থাগারে নতুন বই সংযোজন এবং একটি শিশুপার্ক বিনোদন কেন্দ্র গড়ে তোলার দাবি করেছেন স্থানীয়রা।

নদীগর্ভে যেতে বসেছে ভাষাশহীদ সালাম স্মৃতি জাদুঘর

সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, ১৯২৫ সালের ২৭ নভেম্বর ফেনীর দাগনভূঞা উপজেলার মাতুভূঞা ইউনিয়নের লক্ষণপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন ভাষাশহীদ আবদুস সালাম। বাংলা ভাষা রক্ষার আন্দোলনে ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে বিক্ষোভ মিছিলে অংশ নেন তিনি। সেখানে গোলাগুলিতে গুলিবিদ্ধ হন আবদুস সালাম। পরে তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৭ এপ্রিল মৃত্যুবরণ করলে তাকে আজিমপুর কবরস্থানে দাফন করা হয়। পরিবার ও স্বজনদের দাবির প্রেক্ষিতে ভাষা আন্দোলনের ৬৫ বছর পর ২০১৭ সালে আজিমপুর কবরস্থানে আবদুস সালামের কবর শনাক্ত করা হয়।

‘ফেনী-নোয়াখালী মহাসড়ক হয়ে জাদুঘরে আসার রাস্তাটি কয়েক বছর আগে সংস্কার করা হয়েছে। তবে জাদুঘরটি কিছুটা দূরে হওয়ায় দর্শনার্থী ও পাঠকরা আসতে আগ্রহী হন না।’

আরও পড়ুন:
খামারিদের লাভের স্বপ্নে ‘কাঁটা’ ভারতীয় গরু
জ্বালানি সংকটে মোটরসাইকেল ব্যবসায় ধস
বুঝে নেওয়ার ‘ঠেলাঠেলিতে’ দুই বছরেও চালু হয়নি বিশেষায়িত শিশু হাসপাতাল

ভাষাশহীদ আবদুস সালামকে স্মরণীয় করে রাখতে তার গ্রামের বাড়ি লক্ষণপুরের নাম পরিবর্তন করে সেটিকে সালামনগর গ্রাম করা হয়েছে। সালামের বাড়ির সামনে লক্ষণপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তন করে ভাষাশহীদ আবদুস সালাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় করা হয়েছে। ২০০০ সালে ফেনীতে ভাষাশহীদ সালাম স্টেডিয়ামের নামকরণ করা হয়। ২০০৭ সালে দাগনভূঞা উপজেলা অডিটোরিয়ামের নামকরণ করা হয় ভাষাশহীদ সালাম মিলনায়তন। ২০০৮ সালে সালামের বাড়ির দরজায় নির্মাণ করা হয় ভাষাশহীদ আবদুস সালাম গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর। নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে হলের নামকরণ করা হয় ভাষাশহীদ আবদুস সালাম। সালামকে স্মরণীয় করে রাখতে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর অন্যতম যুদ্ধজাহাজের নামকরণ করা হয় ‘বানৌজা সালাম’। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে ২০০০ সালে ভাষাশহীদ সালামকে মরণোত্তর একুশে পদক প্রদান করা হয়।

নদীগর্ভে যেতে বসেছে ভাষাশহীদ সালাম স্মৃতি জাদুঘর

ভাষাশহীদ আবদুস সালামের ছোট ভাই আবদুল করিম বলেন, ‘আমাদের বাড়ির দরজায় স্থাপিত গ্রন্থাগারকে প্রাণচঞ্চল রাখতে পাশের স্কুলটিকে উচ্চবিদ্যালয়ে রূপান্তর করা গেলে পাঠক সৃষ্টি হবে। এছাড়া এটিকে স্মৃতি জাদুঘর নাম দেওয়া হলেও মূলত এখানে সালামের কোনো স্মৃতি সংরক্ষণ করা হয়নি।’

২০২৪ সালের বন্যায় ক্ষতির মুখে পড়েছিল গ্রন্থাগারটি। গ্রন্থাগারটি ঘুরে দেখা যায়, ক্ষতিগ্রস্ত কাঠের বুকশেলফগুলো সরিয়ে স্টিলের শেলফ বসানো হয়েছে। বসেছে প্লাস্টিকের নতুন চেয়ার ও টেবিল। বন্যায় নষ্ট হওয়া বইগুলো সরিয়ে নতুন বই আনা হয়েছে। তিন হাজারের মতো বই রয়েছে এই গ্রন্থাগারে। নিরাপত্তার জন্য আছে সিসিটিভি ক্যামেরাও।

‘গ্রন্থাগারে আবদুস সালামের নামে প্রকাশিত কোনো বই নেই। সালাম যে একুশে পদকে ভূষিত হয়েছেন, সেই পদক, ক্রেস্ট কিছুই নেই। কিছু দেখার নেই বলে দর্শনার্থীও নেই।’

জানা যায়, প্রতিষ্ঠার পর থেকে গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘরে ফেনী জেলা পরিষদ থেকে মাস্টাররোলে একজন গ্রন্থাগারিক ও একজন তত্ত্বাবধায়ক দায়িত্ব পালন করছেন। গ্রন্থাগারিক মো. লুৎফুর রহমান বাবলু বলেন, ‘পাঠক খুব একটা নেই। আশপাশের এলাকা থেকে সপ্তাহে দু-একজনের বেশি পাঠক বা দর্শনার্থী আসেন না।’

নদীগর্ভে যেতে বসেছে ভাষাশহীদ সালাম স্মৃতি জাদুঘর

আরও পড়ুন:
আলু চাষিদের ভাগ্য যেন উত্থান-পতনের গল্প
বন্ধ চিনিকলে আটকা হাজারো শ্রমিক-চাষির ভাগ্য
প্রত্যন্ত অঞ্চলের চিকিৎসকরা যেন ‘ঢাল-তলোয়ারহীন সেনাপতি’

পাঠক-দর্শনার্থী কেন আসেন না, এর একটা কারণ জানান জাদুঘরের তত্ত্বাবধায়ক ফরিদ উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘ফেনী-নোয়াখালী মহাসড়ক হয়ে জাদুঘরে আসার রাস্তাটি কয়েক বছর আগে সংস্কার করা হয়েছে। তবে জাদুঘরটি কিছুটা দূরে হওয়ায় দর্শনার্থী ও পাঠকরা আসতে আগ্রহী হন না।’

‘ভাষা আন্দোলনে সালামদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত বাংলা ভাষা দেশের সর্বস্তরে চালু করার উদ্যোগ নিতে হবে। সালামনগরে জনসমাগম নিশ্চিত করার জন্য সেখানে একটি পার্ক অথবা বিনোদন কেন্দ্র গড়ে তোলা হোক।’

স্থানীয় বাসিন্দা মোজাম্মেল হক হাসান বলেন, ‘গ্রন্থাগারে আবদুস সালামের নামে প্রকাশিত কোনো বই নেই। সালাম যে একুশে পদকে ভূষিত হয়েছেন, সেই পদক, ক্রেস্ট কিছুই নেই। কিছু দেখার নেই বলে দর্শনার্থীও নেই।’

নদীগর্ভে যেতে বসেছে ভাষাশহীদ সালাম স্মৃতি জাদুঘর

আলমগীর হোসেন নামের আরেকজন বলেন, ‘ফেব্রুয়ারি এলেই সরকারি কর্মকর্তা ও সাংবাদিকেরা আসেন। এরপর আর কেউ খবর নেন না।’

ফেনীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) রমেন শর্মা পাঠক কম হওয়ার জন্য মানুষের পাঠাভ্যাস কমে যাওয়াকে একটি কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘পাঠকেরা যখন বইমুখী হবেন, তখন এই গ্রন্থাগারগুলো সক্রিয় হবে। সরকারের পক্ষ থেকে কিছু কর্মসূচি নিলেও, দীর্ঘ মেয়াদে পাঠক তৈরি না করা গেলে সেটি সম্ভব হবে না।’

দাগনভূঞার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. শাহীদুল ইসলাম বলেন, ‘নদীভাঙন রোধে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। গ্রন্থাগার ও জাদুঘর ভবনের পাশে যে শহীদ মিনার রয়েছে, সেটিও খুব একটা ভালো অবস্থায় নেই। বিভিন্ন জায়গায় ফাটল দেখা দিয়েছে। বেদির একাধিক টাইলস ভাঙা। প্রতিবছরের মতো এবারও সেখানেই একুশে ফেব্রুয়ারির অনুষ্ঠান হয়েছে।’

নদীগর্ভে যেতে বসেছে ভাষাশহীদ সালাম স্মৃতি জাদুঘর

ভাষাশহীদ আবদুস সালাম স্মৃতি পরিষদের সভাপতি সাংবাদিক মোহাম্মদ শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘ভাষা আন্দোলনে সালামদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত বাংলা ভাষা দেশের সর্বস্তরে চালু করার উদ্যোগ নিতে হবে। সালামনগরে জনসমাগম নিশ্চিত করার জন্য সেখানে একটি পার্ক অথবা বিনোদন কেন্দ্র গড়ে তোলা হোক।’

ফেনী জেলা প্রশাসক মনিরা হক বলেন, ‘ভাষাশহীদ সালামের গ্রামের বাড়ি দাগনভূঞার মাতুভূঞা ইউনিয়নে অবস্থিত। গ্রামটিকে জনসম্পৃক্ত করতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।’

এমএন/এএইচ/এএসএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।