বিরল পাথর আর প্রাচীন নিদর্শনে সমৃদ্ধ ‘রকস মিউজিয়াম’

সফিকুল আলম
সফিকুল আলম সফিকুল আলম , জেলা প্রতিনিধি পঞ্চগড়
প্রকাশিত: ১০:০৩ পিএম, ১৮ মে ২০২৬
পঞ্চগড়ের রকস মিউজিয়ামে দেখা মিলবে বিরল পাথর/ ছবি: জাগো নিউজ

পঞ্চগড় সরকারি মহিলা কলেজ প্রাঙ্গণে গড়ে উঠেছে রকস মিউজিয়াম। যেখানে ইতিহাস, ঐতিহ্য ও ভূতাত্ত্বিক বিস্ময়কর নিদর্শনের দেখা মিলবে। দেশের একমাত্র এবং দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম এই জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে নানা ধরনের বিরল পাথর, জীবাশ্ম, প্রাচীন মুদ্রা, টেরাকোটা ও অতীতের ব্যবহার্য সামগ্রী।

সরেজমিনে দেখা যায়, রকস মিউজিয়ামের দুই তলা ভবনের নিচতলা ও সামনের উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে সারিবদ্ধভাবে সাজিয়ে রাখা হয়েছে বিভিন্ন আকৃতি ও গঠনের পাথর। এর মধ্যে অনেকগুলোতেই রয়েছে রহস্যময় সাংকেতিক চিহ্ন। সংগ্রহশালার ভেতরে স্থান পেয়েছে প্রাচীন মানুষের ব্যবহার করা নানা সামগ্রী, মূর্তি, পোড়ামাটির নকশা ও দুর্লভ মুদ্রা। এছাড়া শালগাছ খোদাই করে তৈরি বিশালাকার দুটি প্রাচীন নৌকা দর্শনার্থীদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করে। উত্তরাঞ্চলের নদ-নদী ও ভূগর্ভ থেকে সংগৃহীত এসব নিদর্শন জাদুঘরটিকে দিয়েছে ভিন্নমাত্রার ঐতিহাসিক গুরুত্ব।

দেশের সাধারণ মানুষের কাছে পাথর কেবল নির্মাণসামগ্রী হলেও পাথরের এই জাদুঘরে ঢুকলেই বোঝা যায়, প্রতিটি পাথরের ভেতরে লুকিয়ে আছে হাজার বছরের ইতিহাস, ভূতাত্ত্বিক বৈচিত্র্য এবং প্রকৃতির বিস্ময়।

বিরল পাথর আর প্রাচীন নিদর্শনে সমৃদ্ধ ‘রকস মিউজিয়াম’৩০০ বছরের পুরনো শালগাছের নৌকা/ ছবি: জাগো নিউজ

এদিকে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে শিক্ষক, শিক্ষার্থীসহ দেশীয় পর্যটকরা আসেন রকস মিউজিয়াম দেখতে। এই মিউজিয়ামের অন্যতম আকর্ষণ ২২ ফুট দৈর্ঘ্যের এক প্রাচীন শালগাছের নৌকা। এর বয়স প্রায় ৩০০ বছর। এ ধরনের নৌকা প্রাচীনকালের আদিবাসীরা প্রশান্ত মহাসাগরের দীপপুঞ্জে ব্যবহার করতেন বলে জনশ্রুতি রয়েছে।

এছাড়া জাদুঘরে রাখা বিশালাকৃতি পাথর, পাথরের মধ্যে নান্দনিক কারুকাজ, খোদাই করা ‘তীর-ধনুক’ ও দেবীর চোখের চিত্র দেখে বিস্মিত হন পর্যটকরা।

‘পঞ্চগড়ের ইতিহাস, প্রকৃতি ও ভূতাত্ত্বিক ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে রকস মিউজিয়ামের ভূমিকা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। এটি শুধু একটি পাথরের জাদুঘর নয়, বরং প্রকৃতি ও ইতিহাসের সম্মিলিত পাঠশালা’

জাদুঘরে এসব পাথরের বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণে অনেকে মনে করেন, আদিকাল থেকেই হিমালয় থেকে বেয়ে আসা নদীর কারণে এ জেলার ভূগর্ভে প্রচুর খনিজ পাথর রয়েছে। জেলার বিভিন্ন এলাকার মাটি খনন করে গভীর থেকে পাথর তুলতে গিয়ে বেরিয়ে আসে প্রাচীন যুগের মূল্যবান প্রস্তুর খণ্ড বা পাথর। মূলত গবেষণার জন্য পাথর সংগ্রহ করতে গিয়ে এই মূল্যবান সংগ্রহশালা রূপ নেয় রকস মিউজিয়াম বা পাথরের জাদুঘরে।

আরও পড়ুন
আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবস আজ
বিলুপ্ত-বিরল মাছের অনন্য সংগ্রহশালা চাঁদপুরের ফিশ মিউজিয়াম
নদীর পানি থেকে মহাসাগরের বালু—সবই আছে লোকায়ন জাদুঘরে

জাদুঘর ভবনের নিচ তলার গ্যালারিতে রয়েছে বিভিন্ন আকৃতি, রং ও বৈশিষ্ট্যের আগ্নেয়শিলা, পাললিক শিলা ও নুড়ি পাথর, সিলিকা নুড়ি ও সিলিকা বালু, হলুদ ও গাঢ় হলুদ বালু, কাচবালি, খনিজবালি, সাদা মাটি, তরঙ্গায়িত চ্যাপ্টা পাথর, লাইমস্টোন, পলি ও কুমোর মাটিসহ কঠিনশিলা।

বিরল পাথর আর প্রাচীন নিদর্শনে সমৃদ্ধ ‘রকস মিউজিয়াম’জাদুঘরে সাজানো আছে পাথর/ ছবি: জাগো নিউজ

এছাড়াও অন্য গ্যালারিতে জাতিতাত্ত্বিক সংগ্রহশালাও স্থাপন করা হয়েছে। এতে রয়েছে- পঞ্চগড় অঞ্চলের আদিবাসী, উপজাতিদের ব্যবহৃত জিনিসপত্র, নদীর নিচে ও ভূগর্ভে প্রাপ্ত অশ্মীভূত কাঠ, ৩০০ থেকে দুই হাজার বছরের পুরোনো ইমারতের ইট, পাথরের মূর্তি এবং পোড়ামাটির নকশা। আরও রয়েছে- বিশাল আকৃতির বেলেপাথর, গ্রানাইট পাথর, কোয়ার্টজাইট, ব্যাসল্ট, শেল, মার্বেলসহ বিভিন্ন নামের ও বর্ণের পাথর। এছাড়া সিলিকায়িত কাঠ বা গাছ থেকে রূপান্তরিত পাথর, চিত্রাঙ্কিত পাথর।

জানা গেছে, ১৯৯৭ সালে পঞ্চগড় সরকারি মহিলা কলেজের তৎকালীন অধ্যক্ষ নাজমুল হক তার ব্যক্তিগত উদ্যোগে এই পাথরের জাদুঘরটি গড়ে তোলেন। মূলত অধ্যক্ষের দায়িত্বকালীন তিনি জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে এসব প্রত্নতাত্ত্বিক উপকরণ সংগ্রহ করেন। শুরুতে গবেষণার জন্য তিনি বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রত্নতাত্ত্বিক উপকরণ হিসেবে পাথর সংগ্রহ শুরু করেন। পরে এই দুর্লভ সংগ্রহশালা ধীরে ধীরে পাথরের জাদুঘরে পরিণত হয়।

‘পঞ্চগড় এমনিতেই পর্যটন এলাকা হিসেবে পরিচিত। বিশেষ করে তেঁতুলিয়ার সমতলে চা বাগানসহ জেলার বিভিন্ন ঐতিহাসিক নিদর্শন দেখে পর্যটকরা মুগ্ধ হন। সঙ্গে পাথরের এই জাদুঘর পঞ্চগড়ের পর্যটন শিল্পে নতুন মাত্রা যোগ করেছে’

এখানে সংরক্ষিত অধিকাংশ পাথর পঞ্চগড়ের ভেতরের এলাকার ঐতিহাসিক দুর্গনগরী এলাকা থেকে সংগৃহীত। বিশেষ করে সমতলের চা-বাগান, মহানন্দার নুড়ি পাথর, খনিজ পাথর, শীতের শুরুতে কাঞ্চনজঙ্ঘার নয়নাভিরাম দৃশ্য আর প্রাকৃতিক সুশীতল ছায়াঘেরা তেঁতুলিয়া দেখতে অসংখ্য দেশীয় পর্যটক পঞ্চগড়ে আসেন। এশিয়ার অন্যতম পাথরভিত্তিক এই জাদুঘর শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও গবেষকরা দুর্লভ ও বৈচিত্র্যময় পাথরের সংগ্রহ দেখে বিস্মিত ও মুগ্ধ হন।

আরও পড়ুন
১৭০ বছরের ইতিহাস ধরে রেখেছে দেশের একমাত্র চা জাদুঘর
হাজার নিদর্শনের জাদুঘরে দিনে দর্শনার্থী আসে মাত্র ২৫-৩০ জন
ফসিল থেকে একতারা—সবই আছে, নেই শুধু দর্শনার্থী

পঞ্চগড় সরকারি মহিলা কলেজের শিক্ষার্থী ফারজানা ইয়াসমিন বলেন, আমরা কলেজের হোস্টেলে থাকি। এখানে প্রতিদিন মানুষ আসেন। এমনকি বন্ধের দিনও অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষক শিক্ষার্থীরা দেখতে আসেন। তারা দেশের একমাত্র পাথরের জাদুঘরে রক্ষিত দুর্লভ পাথর দেখে এবং ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব জেনে বিস্মিত হন।

বিরল পাথর আর প্রাচীন নিদর্শনে সমৃদ্ধ ‘রকস মিউজিয়াম’২২ ফুট দৈর্ঘ্যের শালগাছের নৌকা/ ছবি: জাগো নিউজ

নীলফামারির ডোমার এলাকা থেকে রকস মিউজিয়াম দেখতে আসা কলেজ শিক্ষার্থী আবিদুর রহিম বলেন, দীর্ঘদিনের ইচ্ছা ছিল রকস মিউজিয়াম দেখার। সবকিছু দেখে অবাক হয়েছি। আমি আগে কখনো ভাবিনি, পাথরের মধ্যেও এত বৈচিত্র্য থাকতে পারে। এখানে এসে বুঝলাম প্রকৃতি কত বিস্ময়কর। প্রতিটি পাথরের আলাদা রঙ, নকশা ও ইতিহাস রয়েছে। এখানে অনেক প্রাচীনকালের মানুষদের ব্যবহার করা উপকরণ দেখে সত্যিই মুগ্ধ।

রংপুরের মিঠাপুকুর এলাকা থেকে পরিবার নিয়ে আসা গৃহিণী সুমি আক্তার বলেন, এখানে আমরা আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে এসেছি। বাচ্চাদের নিয়ে রকস মিউজিয়াম ঘুরতে এসে খুব ভালো লাগছে। এখানে শুধু বিনোদন নয়, শিক্ষামূলক দিকও আছে। শিশুরা আগ্রহ নিয়ে প্রতিটি সংগ্রহ দেখছে।

পঞ্চগড়ের বিশিষ্ট পরিবেশবিদ ও বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদতক আজাহারুল ইসলাম জুয়েল বলেন, পঞ্চগড় এমনিতেই পর্যটন এলাকা হিসেবে পরিচিত। বিশেষ করে তেঁতুলিয়ার সমতলে চা বাগানসহ জেলার বিভিন্ন ঐতিহাসিক নিদর্শন দেখে পর্যটকরা মুগ্ধ হন। সঙ্গে আমাদের পাথরের এই জাদুঘর পঞ্চগড়ের পর্যটন শিল্পে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এই রকস মিউজিয়াম নিয়ে যথাযথ প্রচারসহ সরকারি বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় এর আধুনিকায়ন করা গেলে এটি আন্তর্জাতিক পর্যটকদের কাছেও আকর্ষণীয় হতে পারে।

আরও পড়ুন
বীরশ্রেষ্ঠ মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর স্মৃতি জাদুঘরে নেই কোনো স্মৃতিচিহ্ন
জিয়া স্মৃতি জাদুঘর দ্রুত হেরিটেজ ঘোষণা করা হবে: অর্থমন্ত্রী
হারিয়ে গেছে মহাস্থান জাদুঘরের একটি মূর্তি, জানা গেলো ১৯ বছর পর
জীর্ণ ভবনের স্যাঁতসেঁতে ঘরে শত বছরের ইতিহাস

পঞ্চগড় ময়দানদীঘি কলেজের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের সহকারি অধ্যাপক শেখ সাজ্জাদ হোসেন বলেন, পঞ্চগড়ের ইতিহাস, প্রকৃতি ও ভূতাত্ত্বিক ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে রকস মিউজিয়ামের ভূমিকা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। এটি শুধু একটি পাথরের জাদুঘর নয়, বরং প্রকৃতি ও ইতিহাসের সম্মিলিত পাঠশালা।

তিনি আরও বলেন, পঞ্চগড়ের শান্ত জনপদে গড়ে ওঠা ব্যতিক্রমধর্মী পাথরের জাদুঘর দেখতে প্রতিদিন মানুষ আসেন, তারা প্রাচীন ইতিহাসের গল্প শোনেন। যথাযথ পরিকল্পনা, প্রচার ও প্রত্নত্বাতিক কায়দায় এর সংরক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে রকস মিউজিয়াম দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠবে বলে আমরা মনে করি।

বিরল পাথর আর প্রাচীন নিদর্শনে সমৃদ্ধ ‘রকস মিউজিয়াম’

পঞ্চগড় সরকারি মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর এ.এফ.এম হারুন-অর-রশীদ বলেন, দেশের একমাত্র এই পাথরের জাদুঘর দেখতে প্রায় প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ আসেন। এদের মধ্যে বিভিন্ন এলাকা থেকে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা বেশি আসেন। আমাদের এই পাথরের জাদুঘরের জন্য সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা দরকার।

তিনি বলেন, ঐতিহাসিক ও দুর্লভ পাথরের এই সংগ্রহশালা রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয়ভার আমাদের বহন করতে হয়। এজন্য সরকারি কোন বরাদ্দ থাকে না। জাদুঘরটি পরিদর্শনে কারো কাছে কোন অর্থ নেওয়ার ব্যাপারেও আমাদের নিষেধ করা হয়েছে। এমন একটি উদ্যোগের জন্য কলেজের তৎকালীন অধ্যক্ষ নাজমুল হককে ধন্যবাদ।

এ.এফ.এম হারুন-অর-রশীদ বলেন, এই জাদুঘরে রক্ষিত অনেক প্রাচীন পাথরের উপর প্রাচীন শিলালিপি রয়েছে। এখানে এগুলো কেউ পড়তে পারেনি। আমরা এই বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে চিঠি লিখেছিলাম। তবে এর কোন প্রত্যুত্তর আমরা পাইনি। জাদুঘরটি ঢাকায় স্থানান্তরের কথা বলা হয়েছিল। আমরা এমনটা কখনই আশা করি না। পঞ্চগড়ের সাধারণ মানুষ এটি মেনে নেবে না। স্থানান্তর করা হলেও পঞ্চগড়ের কোন স্থানে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় স্থানান্তরিত হতে পারে। তবে সেটা পঞ্চগড়ের মধ্যেই হতে হবে।

এনএইচআর/এএইচ/এএসএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।