বিশুদ্ধ জলের খোঁজে ‘জীবনযুদ্ধ’
মঙ্গলবার সকালটা যেন নদীর তীরবর্তী অসহায় মানুষের জন্য ভিন্ন রকম সতর্কবার্তা। একদিকে রাতে পানি বেড়েছে বেশ। অন্যদিকে আকাশে কালো মেঘের আনাগোনা। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে তাই বৃষ্টির আগমন বার্তা নতুন করে আতঙ্কিত করেছে তাদের।
ভাঙন এলাকায় সংবাদ সংগ্রহে যাবার সঙ্গে সঙ্গে ঘিরে ধরলো শতাধিক নারী-পুরুষ। তাদের একই কথা “হামরা না খ্যায়া থাকপার পারমু। কিন্তুু পানি না খ্যায়া মরবার পারমুনা। হামাকেরে কোনো ত্রেরান লাগবি না। হামাকেরে একটা কল (নলকূপ) বসানোর ব্যবস্থা করে দ্যান। না হলে নদীর পানি খ্যায়া খ্যায়া মরে যামু। ৫ কিলোমিটার দূরে থ্যাকা পানি বওয়া (বহন করা) লাগে। এতো কষ্ট আর করবার পারি না।’
নতুন এই বাঁধই এখন অসহায় মানুষদের আশ্রয়স্থল। গত বছর পুরাতন বাঁধ ভেঙে গেলে প্রায় তিন কিলোমিটার পিছন এই বাঁধটি নির্মাণ করা হয়েছিল। ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রৌহদহ বাঁধে এখন আশ্রয় নিয়েছেন আশেপাশের ২০ গ্রামের অন্তত ৫০০ পরিবার। প্রায় এক মাস হলো বন্যা দেখা দিয়েছে। প্রতিদিন পানি বৃদ্ধির কারণে এই বাধই তাদের আশ্রয় স্থল।
সারিয়াকান্দির রৌহদহ, ঘুঘুদহ, শেখপাড়া, আটবাড়িয়া, কামালপুর, আকন্দপাড়া ঘুরে দেখা গেছে, মানুষের দুঃখ দুর্দশার চিত্র। গ্রামের প্রতিটি বাড়িই ১০/১২ ফিট পানির নিচে। যার কারণে বিধ্বস্ত ঘরবাড়ি ফেলে রেখে আশেপাশের উঁচু স্থানে আশ্রয়ের জন্য ছুটছেন এই সব অসহায় মানুষজন।
কথা হয় ৬০ বছরের বৃদ্ধা আজিমুন, কোকেয়া, সাবেরা, আমিরুন, আছমা খাতুন ও মেহেরুনের সঙ্গে। বাঁধের উপরে সকালে রান্নার আয়োজন করছিলেন তারা। আয়োজন বলতে ভাত আর আলু ভর্তা। দেখা গেলো চুলার পাশে বালতিতে নোংরা ঘোলা পানি রাখা।
জানতে চাইলে বললেন, ‘কি করমু বাবা। কল নাই তো পানিও নাই। উট্টি (৫ কিলোমিটার দূরে) একনা কল বসাচে। সেটি পানি আনবার গ্যালে তামান দিন যায়। রানমু কখন আর খামু কখন। এমনিতে এক বেলা খাই তো ২ বেলা না খ্যায়া থাকা লাগে। বাধ্য হইয়্যা নদী থ্যাকা পানি তুলে আন্যা রানবার লাগচি। একুন এই পানি খ্যাইয়াই জীবন বাঁচিচ্চে।’
বাঁধে মনির হোসেন নামের একজন জানালেন, তার শিশুসহ পরিবারের সকলের ডায়রিয়া দেখা দিয়েছে। ৫ বছরের শিশু আরিফের অবস্থা সবচেয়ে খারাপ। নদীর পানি পান করার জন্যই এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। পানির সংকট নিরসনে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগ সারিয়াকান্দি ও ধুনটের দুর্গত এলাকায় বিশুদ্ধ পানি সরবরাহে এখনো কোনো উদ্যোগ নেয়নি। বাঁধের একটি অংশে একটি মাত্র নলকূপ পাওয়া গেছে। সেই নলকূপটি স্থানীয় জনগণ নিজ উদ্যোগে বসিয়েছেন। এছাড়া আর কোনো নলকূপ নেই।
দুর্গত এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধিও সঙ্গে সঙ্গেই প্লাবিত এলাকাগুলোতে দুর্ভোগ বাড়ছে। এখন সারিয়াকান্দি ও ধুনটের শতাধিক গ্রামের মানুষ পানিবন্দি। রৌহদহ বাজারে অবস্থিত নওখিলা উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রে পানিতে ডুবে যাবার কারণে সেবা দেয়া হচ্ছে বাঁধের উপরে অস্থায়ীভাবে। 
ওই কেন্দ্রের স্বাস্থ্য সহকারী আলিম হোসেন জানান, হঠাৎ করেই পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত রোগির সংখ্যা বেড়ে গেছে। প্রতিদিন ১০০ বেশি রোগি আসছে। দূষিত পানি পান করার কারণে এমনটি হচ্ছে বলে জানান তিনি।
সারিয়াকান্দি বন্যা কবলিত এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, যেসব এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো, সহজেই গাড়ি প্রবেশ করতে পারে, মূলত সেসব এলাকায় অবস্থানরত দুর্গত মানুষই কমবেশি সাহায়্য সহযোগিতা পেয়েছে। আর যারা বাঁধের উপরে রয়েছেন তারা অপেক্ষাকৃত ত্রান পেয়েছেন অনেক কম। আর গ্রামের মধ্যে অবস্থানকারীরা ত্রান পাননি বললেই চলে।
নৌকার শব্দ শুনলেই ছুটে আসে অসহায় সেই মানুষজন। হয় ত্রান, নয়তো স্লিপে নাম লেখানোর আকুতি করেন তারা।
কামালপুর বাঁধে আশ্রয় নেয়া অসহায় মানুষদের কথাতে উঠে আসে এ ধরনের চিত্র।
৮০ বছরের বৃদ্ধ আব্দুর রশিদ, এনামুল জানালেন ‘সেই ঈদের আগে ১০ কেজি চাল পাসনু। এরপর কেউ ত্রান লিয়া এই দিকে আসেনি। ‘ক্যাল বেনা একজনের কাছ থ্যাকা চাইয়ে নিয়ে চারডা চিড়া খাচনু, তারপর পুরাদিন গেলো এক সের চাউলও পানু না, ১০/২০ ট্যাকাও কেউ দিলো না। একই ভাবে রৌহদহ গ্রামের বৃদ্ধ ফেরদৌস জানান, যার গায়োত বল বেশি তাই তেরান পায়। আর বুড়ারা না খ্যায়া থাকে। এডা ক্যাংকা বিচার বাবা।’
দেখা গেছে, এখনো চন্দনবাইশার ঘুঘুমারি, ডাকবাংলা, নান্দিনারপাড়াসহ অর্ধশতাধিক গ্রামের বাড়ি-ঘর, ফসলি জমি সবই ভাসছে থৈ থৈ পানিতে।
স্থানীয় ইউপি সদস্য আনোয়ার জানান, সরকারি বরাদ্দ আছে। তবে সেটিন চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। ঈদের আগে ৫০টি পরিবারকে ১০ কেজি করে চাল দিতে গিয়ে লোকজনের রোষানলে পড়েছি। প্রতিদিন গরিব মানুষগুলো ছুটে আসে বাড়িতে ত্রাণের আশায়। ১০ জনের চাল ৩০ জনকে দিয়েও শেষ করা যায়না।
তিনি জানান, বন্যার কারণে এই অঞ্চলের সব স্থানে যাওয়া যায় না। ইঞ্জিন চালিত নৌকা, ডিঙ্গি নৌকা এবং কলার গাছের ভেলায় চড়ে বানভাসি মানুষজন চলাচল করছে। স্বাভাবিক কারণেই গৃহপালিত পশু, বয়স্ক, শিশু ও প্রসূতি মায়েদের নিয়ে অসহনীয় কষ্টে দিনানিপাত করছেন এলাকার মানুষ।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রুহুল আমিন জানান, যমুনায় সারিয়াকান্দি পয়েন্টে বিপদসীমার ৬১ সেন্টিমিটার উপরে ছিল পানি। এ কারণে পানি গ্রামে ঢুকছে। পানি আগামীতে আরো বৃদ্ধি পাবার সম্ভাবনা রয়েছে।
এআরএ/এবিএস