গুদামে জায়গা নেই : বাইরে থেকে নষ্ট হচ্ছে সার
জয়পুরহাটে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) বাফার (আপদকালীন) গুদামে জায়গার অভাবে হাজার হাজার বস্তা ইউরিয়া সার খোলা আকাশের নিচে পড়ে আছে। বৃষ্টির পানি থেকে রক্ষা পেতে ত্রিপল ও পলিথিন দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে এসব সার।
দীর্ঘদিন ধরে এভাবে বাইরে পড়ে থাকায় এসব সার থেকে কাঙ্ক্ষিত ফল পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেছেন কৃষকরা।
জেলা সার গুদাম কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, জয়পুরহাট সদর উপজেলা পরিষদ কার্যালয়ের পূর্ব পাশে পাকিস্তান আমলে সার মজুদের জন্য একটি গুদাম নির্মাণ করা হয়। এর ধারণক্ষমতা দুই হাজার টন। ওই সময় কৃষকদের সারের চাহিদা অনুযায়ী এ গুদাম নির্মাণ সঠিক ছিল। পরে আর কোনো গুদাম নির্মাণ করা হয়নি। কিন্তু দিনে দিনে চাহিদা বাড়ার কারণে বাড়ানো হয় আপদকালীন মজুদও।
আর সেই থেকে দুই হাজার টনের ওই গুদাম ভরানোর পর অবশিষ্ট সার রাখা হয় খোলা চত্বরে। বর্তমানে দুই হাজার টন সারের গুদামে চার হাজার টন সার গাদাগাদি করে রাখা হয়েছে। এরপরও তিন মাস ধরে ছয় হাজার টন (এক লাখ বিশ হাজার বস্তা) ইউরিয়া সার গুদামের সামনে খোলা জায়গায় পড়ে রয়েছে। এগুলো ত্রিপল ও পলিথিন দিয়ে ঢেকে রোদ-বৃষ্টি থেকে রক্ষা করা হচ্ছে।
সার ব্যবসায়ী ও কৃষকদের অভিযোগ, খোলা আকাশের নিচে বেশি দিন রাখলে ওই সার বাতাসে গলে ওজন কমে যায়। আবার বাতাস ঢুকে বস্তার ভেতর সার জমাট বেঁধে শক্ত হয়ে যায়। এছাড়া বস্তায় পানি ঢুকলে কখনো কখনো সারের রং নষ্ট হয়ে যায়। ফলে এর থেকে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাচ্ছেনা।
ব্যবসায়ীরা জানান, নষ্ট সার কৃষকরা কিনতে চায় না। গুদামের বাইরে খোলা আকাশের নিচে সার থাকায় ৫০ কেজির বস্তা থেকে দেড়-দুই কেজি কম পাওয়া যায়। বস্তা খুলে কেজি দরে বিক্রি করলে খুচরা ব্যবসায়ীরা লোকসানে পড়ে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ ও সার গুদাম কর্তৃপক্ষের দাবি, তিন বা ছয় মাস ত্রিপল ও পলিথিন দিয়ে ভালোভাবে ঢেকে রাখলে সারের গুণগত মান অথবা ওজনে ঘাটতি হওয়ার প্রশ্নই আসে না।
এবিষয়ে বিসিআইসি সার গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মিজানুর রহমান বলেন, দুই হাজার টন ধারণক্ষমতার গুদামে সার রাখা হয়েছে চার হাজার টন। বাকি সার গুদামের বাইরে ত্রিপল ও পলিথিন দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে। আশা করছি, এতে কোনো সমস্যা হবে না।
জেলা কৃষি সম্প্রাসারণ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এবার জেলায় ইউরিয়া সার বরাদ্দ পাওয়া গেছে ৩৮ হাজার ৭৯৪ টন। বাফার গুদামে মজুদ রয়েছে ১০ হাজার টন, গুদামের ভিতর ও বাহির মিলে সমন্বয় করে এসব সার রাখা হয়েছে।
কালাই উপজেলার সড়াইল গ্রামের কৃষক মোহসিন আলী বলেন, ডিলারদের কাছ থেকে ৫০ কেজি বস্তার সার কিনে ওজনে দেড় থেকে দুই কেজি কম পাওয়া গেছে। অভিযোগ করলে ডিলাররা আমলে নিতে চায় না।
আক্কেলপুর উপজেলার মানিকপাড়া গ্রামের কৃষক মুনছুর রহমান বলেন, বাজার থেকে সার কিনে বাড়িতে এসে দেখি তা জমাট বেঁধে পাথরের মতো শক্ত হয়ে গেছে। পরে অনেক কষ্টে সেগুলো গুড়ো করে জমিতে দিতে হয়েছে।
এ বিষয়ে জয়পুরহাট জেলা ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মশিউল আলম মোল্লা বলেন, গুদামের বাইরে খোলা আকাশের নিচে থাকা সারের গুণগত মান ও ওজন কিছুটা হলেও কমে যায়। আবার অনেক বস্তার ভেতরে সার জমাট বেধে শক্ত হয়ে যায়। এসব সার কৃষকরা কিনতে চায় না।
এসব বিবেচনায় নিয়ে সংগঠনের পক্ষ থেকে সার সংরক্ষণে নতুন গুদাম নির্মাণের জন্য একাধিকবার আবেদন করা হলেও কার্যত কোনো ব্যবস্থা নেয়নি কর্তৃপক্ষ।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের ভারপ্রাপ্ত উপ-পরিচালক মো. তাহেরুল ইসলাম বলেন, বাইরে রাখলেও সারের মান ও ওজন কমার কথা নয়। খুব স্বল্প সময়ের মধ্যে সারগুলো ডিলারদের মাধ্যমে অপসারণ করা হবে।
তিনি আরো বলেন, গুদামের জন্য এর আগে বাণিজ্য, কৃষি ও শিল্প মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হয়েছে। সাড়া মেলেনি।
জয়পুরহাট জেলা প্রশাসক মো. আব্দুর রহিম জানান, নতুন একটি বাফার সার গুদাম নির্মাণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
রাশেদুজ্জামান/এফএ/আরআইপি