আস্থা কুড়িয়েছে সিআরপি


প্রকাশিত: ০৫:০৭ এএম, ২১ অক্টোবর ২০১৬

ঢাকার সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের দুটি পরিত্যাক্ত গুদাম ঘরে মানবসেবা প্রদানের মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু করা সিআরপি গত ৩৭ বছরে পরিণত হয়েছে ৪০০ শয্যাবিশিষ্ট একটি আধুনিক হাসপাতালে। প্রতিবন্ধীদের অধিকার আদায়ের প্রত্যয় আর চিকিৎসক তৈরিতেও ভূমিকা রাখছে এই প্রতিষ্ঠান। শারীরিক প্রতিবন্ধী রোগীদের বিভিন্ন কোর্সের মাধ্যমে বিনামূলে প্রশিক্ষণ প্রদান এবং ঋণ দিয়ে বিভিন্ন ধরনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান চালুর মাধ্যমে তাদেরকে সামলম্বী করে তুলার চেষ্টা চালাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।  

সিআরপি মূলত একটি সেচ্ছাসেবী ফিজিওথেরাপিস্টদের সংগঠন। এর মূল কাজ শারীরিকভাবে অক্ষমদের পরিপূর্ণ পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা। ১৯৭৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এই সংগঠনটির মূলে আছেন বাংলাদেশে বসবাসরত একজন ইংরেজ ফিজিওথেরাপিস্ট ভেলরি এ. টেইলর। তিনি জীবনের অধিকাংশ সময়ই বাংলাদেশে মানবসেবায় ব্যয় করেছেন।

সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে কর্মরত থাকা অবস্থায় ১৯৭৯ সালে দীর্ঘ প্রচেষ্টার মাধ্যমে ওই হাসপাতালের দুইটি পরিত্যক্ত গুদাম ঘর বরাদ্দ পান ভ্যালেরি টেইলর। সেখানেই প্রথম ছোট আকারে প্রতিষ্ঠা করেন ফিজিওথেরাপির সংগঠন সিআরপি এবং রোগী ভর্তির প্রক্রিয়া। অক্লান্ত পরিশ্রম করে উন্নতির জন্য সাইকেলে চেপে বিভিন্ন জনের ঘরে ঘরে যেতেন সাহায্যের জন্য। এজন্য তাকে অনেক লাঞ্ছনা-গঞ্জনাও সহ্য করতে হয়েছিল। আজ ৩৭ বছর পরে এসে প্রতিষ্ঠানটি নিজের পায়ে দাঁড়াতে সমর্থ হয়েছে। পরিণত হয়েছে ৪০০ শয্যাবিশিষ্ট একটি দাতব্য ক্লিনিকে।

সিআরপির প্রতিষ্ঠাতা ভেলরি এ. টেইলর মূলত ইংল্যান্ডের নাগরিক হলেও ১৯৯৮ সালে তিনি বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পেয়েছেন। সম্পূর্ণ আপন প্রচেষ্টায় একটি পূর্ণাঙ্গ সংগঠন প্রতিষ্ঠা করে তিনি বিশ্বে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

Savar

মহিয়সী এ নারীর জন্ম, শৈশব ও কৈশোর কেটেছে যুক্তরাজ্যের কেন্ট শহরে। তিনি ১৯৪৪ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি, উইলিয়াম টেইলর এবং মেরি টেইলর দম্পত্তির সংসারে জন্মগ্রহণ করেন। তরুণ বয়সে ১৯৬৯ সালে ভলান্ট্যারি সার্ভিস ওভারসিজ (ভিএসও) নামক একটি সংগঠনের কাজে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্থানে (বর্তমান বাংলাদেশ) আসেন। উদ্দেশ্য ছিল ফিজিওথেরাপি প্রদান।

চট্টগ্রামের কাছে অবস্থিত চন্দ্রঘোনা খ্রিস্টান হাসপাতালে ফিজিওথেরাপিস্ট হিসেবে যোগ দেন তিনি। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের কারণে তিনি ইংল্যান্ডে চলে গেলেও ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে পুণরায় বাংলাদেশে ফিরে আসেন। নয় মাস যুদ্ধের পর বাংলাদেশ নামের একটি নতুন রাষ্ট্র জন্ম হওয়ার পর তিনি আরও ২ বছর এদেশে থেকে তার কাজ চালিয়ে যান। ১৯৭৩ সালে আবার ইংল্যান্ডে যান। উদ্দেশ্য ছিল মানবসেবার লালিত স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে বাংলাদেশে একটি পূর্ণাঙ্গ ফিজিওথেরাপি সংগঠন তৈরির জন্য উপযুক্ত অর্থ ও অন্যান্য সাহায্যের ব্যবস্থা করা। ১৯৭৫ সালে তিনি আবার বাংলাদেশে ফিরে আসেন।

১৯৯৫ সালে ব্রিটিশ সরকার তাকে অর্ডার অব দ্য ব্রিটিশ এম্পায়ার পদকে ভূষিত করে। ১৯৯৬ সালে তিনি আর্থার আয়ারস পদক লাভ করেন। তার এই অসামান্য অবদানের জন্য ১৯৯৮ সালে বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব প্রদান করেন।
 
বর্তমানে ঢাকার অদূরে সাভারে প্রতিষ্ঠিত সিআরপির সদর দফতরে গরীব দুঃখীরা অনেক চিকিৎসা পাচ্ছেন বিনা খরচেই। শারীরিকভাবে সুস্থ হওয়ার পাশাপাশি সিআরপির আর্থিক সহায়তায় হয়ে উঠছেন সাবলম্বী। প্রতিবন্ধীদেরকে সমাজে অনেকেই বাঁকা চোখে দেখলেও সিআরপি তাদের নিরলস চেষ্টায় এসব প্রতিবন্ধীদের কৃত্রিম হাত পা, স্বয়ংক্রিয় হুইল চেয়ারের ব্যবহার, কম্পিউটার প্রশিক্ষণসহ নানা ভাবে পূর্নবাসন করে যাচ্ছে।

সিআরপি তাদের সততা ও সেবা দিয়ে শুধু দেশেই নয় বিদেশেও বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে উজ্জ্বল করেছে। প্রতিবছরই বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে সিআরপিতে আসছে অসংখ্য তরুণ সেচ্ছাসেবক। অন্যদিকে সিআরপিও প্রসারিত করেছে তার মানবসেবার পরিধি। দেশের বিভিন্ন স্থানে ইতোমধ্যে ৬টি শাখা প্রতিষ্ঠান চালু করেছে তারা।

চিকিৎসার বিনিময়ে প্রাপ্ত অর্থ থেকে অল্প পরিসরে ব্যয় নির্বাহ করলেও বিদেশি সাহায্যই সিআরপির প্রধান আর্থিক উৎস। প্রতিষ্ঠার পর থেকে দেশ বিদেশের ধনবান ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সাহায্য সহযোগিতা নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি সচল রাখতে প্রধান ভূমিকা রেখেছে এর প্রতিষ্ঠাতা ভেলরী টেইলর।

Savar

তবে দারিদ্রপীড়িত বাংলাদেশ সিআরপি থেকে অনেক কিছু পেলেও সিআরপির উন্নয়নে সরকারের ভূমিকা খুবই নগন্য। সরকারি সহযোগিতা পেলে সিআরপি আরো এগিয়ে যাবে বলে মনে করেন সচেতন মহল।

সিআরপির নির্বাহী পরিচালক শফিকুল ইসলাম জানান, প্রতিষ্ঠার পর থেকে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলার পর আজ এ অবস্থানে এসে দাঁড়িয়েছে সিআরপি। ২০০৭ সাল পর্যন্ত সরকার অনুদান হিসেবে সিআরপিকে মাত্র ৫০ লাখ টাকা দিয়েছে। এরপর আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর তা বাড়িয়ে ২ কোটি টাকায় উন্নীত করে। যা সিআরপির বার্ষিক ব্যয়ের মাত্র ২৫ শতাংশ।

তিনি বলেন, দেশের সরকারি হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারি অর্থে পরিচালিত হয়। কিন্তু সিআরপি ওই সব প্রতিষ্ঠানের চেয়ে কার্যকর ভূমিকা রেখেও বঞ্চিত হয়ে আসছে। প্রতিষ্ঠানটিতে সরকারি সহযোগিতা বাড়ানোর দাবি জানান তিনি।

বর্তমানে এখানে শিশু বিভাগ, ফিজিওথেরাপি, অকুপেশনাল থেরাপি, স্পিচ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপি, স্পেশাল সিটিং চেয়ার ও অর্থোটি অ্যান্ড প্রস্থেটি বিভাগ রয়েছে। প্রতি বছর সিআরপি থেকে প্রায় ৪০০ জন মেরুরজ্জুতে আঘাতপ্রাপ্ত এবং ৪৩ হাজার রোগী বহির্বিভাগ থেকে চিকিৎসা নিয়ে থাকে। এখানে ৫০ টাকার বিনিময়ে বহির্বিভাগে যেকোনো রোগী দেখানো যায়। সপ্তাহের শুক্রবার ব্যতীত যেকোনো দিন এই হাসপাতালের বহির্বিভাগ খোলা থাকে। এখানে প্রতিদিন বিভিন্ন জেলা থেকে অসংখ্য রোগী আসে বিভিন্ন আঘাতজনিত কারণে চিকিৎসা নিতে।

এফএ/পিআর

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।