কামালপুর ও ফুলবাড়ী মুক্ত দিবস ৪ ডিসেম্বর


প্রকাশিত: ০৪:৩৩ এএম, ০৪ ডিসেম্বর ২০১৬

আজ ৪ ডিসেম্বর জামালপুর জেলার ধানুয়া কামালপুর  ও দিনাজপুর জেলার ফুলবাড়ী মুক্ত দিবস।

হানাদার বাহিনীর শক্তিশালী ঘাঁটি কামালপুর দুর্গের পতনের মধ্য দিয়ে ১১নং সেক্টরের বীর মুক্তিযোদ্ধারা সূচনা করেছিল ঢাকা বিজয়ের পথ।

স্বাধীনতা যুদ্ধের শুরুতেই হানাদার বাহিনী জামালপুর মহকুমা সদর ছাড়াও সীমান্তবর্তী বকশীগঞ্জ উপজেলার ধানুয়া কামালপুরে শক্তিশালী ঘাঁটি স্থাপন করে। এই ঘাঁটি থেকে হানাদার বাহিনী তাদের দোসর আল-বদর রাজাকারদের নিয়ে অসংখ্য মানুষকে হত্যা করে।

একাত্তরে যুদ্ধের শুরুতেই বৃহত্তর ময়মনসিংহ ছাড়াও আশপাশের বেশক’টি জেলা নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের ১১নং সেক্টর গঠিত হয়। ভারতের মেঘালয় রাজ্যের তুরা জেলার মহেন্দ্রগঞ্জ এলাকায় কর্নেল তাহেরের নেতৃত্বাধীন ১১নং সেক্টরের হেড কোয়ার্টার স্থাপন করা হয়।

বিপরীতে এপাশে বকশীগঞ্জের ধানুয়া কামালপুরে হানাদার বাহিনীর ঘাঁটি স্থাপন করা হয়। এই অঞ্চলে হানাদার বাহিনীর অন্যতম শক্তিশালী ঘাঁটি ছিল ধানুয়া কামালপুর। স্বাধীনতা যুদ্ধে এই ১১নং সেক্টরের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। ৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে বকশীগঞ্জের বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত হয় হত্যাযজ্ঞ।

সেক্টর কমান্ডার কর্নেল তাহেরের পরিকল্পনা অনুসরণ করে ১৯৭১ সালের ২৪ নভেম্বর মুক্তিযোদ্ধারা হানাদার বাহিনীর ধানুয়া কামালপুর ঘাঁটি অবরোধ করে। দু’পক্ষের মধ্যে শুরু হয় প্রচণ্ড যুদ্ধ। অবরোধের প্রথম দিনই সম্মুখ যুদ্ধে মর্টার শেলের আঘাতে সেক্টর কমান্ডার কর্নেল তাহের একটি পা হারান। এ সময় ভারপ্রাপ্ত সেক্টর কমান্ডারের দায়িত্ব নেন উইং কমান্ডার হামিদুল্লাহ খান।

Jamalpur

১০ দিনব্যাপী প্রচণ্ড যুদ্ধের পর ৪ ডিসেম্বর সন্ধ্যা ৭টায় দূর্গে অবরুদ্ধ ৩১ বালুচ রেজিমেন্টের গ্যারিসন কমান্ডার আহসান মালিক খানসহ ১৬২ জন হানাদার সদস্য মিত্র বাহিনীর নিকট আত্মসমর্পণ করে। মুক্ত হয় ধানুয়া কামালপুর। আর কামালপুর মুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়েই সূচিত হয় শেরপুর, ময়মনসিংহ, জামালপুরসহ ঢাকা বিজয়ের পথ।

অপরদিকে, ১৯৭১ সালের আজকের এই দিনে মুক্তিযোদ্ধা ও মিত্রবাহীনী যৌথভাবে দখলদার পাক বাহিনীর সঙ্গে প্রাণপণ যুদ্ধ করে ফুলবাড়ী এলাকা হানাদার মুক্ত করে স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। এজন্য ৪ ডিসেম্বর ফুলবাড়ী হানাদার মুক্ত দিবস হিসেবে পালন করে আসছে এই এলাকার মুক্তিযোদ্ধারা।

এলাকার মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১৯৭১ সালের মার্চ মাস থেকে যখন পাকিস্তানি পশ্চিমা শাসক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সারা দেশব্যাপী উত্তাল আন্দোলন চলছিল, তখন দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং বাঙ্গালি ও অবাঙ্গালিদের মধ্যে যাতে করে কোনো সংঘাত সৃষ্টি না হয়, সেজন্য মার্চের প্রথম সপ্তাহে ফুলবাড়ীতে গঠিত হয় সর্ব দলীয় শক্তিশালী সংগ্রাম কমিটি।

২৪ মার্চ পর্যন্ত ফুলবাড়ীতে শান্তি বিরাজ করে। ২৫ মার্চ গভীর রাতে ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম, রংপুর ও বগুড়ার বিভিন্ন এলাকায় পাকিস্তানী পাকবাহিনী নিরিহ জনসাধারণের উপর হানা দিয়ে হত্যা করে অসংখ্য নিরীহ বাঙালিকে। পরের দিন ২৬ মার্চ এই হত্যাযজ্ঞের খবর বিভিন্ন এলাকা থেকে রেডিও টিভিতে জানতে পেরে ফুলবাড়ীতে বাঙালি জনগোষ্টির মধ্যে চরম উত্তেজনার সৃষ্টি হয়।

এই হত্যাযজ্ঞের প্রতিবাদে, ঐ দিন সকাল থেকে সর্বদলীয় সংগ্রাম কমিটির উদ্যোগে ফুলবাড়ী শহরে বের করা হয় এক বিশাল প্রতিবাদ মিছিল। মিছিলটি শান্তিপূর্ণ ভাবে শহরের রেলস্টেশন থেকে কাঁটাবাড়ী বিহারীপট্টি অতিক্রম করার সময় মিছিলকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়লে বাঙালি-অবাঙালিদের মধ্যে সংঘাতের সৃষ্টি হয়। এই ঘটনায় অনেকের বাড়ি-ঘরে অগ্নিসংযোগ ও লুট-পাটের ঘটনা ঘটে।

Jamalpur

ওই সময় ফুরবাড়ীর মুক্তিকামী মানুষ বিহারীপট্টির অবাঙালি বাড়িতে পাল্টা হামলা ও অগ্নিসংযোগসহ অনেক হতাহতের ঘটনা ঘটে। পরে পাকিস্তানপন্থি বলে পরিচিত অবাঙালিদের নেতা ডা. শওকতসহ তার পরিবারের ৫ জন সদস্য অগ্নিদগ্ধ হয়ে নিহত হন।

এই ঘটনার জের ধারে, এপ্রিলের ২ তারিখ পাক হানাদার বাহিনী ফুলবাড়ী আক্রমন শুরু করে পুরো ফুলবাড়ীকে নিয়ন্ত্রণ করে নেয়।

দীর্ঘ ৯ মাস পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার পর, ১৯৭১ সালের ৪ ডিসেম্বর শুক্রবার মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় যৌথ বাহিনী উপজেলার বেতদিঘী, কাজিয়াল, এলুয়াড়ী এবং জলপাইতলী, পানিকাটা, রুদ্রানী, আমড়া ও রানি নগর এলাকার বিভিন্ন সীমান্ত এলাকা দিয়ে দখলদার পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে চতুর্মুখী আক্রমণ শুরু হয়।

এসময় মুক্তিবাহীনী ও মিত্র বাহিনীর হাতে নিশ্চিত পরাজয় বুঝে দখলদা পাকবাহীনীরা, মিত্র বাহিনীদের ফুলবাড়ী শহরে আগমন রোধ করতে, ওই দিন বিকেল সাড়ে ৩টায় ফুলবাড়ীর পৌর শহরের পশ্চিম পার্শ্বে ছোট যমুনার উপর লোহার ব্রিজটির পূর্বাংশ শক্তিশালী ডিনামাইট দিয়ে উড়িয়ে দেন।

ব্রিজটি উড়িয়ে দেয়ায় মিত্রবাহীনীরা ফুলবাড়ী শহরের প্রবেশ করতে বিলম্ব হয়। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে অবাঙালিরা বিশেষ ট্রেন যোগে পালিয়ে যায়, এর পর সন্ধা ৭টায় ফুলবাড়ীতে প্রবেশ করে মুক্তিযোদ্ধা ও মিত্রবাহীনী এবং ফুলবাড়ীকে শত্রুমুক্ত ঘোষণা করেন।

এফএ/এনএইচ/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।